17 জুলাই, 2006 - প্রকাশের সময় 12:57 GMT
শাকিল আনোয়ার
ফিলিস্তিনী স্বশাসন এবং ধাপে ধাপে স্বাধীন ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে ১৯৯৩ এর এক চূক্তি, যা অসলো চুক্তি নামে পরিচিত, সমস্ত বিশ্বে আশার সঞ্চার করেছিল৷ কিনতু সে চুক্তির ১৩ বছর পরেও দু পক্ষের মধ্যে মীমাংসার পথ কার্যত বন্ধ৷ মীমাংসা ছেড়ে একতরফা সমাধানের পথে এগুচ্ছে ইসরায়েল৷ কিনতু ফিলিস্তিনীদের কথা, চাপিয়ে দেয়া সমাধান মানবে না তারা৷
অসার অসলো চুক্তি?
বর্তমান ইসরায়েলী উপপ্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেস অসলো চুক্তির প্রনেতা হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন৷ কিনতু চুক্তির এক যুগ পরেও এ অঞ্চলের মানুষ শান্তির কোন ছায়াও দেখছেন না ৷ তেল আবিবে তার অফিসে এক সাক্ষাৎকারে শিমন পেরেসকে জিজ্ঞেস করেছিলাম বহুল আলোচিত ঐ শান্তি চুক্তি কি তাহলে নিরর্থক ছিল৷
![]() | |
| ইসরায়েলী উপ-প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেস |
“ফিলিস্তিনীদের যে সরকার রয়েছে এখন, ঐ চুক্তি ছাড়া তা হত না৷ ফিলিস্তিনী এলাকার যে সীমানা এখন, তা থাকতো না৷ যে ৫০ শতাংশ ফিলিস্তিনী এখন সহিংসতা চায়না, সেটা ঐ চুক্তিরই ফসল“৷
একইসাথে শিমন পেরেস বললেন ইসরায়েলের ভেতর এখন যে সিংহভাগ মানুষ এ বিরোধের একটা শান্তিপূর্ন সমাধান চায়, সেটাও অসলো চুক্তির ফল৷
“কিছু ব্যার্থতা রয়েছে, কিনতু আমরা আমাদের সংকল্প বিসর্জন দিইনি ৷ ইতিহাসে বড় কোন কাজে এ ধরনের বাঁধা বিপত্তির বহু নজির রয়েছে“৻
তাকে জিজ্ঞেস করলাম এ সব বিপত্তি বা ব্যার্থতার জন্য কাকে দায়ী করেন তিনি?
“দায়ী করার মত কাইকে পাইনা৷ ফিলিস্তিনীদের সেটাই সমস্যা৷ সশস্ত্র বিদ্রোহীরাও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে পথ দেখিয়েছিলেন ৷ ফিলিস্তিনীদের আমি দোষ দিই না, কারণ সেরকম একজন নেতা তারা পায়নি“৷
শিমন পেরেস উত্তর দিলেন দেখুন প্রত্যেকেরই সবকিছুতেই দায় রয়েছে, কিনতু প্রধান দায় জাতির নিজের ৷ তাদের ভাগ্য নির্ধারনে তাদেরই অগ্রণী হয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে৷
“বিভেদে জর্জরিত হয়ে তারাই তাদের ভবিষ্যতকে হুমকির সামনে ফেলেছে৷ ফিলিস্তিনীদের মানতে হবে, বুঝতে তাদের প্রধান সমস্যা তারা নিজেরাই, ইসরায়েল নয়“৷
“ইয়াসের আরাফাত যদি সহিংসতার পথ ঝেড়ে ফেলে মীমাংসার পথ ধরতেন অনেক আগেই ফিলিস্তিনীরা রাষ্ট্র পেত৷ তারাই নিজেরাই সে সম্ভাবনা নষ্ট করেছে“৷
মীমাংসার জন্য অংশিদার নেই, এই যুক্তিতে ইসরাইল এখন সঙ্কটের একতরফা সমাধানের পথ ধরেছে, যার মূল দ্রষ্টা ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এ্যরিয়েল শ্যারন৷
গাযা থেকে একতরফা সৈন্য প্রত্যাহার করেছিলেন৷ সে পথ ধরেই তার উত্তরসূরী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট পশ্চিম তীরে একতরফা সীমান্ত নির্ধারনের শ্লোগান দিয়ে নির্বাচন জিতেছেন৷ শিমন পেরেসও এখন এই একতরফা সমাধানের অন্যতম সমর্থক৷
নিরাপত্তার যুক্তিতে পুরো পশ্চিম তীর জুড়ে ইসরাইল প্রায় ৬০০ কিমি দীর্ঘ যে দেয়াল তুলছে, সেটাকেই পরিকল্পিত সেই সীমান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে৷
![]() | |
| ডঃ ক্যামেরুন ব্রাউন, ইসরায়েলী রাজনীতির গবেষক |
ক্যামেরুন ব্রাউন ইসরাইলী রাজনীতির শীর্ষ একজন গবেষক৷ জেরুসালেমের গবেষনা সংস্থা গ্লোবাল রিসার্চ ফর ইন্টারন্যাশনাল এ্যফেয়ার্সের এই গবেষক বললেন ফিলিস্তিনীদের সাথে বিরোধে ইসরায়েলীদের ভেতর একধরনের ক্লান্তি এসেছে৷
তিনি বললেন অব্যাহত এ বিরোধের কারনে ইসরাইলের নিজের অভ্যন্তরীন সমস্যার পাহাড় জমছে৷ ধনী দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে৷ এজন্য এবারের নির্বাচনে অবিশ্বাস্য ফলাফল করেছে পেনশনার পার্টি ৷
কিনতু এই একতরফা সীমান্ত নির্ধারনের ব্যাপারে তীব্র আপত্তি তুলছে ফিলস্তিনীরা৷
ফিলিস্তিনী শহর রামাল্লার কাছে বীরজেত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রধান ডঃ সামির আওয়াদ বললেন ইসরায়েলী এই পরিকল্পনায় একটি ফিলিস্তিনী রাষ্ট্রের সম্ভাবনা নষ্ট হবে৷
“তারা স্পষ্ট বলছে ইহুদি বসতিগুলো গোটানো হবে না৷ তার অর্থ পশ্চিম তীরের বিশ শতাংশ জমি৷ পূর্ব জেরুসালেমকেও নিয়ে নিতে চাইছে৷ তার অর্থ আরো বিশ ভাগ৷ তারপর জডার্ন ভ্যালি নেয়ার কথা বলছে৷ আরো ১৫ ভাগ“৷
“পশ্চিম তীরের বাদ কি থাকবে“ ?
“বিচ্ছিন্ন টুকরো কিছু পৌরসভার মত অঞ্চল নিয়ে রাষ্ট্র তৈরী করে আদৌ কি কোন অর্থ রয়েছে? আমি বলব নেই“৷
ডঃ আওয়াদ বললেন ফিলিস্তিনীদের খুব পরিস্কার ভাষায় ইসরায়েলকে বলতে হবে যদি অর্থপূর্ন কোন রাষ্ট্র তেরীর সুযোগ তারা না দেয়, তাহলে বিকল্প হচ্ছে ইসরায়েলী ফিলিস্তিনী দু জাতির জন্য একটি অভিন্ন রাষ্ট্র গঠন৷
“এই স্বশাসন নেহাতই কাগজে কলমে ৷ ইসরায়েল যা চায় সেটাই করতে পারে৷ ফাতাহ থাকুক এবং হামাস থাকুক তাতে এ অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না“৷
ডঃ আওয়াদ বললেন অনেকে ফিলিস্তিনী এখন খোলাখুলি বলছেন এই ধরনের একটি সরকার থাকা বা না থাকায় কিছু এসে যায়না ৷ বরঞ্চ এতে দখলদারি হিসেবে ইসরাইল তার দায় দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে৷
“তাদের (ইসরায়েলকে) সরাসরি বলতে হবে তোমাদের ছ মাস সময় দিলাম, বল তোমরা সত্যিই একটা বাস্তবসম্মত ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র তৈরী হোক সেটা চাও কিনা৷ না হলে আমরা নিজেরাই আমাদের এই তথাকথিত স্বশাসন বা সরকারের ভবিষ্যত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব“৷
কিনতু তার ফিলিস্তিনীদের অভিন্ন এক জাতীয় কৌশল তৈরী করতে হবে৷ “দু:খজনক সেই পথে ফিলিস্তিনীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোন লক্ষন নেই,“ আক্ষেপ করলেন সামির আওয়াদ৷
![]() | |
| ফাতাহ এমপি আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ |
“দেয়াল দিয়ে এবং ইহুদি বসতিগুলো ইসরাইল রাষ্ট্রের মধ্যে নিয়ে ইসরাইল পশ্চিম তীরের ৫৮ শতাংশ দখল করতে চায়৷ স্বাধীন এবং টিকে থাকার মত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরীর সমস্ত সম্ভাবনা নষ্ট হবে৷ আমরা কোনদিন এটা মানব না“৷
“১৯৮৮ তে আমরা ঐতিহাসিক আপোষ করেছিলাম৷ আমরা মেনে নিয়েছিলাম আদি ফিলিস্তিনী ভূমির ২২ শতাংশতে আমাদের রাষ্ট্র হবে৷ সেই আপোষের ওপর আমরা আর আপোষ করতে পারিনা,“ মিঃ আব্দুল্লাহ বললেন৷
তিনি বললেন দেখুন ইসরাইলীদের মধ্যে একটা বিশ্বাস তৈরী হয়েছে, তারা যা কিছুই করুক, তাতে এই সমস্যার স্থায়ী কোন সমাধান হবেনা৷ হামাস ফিলিস্তিনী অঞ্চলে ক্ষমতায় আসার পর সে চিন্তা আরো দৃঢ় হয়েছে৷
সুতরাং তারা এখন চিন্তা করছে বিরোধের মাত্রা কমের মধ্যে কিভাবে রাখা যায়৷ “তারা পুরোপুরি সমাধানের কথা ভাবছে না, ভাবছে কিভাবে নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রাখা যায়,“ বললেন ডঃ ব্রাউন৷
“পুরো ৯০ এর দশক ধরে ইসরাইলী সমাজে যে বিতর্ক ছিল তা পুরো অঞ্চল কুক্ষিগত করা নিয়ে নয়৷ ইসরাইলের বিশ থেকে তিরিশ শতাংশের বেশী লোক কখনই চাইনি যে জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর সবটাই ইসরাইলের“৷
প্রধান যে প্রশ্ন ছিল, ডঃ ব্রাউন বললেন, ফিলিস্তিনীদের সাথে একটা চুক্তি করে আস্থা রাখা যাবে কিনা৷ ইয়াসের আরাফাতকে নিয়ে সবসময় দিধা দ্বন্দ ছিল৷ কিনতু হামাস আসার পর সেই দ্বিধা অন্তত দুর হয়েছে ৷ হামাস ইসরায়েলের অস্তিত্বই স্বিকার করেনা, সুতরাং তাদের সাথে কোন কথাই চলতে পারেনা৷
বিরোধের এই ব্যাবস্থাপনা কিভাবে করবে তা নিয়ে কি ভাবছে ইসরাইল?
ডঃ ব্রাউন বললেন অদুর ভবিষ্যতে পশ্চিম তীর থেকে একতরফা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা পুরোপুরি কার্যকর করা হবে সে সম্ভাবনা খুবই কম ৷
“বরঞ্চ অবস্থা সামাল দিয়ে দিয়ে একটা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা চলতে থাকবে৷ আত্মঘাতি হামলা ঠেকাতে দেয়াল তৈরী অব্যাহত থাকতে৷ প্রত্যন্ত ছোট ছোট ইহুদি বসতি প্রত্যাহার করা হবে৷ ফিলিস্তিনীদের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে৷ বেছে বেছে ফিলিস্তিনী জঙ্গীদের হত্যার নীতি চলতে থাকবে“৷