|
রাজনৈতিক অস্থিরতায় উদ্বেগ | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
বিবিসি বাংলা আয়োজিত "বাংলাদেশ সংলাপ" এর ৯ম পর্বের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্যানেল সদস্যরা ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য আবুল মাল আব্দুল মুহিত, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও বিএনপি নেতা ড. এম ওসমান ফারুক, নারী অধিকার আন্দোলনের একজন নেত্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের খন্ডকালীন শিক্ষক মালেকা বেগম এবং জনপ্রিয় অভিনেতা ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সংগঠক ইলিয়াস কাঞ্চন। বিবিসি বাংলা সার্ভিসের শাকিল আনোয়ারের উপস্থাপনায় প্যানেল সদস্যরা শ্রোতা-দর্শকদের সাথে সম-সাময়িক ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা করেন। এবারের সংলাপের আলোচনায় নির্বাচন কমিশন, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে আমন্ত্রিত শ্রোতাদের উৎকন্ঠাই প্রকাশ হয়েছে বারবার। অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন ঢাকার নয়াপল্টান থেকে আসা মাইশা তাসনিম। তার প্রশ্ন ছিলো নির্বাচন কমিশন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে যেখানে এত সংশয় তাতে একটি সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন আদৌ কি সম্ভব? উত্তরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন নির্বাচন কমিশন যেভাবে আছে, যে ভোটার তালিকা আছে তাতে কোন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের 'রাষ্ট্রপতি' হয়ে যাওয়াকেও সুষ্ঠু নির্বাচনের আর একটি অন্তরায় হিসেবে দেখছেন।
বিএনপি নেতা ওসমান ফারুক তাঁর সাথে দ্বিমত পোষন করে বলেন নির্বাচন কমিশনের গঠন এবং রাষ্ট্রপতির তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হওয়া, দুটোই সংবিধান মোতাবেক হয়েছে। তিনি বলেন ভোটার তালিকা নিয়ে শুধু শুধুই বিভিন্ন কথা বলা হচ্ছে কিন্তু তার বিরুদ্ধে কেউ এমন কোন প্রমান দেখায়নি যে এতে সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্থ হয়। এসময় একজন মহিলা দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করেন তিনি যে এপার্টমেন্টে থাকেন সেখানে ভোটার তালিকা তৈরীর জন্য কেউ আসেননি। তিনি বলেন তারা আদৌ ভোটার কি না তাই জানেন না। এসময় মি. ফারুক এগুলোকে ছোটখাট ত্রুটি বলে উল্লেখ করে বলেন তালিকা ছাপা হবার পর নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত সেখানে নাম অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। অন্য এক দর্শক প্রশ্ন তোলেন, যে নির্বাচন কমিশন গঠনের পর এতোদিনেও সঠিক ভোটার তালিকা তৈরী করতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের কাছ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন কি করে আশা করা যাবে? আর একজন দর্শক বলেন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন না করে এখন প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের জন্যও আন্দোলন করা উচিত, তাতে ভবিষ্যতে সেখানে বিতর্কিত কাউকে নিয়োগ দেয়ার সম্ভবনা থাকবে না।
ইলিয়াস কাঞ্চনও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করে বলেন সিইসি এত বিতর্কিত যে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি নিজেও শঙ্কিত। এসময় তিনি উপস্থিত দর্শকদের কাছে জানতে চান সিইসিকে তারা বিতর্কিত মনে করেন কি না? উপস্থিত দর্শকদের প্রায় সবাই হাত তুলে তা সমর্থন করেন। সেদিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষন করে তিনি বলেন এতটা বিতর্কিত একজনকে দিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না। একই মত দেন মালেকা বেগমও। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন সিইসি পদত্যাগ করলে তার বদলে কাকে নিয়োগ দেয়া হবে? পরের প্রশ্ন করেন মিরপুরের আসাদুজ্জামান। তার প্রশ্ন ছিলো প্রেসিডেন্ট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান যখন বলেন তার কর্মচারীদের সমালোচনা করা যাবে না, তখন কি জনগনের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে না? মালেকা বেগম তার সাথে একমত পোষন করে বলেন গনতন্ত্রে পরমত সহিঞ্চুতা বড় কথা। তাঁর মতে সমালোচনা সহ্য না করলে বুঝতে হবে রাষ্ট্রপতি জনগনের মতকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। মি. ফারুক বলেন রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরী করা হচ্ছে তা প্রেসিডেন্ট নামের প্রতিষ্ঠানকে ধবংস করে দেয়ার উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন রাষ্ট্রপতির কর্মচারীদের কাজের সমালোচনা করা যাবে কিন্তু তাদের নিয়োগ নিয়ে নয়।
মি. মুহিত বলেন রাষ্ট্রপতি সম্মানিত পদ, দলীয়ভাবে তাকে নির্বাচিত করা হলেও তিনি রাষ্ট্রের প্রতীক এবং রাষ্ট্রপ্রধান। তবে মি. মুহিত মনে করিয়ে দেন রাষ্ট্রপতি সরকার প্রধান নন। তিনি বলেন যেহেতু রাষ্ট্রপতি অসাংবিধানিক ভাবে সরকার প্রধান হয়ে গেছেন সেহেতু তাকে কিছু সমালোচনা সহ্য করতেই হবে। তার মতে রাষ্ট্রপতি দু'টি পদের ভিন্নতাকে বোঝেননি। প্রশ্নকর্তা অবশ্য তার মত প্রকাশের অধিকার খর্ব হয়েছে এমন মন্তব্য করে বলেন তারা তো আর সাহাবী নন যে তাদের বিরুদ্ধে কিছুই বলা যাবে না। শাহজাহানপুর থেকে তরিকুল ইসলাম প্রশ্ন করেন, দেশের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা সামরিক শাসনকেই কি স্বাগত জানাচ্ছে না? উত্তরে দেশের অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তার মতে রাজনৈতিক নেতাদের অদুরদর্শীতার কারনেই ‘হয়তবা আবার সামরিক শাসন আসতে যাচ্ছে’। মি. ওসমান ফারুক অবশ্য সামরিক শাসন নিয়ে কোন মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তার মতে, সামরিক বাহিনী যদি প্রশাসনকে সহযোগীতার জন্য আসে তবে তাকে কোনভাবেই সামরিক শাসন বলা যাবে না। অন্যদিকে মি. মুহিত বলেন সামরিক বাহিনী যদি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে অনুসরন করে তবে এদেশে সামরিক শাসন আসবে না। মলেকা বেগম অবশ্য বলেন আমাদের দেশের জনগন কখনই পাকিস্তান, জিয়া এবং এরশাদের সামরিক শাসন চায়নি। তিনি এধরনের শাসনকে রুখে দাঁড়াবার আহবান জানান। বর্তমানে নির্বাচন সংক্রান্ত কোন প্রশ্ন উঠলেই বিগত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় এটি সংবিধান পরিপন্থী এমন মন্তব্য করে মিরপুর থেকে আসা আসমা বিনতে করিম প্রশ্ন করেন সংবিধানের জন্য দেশ নাকি দেশের জন্য সংবিধান? উত্তরে মি. ফারুক বলেন দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য সংবিধান। তবে তিনি সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে গিয়ে বলেন, এর জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। তা করতে হলে নির্বাচনের পর সংসদে গিয়ে করতে হবে। তিনি বলেন যারা এধরনের প্রশ্ন আনছেন তারা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা থেকেই তা করছেন।
মালেকা বেগম বলেন জনগন এদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। তাঁর মতে সে লক্ষ্যে প্রতিবাদ, অবরোধ ইত্যাদির দরকার আছে। তিনি বলেন সংবিধানকে শ্রদ্ধা করে যারা কথা বলেন তারাই আগে সংবিধান লংঘন করেন। তিনি আরো বলেন মানুষের মঙ্গলের জন্য সংবিধান আর তা ব্যবহারও করতে হবে মানুষের মঙ্গলের জন্যই। একই মত প্রকাশ করেন মি. মুহিত। জেনারেল এরশাদের কোন একটি রাজনৈতিক জোটে যোগদানের সম্ভবনা কতটুকু এমন প্রশ্ন করেন সিদ্ধেশ্বরী থেকে আসা সেলিনা সাঈদ। ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন মি. এরশাদ নিজেই এতোবার এতো কথা বলেছেন যে তার কোন কথা যে সঠিক তা বোধহয় তিনি নিজেও জানেন না। মালেকা বেগম বলেন, মি. এরশাদকে কোন জোটেই নেয়া উচিত না। এ দাবীতে একটি আন্দোলন গড়ে তোলার আহবানও জানান তিনি। এদিকে, জাতীয়তাবাদী চেতানায় উদ্বুদ্ধ যে কেউ তাদের জোটে আসতে পারেন এমন মন্তব্য করে মি. ফারুক বলেন রাজনীতিতে যোগদান করা প্রতিটি মানুষের অধিকার। আর রাজনৈতিক দলগুলো চেষ্টা করে তাদের পাল্লা ভারী করার। তিনি বলেন এতে বাধা দিতে হলে জনগন ভোটের মাধ্যমে দেবে। এসময় মালেকা বেগম প্রশ্ন তোলেন অসৎ প্রার্থীকে কেন দলে নেয়া হবে? উত্তরে মি. ফারুক বলেন সব জোটেই অসৎ প্রার্থী আছে। এ প্রসঙ্গে মি. কাঞ্চন মন্তব্য করেন এরশাদের পর যে দুটি দল দেশ শাসন করেছেন তারা যে পরিমান দুর্নীতি করেছে তা এরশাদকেও ছাড়িয়ে গেছে। মি. মুহিত বলেন এরশাদকে অযথা অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়ে যাচ্ছে। তিনি মন্তব্য করেন মি. এরশাদকে তার দলই ত্যাগ করেছে। এসময় উপস্থাপক শাকিল আনোয়ার দর্শকদের কাছে জানতে চান তারা কি মনে করে এ ব্যাপারে। কণ্ঠ ভোট এবং হাত তুলে প্রায় সবাই জানান তাকে কোন জোটেই নেয়া উচিত না। মাত্র তিনজন দর্শক এরশাদের পক্ষে হাত তোলেন।
পরের প্রশ্ন ছিলো মগবাজার ঢাকা থেকে আসা কামারাম মুনিরা ইশিকা'র। তার প্রশ্ন ছিলো রাজনীতি থেকে একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে। তিনি জানতে চান নিরাপদ সড়কের জন্য যেসব আন্দোলন আমাদের দেশে আছে তা কতটুকু সফল। উত্তরে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, তার সংগঠনের দায়িত্ব ছিলো মানুষকে সচেতন করা এবং সে কাজে তিনি সফল হয়েছেন। তিনি বলেন এখন দরকার সড়ক নীতিমালা প্রণয়ন, এবং প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের ব্যবস্থা করা। মি. ফারুক স্বীকার করেন এসব ক্ষেত্রে সরকার গুলোর যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। মালেকা বেগম বলেন অনেক সময় লাইসেন্স নাই কিংবা অপ্রাপ্ত বয়স্করা গাড়ী নিয়ে বের হয়ে যায় যেটা বিপদের কারন। তিনি বলেন সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি জনগনের সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধ সড়ক নিরাপত্তার জন্য একইভাবে জরুরী । মি. মুহিত বলেন নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার জন্য অনেক মৌলিক উপাদান দেশে নেই। তিনি বলেন ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া হয় 'চুরিচামারীর' মধ্যে দিয়ে এবং ফিটনেস পরীক্ষাতেও আছে নানা গরমিল। তিনি বলেন এসব ব্যবস্থায় সংস্কার হওয়া দরকার। মগবাজার ঢাকা থেকে ফাহাদ রহমান প্রশ্ন রাখেন প্রধান উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রপতির হাতেই যেখানে বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দশজন উদেষ্টার কোন প্রয়োজন আছে কি? উত্তরে মি. মুহিত বলেন রাষ্ট্রপতির উচিত হয়নি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়া। তিনি বলেন রাষ্ট্রপতির এই পদ ছেড়ে দেয়া উচিত। আগেও প্রধান উপদেষ্টা নিজের হাতে অনেক পদ রেখেছেন, তবে সেসময় তিনি উপদেষ্টাদের একটি কমিটি করে দিতেন। কিন্তু এবার রাষ্ট্রপতি সচিবদের কামিটি গঠন করেছেন বলে মি. মুহিত অভিযোগ করেন।
এসময় এক দর্শক বলেন জাতি একটি খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নও তোলা যাচ্ছেনা। অন্য এক দর্শক বলেন উপদেষ্টাদের সাজিয়ে রাখার জন্যই যেন নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মি. ফারুক বলেন বিশেষ সাংবিধানিক সংকটের কারনেই রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহন করেছেন। তিনি বলেন রাষ্ট্রপতি যখন ক্ষমতা নেন তখন বিরোধী দল তার প্রতিবাদ করেনি। উপস্থিত দর্শকদের একজন বলেন জনগনের অধিকার আদায়ের জন্য সংবিধান ভাঙ্গতে হলে তাই করা উচিৎ। মালেকা বেগম মন্তব্য করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের তালিকা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে নেয়াটাই অসাংবিধানিক হয়েছে। | স্থানীয় লিংকস্ আলোচনার কেন্দ্রে নির্বাচন কমিশন06 নভেম্বর, 2006 | বিশেষ আয়োজন | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||