|
শান্তির পাহাড়ি পথ: প্রসংগ সেনা ক্যাম্প
|
|||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
শান্তিচুক্তিতে সরকারের তরফে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম থেকে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে ৻
চুক্তির দশ বছর পরে পাবর্ত্য জেলাগুলোতে সেনা বাহিনীর অবস্থানের ক্ষেত্রে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে...পরিস্থিতি দেখতে গিয়েছিলেন
মিজানুর রহমান খান
বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকার শুরু থেকেই পাবর্ত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নানাভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছে৻ কখনো সামরিকভাবে, কখনো সমতল থেকে বাংগালীদের সেখানে নিয়ে গিয়ে বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে৻ শান্তিবাহিনীর বিদ্রোহী তৎপরতা মোকাবেলার জন্যে রাংগামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি এই তিনটি পার্বত্য জেলায় ব্যাপক সেনা মোতায়েন করা হয় সত্তরের দশক থেকেই৻ চুক্তি সইকারী আওয়ামী লীগ সরকারের নেতারা বলছেন, দীর্ঘ দিনের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যেই শান্তিচুক্তি করা হয় যেখানে শান্তিবাহিনীর সদস্যদের অস্ত্র জমা দেয়ার পাশাপাশি পাবর্ত্য জেলা থেকে ধাপে ধাপে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের অংগীকার করা হয়েছে৻
পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয় এবং সেনা বাহিনী বলছে যে গত এক দশকে দু‘শোরও মতো প্রত্যাহার করা হয়েছে৻ সরকারি হিসেবেই এই ক্যাম্পের সংখ্যা ছিলো প্রায় সাড়ে পাঁচশ‘৻ জনসংহতি সমিতি বা জেএসএসের সভাপতি এবং আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান স্ন্ত লারমা বলছেন ক্যাম্প স্থানান্তরকে ক্যাম্প প্রত্যাহার হিসেবে দেখানো হয়েছে৻ ‘জনসংহতি সমিতির কাছে যেসব কাগজপত্র আছে তাতে দেখা যায় যে এ পর্যন্ত ৩১টি ক্যাম্প সরানো হয়েছে৻ এই সমিতি চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য৻ ফলে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হলে সেটা জেএসএসকেও জানানো উচিত,‘ বলেন মি. লারমা৻ সরকার ও আঞ্চলিক পরিষদের মধ্যে সংখ্যার এই পার্থক্যের কারন কি? তত্বাবধায়ক সরকারের পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন, এর কারন তার জানা নেই তবে তার জানা মতে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প ধীরে ধীরে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে৻ ‘তবে এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে করে সেখানে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরণের শূন্যতার সৃষ্টি হয়,‘ বলেন মি. চৌধুরী৻ চুক্তি সইয়ের সময়ে সেনা বাহিনীর প্রধান ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান৻ জেনারেল মাহবুব বলছেন, চুক্তি করার প্রক্রিয়ায় সেনা বাহিনীকে রাখা হলে এই দূরত্বের সৃষ্টি হতো না৻ ‘আমি তখনকার প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম কমিটিতে সেনা বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব রাখার জন্যে৻ সেটা হলে চুক্তিটা বাস্তবতার কাছাকাছি হতো৻ কিন্ত সেকরম হয়নি,‘বলেন তৎকালীন সেনা প্রধান৻
জেএসএসের অভিযোগ যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা নিরাপত্তা বাহিনী বিশেষ করে সেনা সদস্যদের হাতে এখনও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে৻ পাহাড়িদের অনেকেরই ধারনা পাবর্ত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিরাপত্তা বাহিনীই জিইয়ে রেখেছে৻ রাংগামাটিতে একজন গৃহিনী অভিযোগ করেন, সেনা বাহিনীর সহায়তা নিয়ে সেটেলার বাংগালীরা পাহাড়িদের জমি দখল করে নিচ্ছে৻ খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত এক পাহাড়ে কাঠ সংগ্রহ করছিলেন মং মং মারমা৻ তিনি বলেন, ক্যাম্প সরানোতো দূরের কথা বরং নতুন করে আরো ক্যাম্প বসানো হচ্ছে৻ তিনি জানান তার স্বপ্ন ছিলো চুক্তির পর সেনা ক্যাম্প উঠে যাবে আর স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে পাহাড়ের মানুষ৻ ‘আর্মি নেমে গেলে আমি খুশি হয়৻ সে হয় নাই৻ ভেতরে ভেতরে আরো ক্যাম্প তোলে সেনা বাহিনী,‘বলেন তিনি৻ মং মং মারমার মতো জেএসএস নেতারাও সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন করে জমি অধিগ্রহনের অভিযোগ এনেছেন যা অস্বীকার করছেন সেনা বাহিনীর কর্মকর্তারা৻ বান্দরবানের সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম জিয়াউল হাসান জানান সরকারি সিদ্ধান্তে জমি অধিগ্রহণ করা হয়ে থাকে৻ ‘ব্যাক্তিগত জমি নয় সরকারের খাস জমিতেই সেনা বাহিনীর কাজ হচ্ছে এবং এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে শান্তি চুক্তির আগে থেকেই, ১৯৭৭ সালে,‘ বলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান৻ শান্তিচুক্তির কয়েক বছর পর মহালছড়ির কয়েকটি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে৻ স্থানীয়দের অভিযোগ সেনা বাহিনীর সহায়তায় অভিবাসী বাংগালীরা এই হামলা চালায়৻ সেখানে একটি টিলার উপরে জানালা থেকে আসা আলোয় সেলাই করছিলেন এক মহিলা যার ঘর সেসময় আগুনে পুড়ে গিয়েছিলো৻ তিনি জানান যে সেই ভয় তার এখনও কাটেনি৻
সেখানে টিলার উপরে ক্যারাম খেলছিলেন কয়েকজন তরুন৻ তারা ভয়ে কথা বলতে চাননি প্রথমে৻ পরে জানান যে তাদের জীবন এখন ভয়ের জীবন৻ বন্ধুরা এক সাথে কিছু করতেও তারা ভয় পান৻ একজন বলেন, পাহাড়ে সেনা শাসন ছাড়া আর কিছুই নেই৻ ‘তারাই সর্বেসর্বা,‘এই তরুনের ক্ষোভ৻ আরেক তরুন বলেন যে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিলো শান্তিতে থাকার জন্যে৻ কিন্ত শান্তিতো আসেইনি, বরং সময়টা তাদের জন্যে আরো খারাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে৻ কলেজ পড়ুয়া এই তরুনেরা জানান যে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেও তারা ভয় করেন৻ শান্তিচুক্তির পরেও মহালছড়ির ঘটনা কিভাবে ঘটলো? খাগড়াছড়িতে সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুজ্জামান বলেন, মহালছড়িতে বড়ো ধরণের কিছু হয়নি৻ স্বার্থান্বেষী একটি মহল এই ঘটনাকে বাড়িয়ে বলেছে৻ ‘তরুনদের এই ভয় অমূলক এবং ভিত্তিহীন,‘ বলেন তিনি৻ বেশিরভাগ বাংগালিই সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের বিরোধিতা করে দাবী জানিয়েছেন যেসব ক্যাম্প তুলে নেয়া হয়েছে সেসব ক্যাম্প পুনস্থাপন করতে হবে৻ তাদের বক্তব্য পাহাড়ি বাংগালি সবার নিরাপত্তার জন্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা ক্যাম্পের প্রয়োজন আছে৻ রাংগামাটিতে চেম্বার অফ কমার্সের সভাপতি কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, বিশ্বের যেখানেই এ ধরণের ইন্সার্জেন্সীর ঘটনা ঘটেছে সেখানে প্রায় জায়গাতেই পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করা হয়েছে৻ ‘পাঁকা আম পাড়তে গেলে দু‘ একটা কাচা আমও পড়ে যেতে পারে,‘ বলেন মি. ইসলাম৻
পার্বত্য চ্ট্টগ্রামে অপারেশন দাবানলের পর সেনা বাহিনী এখন পরিচালনা করছে অপারেশন উত্তরন৻ সেনা বাহিনী বলছে, চুক্তি বাস্তবায়নের পরিবেশ তৈরি করাই এই অভিযানের লক্ষ্য৻ অন্যদিকে, জেএসএস নেতারা বলছেন, সেনা বাহিনী এবং আমলাতন্ত্রই চুক্তি বাস্তবায়নে প্রধান বাধা৻ ওয়ার্কাস পার্টির প্রেসিডেন্ট রাশেদ খান মেনন পাবর্ত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময়ে হত্যাকান্ডের ঘটনা তদন্তে কাজ করেছেন৻ চুক্তির আগে শান্তি বাহিনীর নেতাদের সাথেও বৈঠক করেছেন তিনি৻ পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা বাহিনীর উপস্থিতি সম্পর্কে মি. খানের প্রশ্ন, ‘দশ বছরে সেখানে যে পরিমান অস্ত্র পাওয়া গেছে, যে পরিমান অস্ত্রের চোরাচালান হয়েছে তাতে আর সেনা বাহিনীর কি প্রয়োজন আছে?‘ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সাবেক উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান বলছেন, সেনা বাহিনীকে সাথে নিয়েই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে৻ সেনা বাহিনীর দেয়া তথ্যানুসারে অস্থায়ী ক্যাম্পের সংখ্যা কমলেও সেনা সদস্যের সংখ্যায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি৻ কবে নাগাদ প্রত্যাহার করা হবে অবশিষ্ট সেনা ক্যাম্প? এই প্রশ্নের জবাবে রাংগামাটির ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল মঈন বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে গেলেই তারা চলে যাবেন৻ ‘জেএসএস সব অস্ত্র সমর্পন করেনি৻ ইউপিডিএফের মতো একটা সশস্ত্র সংগঠন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে৻ শান্তিচুক্তির পরে এই দুই বাহিনীর সংঘর্ষে
চারশর মতো মানুষ নিহত হয়েছে৻ এই সমস্যার সুরাহা না হলে নিরাপত্তা বাহিনী সরিয়ে নেয়া উচিত হবে না,‘ বলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ
আব্দুল মঈন৻ |
স্থানীয় লিংকস্
শান্তির পাহাড়ি পথ: পরিবর্তন ১০ বছরে15 ডিসেম্বর, 2007 | Lei
শান্তির পাহাড়ি পথ: বাস্তবায়ন কতোটা23 ডিসেম্বর, 2007 | Lei
শান্তির পাহাড়ি পথ: ভূমি বিরোধ29 ডিসেম্বর, 2007 | Lei
শান্তির পাহাড়ি পথ: শরণার্থী পুনর্বাসন06 জানুয়ারী, 2008 | Lei
শান্তির পাহাড়ি পথ: গুচ্ছগ্রামে বাংগালীদের জীবন19 জানুয়ারী, 2008 | Lei
শান্তির পাহাড়ি পথ: সাবেক যোদ্ধারা এখন30 জানুয়ারী, 2008 | Lei
|
|||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
|
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||