|
অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ১১ - সংঘাতের নতুন রেসিপি | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
ফিলিস্তিনী স্বশাসন এবং ধাপে ধাপে স্বাধীন ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে ১৯৯৩ এর এক চূক্তি, যা অসলো চুক্তি নামে পরিচিত, সমস্ত বিশ্বে আশার সঞ্চার করেছিল৷ কিনতু সে চুক্তির ১৩ বছর পরেও দু পক্ষের মধ্যে মীমাংসার পথ কার্যত বন্ধ৷ মীমাংসা ছেড়ে একতরফা সমাধানের পথে এগুচ্ছে ইসরায়েল৷ কিনতু ফিলিস্তিনীদের কথা, চাপিয়ে দেয়া সমাধান মানবে না তারা৷ অসার অসলো চুক্তি? বর্তমান ইসরায়েলী উপপ্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেস অসলো চুক্তির প্রনেতা হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন৷ কিনতু চুক্তির এক যুগ পরেও এ অঞ্চলের মানুষ শান্তির কোন ছায়াও দেখছেন না ৷ তেল আবিবে তার অফিসে এক সাক্ষাৎকারে শিমন পেরেসকে জিজ্ঞেস করেছিলাম বহুল আলোচিত ঐ শান্তি চুক্তি কি তাহলে নিরর্থক ছিল৷
মনে হল এ প্রশ্নে ঠিক স্বস্তি পেলেননা শিমন পেরেস৷ বললেন অসলো চুক্তির বিকল্প ছিল সন্ত্রাস এবং যুদ্ধ৷ “ফিলিস্তিনীদের যে সরকার রয়েছে এখন, ঐ চুক্তি ছাড়া তা হত না৷ ফিলিস্তিনী এলাকার যে সীমানা এখন, তা থাকতো না৷ যে ৫০ শতাংশ ফিলিস্তিনী এখন সহিংসতা চায়না, সেটা ঐ চুক্তিরই ফসল“৷ একইসাথে শিমন পেরেস বললেন ইসরায়েলের ভেতর এখন যে সিংহভাগ মানুষ এ বিরোধের একটা শান্তিপূর্ন সমাধান চায়, সেটাও অসলো চুক্তির ফল৷ “কিছু ব্যার্থতা রয়েছে, কিনতু আমরা আমাদের সংকল্প বিসর্জন দিইনি ৷ ইতিহাসে বড় কোন কাজে এ ধরনের বাঁধা বিপত্তির বহু নজির রয়েছে“৻ তাকে জিজ্ঞেস করলাম এ সব বিপত্তি বা ব্যার্থতার জন্য কাকে দায়ী করেন তিনি? “দায়ী করার মত কাইকে পাইনা৷ ফিলিস্তিনীদের সেটাই সমস্যা৷ সশস্ত্র বিদ্রোহীরাও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে পথ দেখিয়েছিলেন ৷ ফিলিস্তিনীদের আমি দোষ দিই না, কারণ সেরকম একজন নেতা তারা পায়নি“৷ জিজ্ঞেস করলাম দখলদারি দেশ হিসেবে ইসরায়েলের কি কোন দায়ই নেই এই ব্যার্থতার? শিমন পেরেস উত্তর দিলেন দেখুন প্রত্যেকেরই সবকিছুতেই দায় রয়েছে, কিনতু প্রধান দায় জাতির নিজের ৷ তাদের ভাগ্য নির্ধারনে তাদেরই অগ্রণী হয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে৷ “বিভেদে জর্জরিত হয়ে তারাই তাদের ভবিষ্যতকে হুমকির সামনে ফেলেছে৷ ফিলিস্তিনীদের মানতে হবে, বুঝতে তাদের প্রধান সমস্যা তারা নিজেরাই, ইসরায়েল নয়“৷ “ইয়াসের আরাফাত যদি সহিংসতার পথ ঝেড়ে ফেলে মীমাংসার পথ ধরতেন অনেক আগেই ফিলিস্তিনীরা রাষ্ট্র পেত৷ তারাই নিজেরাই সে সম্ভাবনা নষ্ট করেছে“৷ মীমাংসার জন্য অংশিদার নেই, এই যুক্তিতে ইসরাইল এখন সঙ্কটের একতরফা সমাধানের পথ ধরেছে, যার মূল দ্রষ্টা ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এ্যরিয়েল শ্যারন৷ গাযা থেকে একতরফা সৈন্য প্রত্যাহার করেছিলেন৷ সে পথ ধরেই তার উত্তরসূরী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট পশ্চিম তীরে একতরফা সীমান্ত নির্ধারনের শ্লোগান দিয়ে নির্বাচন জিতেছেন৷ শিমন পেরেসও এখন এই একতরফা সমাধানের অন্যতম সমর্থক৷ নিরাপত্তার যুক্তিতে পুরো পশ্চিম তীর জুড়ে ইসরাইল প্রায় ৬০০ কিমি দীর্ঘ যে দেয়াল তুলছে, সেটাকেই পরিকল্পিত সেই সীমান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে৷
যদিও গাযায় আবারো সেনা অভিযানের পর পশ্চিম তীর থেকে একতরফা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা আপাতত কার্পেটের নীচে চলে যাবে, সন্দেহ নেই৷ তবে সে পরিকল্পনা ঝেড়ে ফেলছেন, এরকম কোন কথা মি: ওলমার্ট এখনও বলেননি৷ ক্যামেরুন ব্রাউন ইসরাইলী রাজনীতির শীর্ষ একজন গবেষক৷ জেরুসালেমের গবেষনা সংস্থা গ্লোবাল রিসার্চ ফর ইন্টারন্যাশনাল এ্যফেয়ার্সের এই গবেষক বললেন ফিলিস্তিনীদের সাথে বিরোধে ইসরায়েলীদের ভেতর একধরনের ক্লান্তি এসেছে৷ তিনি বললেন অব্যাহত এ বিরোধের কারনে ইসরাইলের নিজের অভ্যন্তরীন সমস্যার পাহাড় জমছে৷ ধনী দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে৷ এজন্য এবারের নির্বাচনে অবিশ্বাস্য ফলাফল করেছে পেনশনার পার্টি ৷ তাছাড়া এ অবস্থা একইভাবে জিইয়ে রাখাও মুশকিল হয়ে পড়ছে, বললেন ডঃ ব্রাউন৷ আর্ন্তজাতিক জনমত ইসরায়েলের জন্য সুবিধের নয়৷ তাছাড়া দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখার খরচ বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে ৷ অবকাঠামো তৈরী করতে হচ্ছে৷ ছোট ছোট, বিচ্ছিন্ন ইহুদি বসতির নিরাপত্তা দিতে বিশাল খরচ হচ্ছে৷ “সে কারনেই এই চূড়ান্ত সীমান্তের এই সিদ্ধান্ত“৷ কিনতু এই একতরফা সীমান্ত নির্ধারনের ব্যাপারে তীব্র আপত্তি তুলছে ফিলস্তিনীরা৷ ফিলিস্তিনী শহর রামাল্লার কাছে বীরজেত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রধান ডঃ সামির আওয়াদ বললেন ইসরায়েলী এই পরিকল্পনায় একটি ফিলিস্তিনী রাষ্ট্রের সম্ভাবনা নষ্ট হবে৷ “তারা স্পষ্ট বলছে ইহুদি বসতিগুলো গোটানো হবে না৷ তার অর্থ পশ্চিম তীরের বিশ শতাংশ জমি৷ পূর্ব জেরুসালেমকেও নিয়ে নিতে চাইছে৷ তার অর্থ আরো বিশ ভাগ৷ তারপর জডার্ন ভ্যালি নেয়ার কথা বলছে৷ আরো ১৫ ভাগ“৷ “পশ্চিম তীরের বাদ কি থাকবে“ ? “পূর্ব জেরুসালেম, পশ্চিম তীরের প্রাণ৷ তারপর জডার্ন ভ্যালি, যেখানে পানি আছে, ফসল হয়৷ এ জায়গাগুলো নেয়ার পর যে রাষ্ট্র ফিলিস্তিনীরা পাবে তার অর্থনৈতিক, ভৌগলিক কোন ভিত্তিই থাকবে না“৷
“বিচ্ছিন্ন টুকরো কিছু পৌরসভার মত অঞ্চল নিয়ে রাষ্ট্র তৈরী করে আদৌ কি কোন অর্থ রয়েছে? আমি বলব নেই“৷ ডঃ আওয়াদ বললেন ফিলিস্তিনীদের খুব পরিস্কার ভাষায় ইসরায়েলকে বলতে হবে যদি অর্থপূর্ন কোন রাষ্ট্র তেরীর সুযোগ তারা না দেয়, তাহলে বিকল্প হচ্ছে ইসরায়েলী ফিলিস্তিনী দু জাতির জন্য একটি অভিন্ন রাষ্ট্র গঠন৷ তিনি বললেন স্বশাসনের নামে ফিলিস্তিনীদের যা দেয়া হয়েছে, তা থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো “এই স্বশাসন নেহাতই কাগজে কলমে ৷ ইসরায়েল যা চায় সেটাই করতে পারে৷ ফাতাহ থাকুক এবং হামাস থাকুক তাতে এ অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না“৷ ডঃ আওয়াদ বললেন অনেকে ফিলিস্তিনী এখন খোলাখুলি বলছেন এই ধরনের একটি সরকার থাকা বা না থাকায় কিছু এসে যায়না ৷ বরঞ্চ এতে দখলদারি হিসেবে ইসরাইল তার দায় দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে৷ “তাদের (ইসরায়েলকে) সরাসরি বলতে হবে তোমাদের ছ মাস সময় দিলাম, বল তোমরা সত্যিই একটা বাস্তবসম্মত ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র তৈরী হোক সেটা চাও কিনা৷ না হলে আমরা নিজেরাই আমাদের এই তথাকথিত স্বশাসন বা সরকারের ভবিষ্যত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব“৷ কিনতু তার ফিলিস্তিনীদের অভিন্ন এক জাতীয় কৌশল তৈরী করতে হবে৷ “দু:খজনক সেই পথে ফিলিস্তিনীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোন লক্ষন নেই,“ আক্ষেপ করলেন সামির আওয়াদ৷
রামাল্লায় ফিলিস্তিনী সংসদে তার কক্ষে বসে কথা হচ্ছিল সাবেক ফিলিস্তিনী উপ-পরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্ত্রী এবং ফাতাহ এম পি আবদুল্লাহ আব্দুল্লাহ র সাথে৻ বললেন একতরফা সীমানা নির্ধারনের এ উদ্যোগ এ অঞ্চলে সংঘাতের নতুন রেসিপি৷ “দেয়াল দিয়ে এবং ইহুদি বসতিগুলো ইসরাইল রাষ্ট্রের মধ্যে নিয়ে ইসরাইল পশ্চিম তীরের ৫৮ শতাংশ দখল করতে চায়৷ স্বাধীন এবং টিকে থাকার মত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরীর সমস্ত সম্ভাবনা নষ্ট হবে৷ আমরা কোনদিন এটা মানব না“৷ “১৯৮৮ তে আমরা ঐতিহাসিক আপোষ করেছিলাম৷ আমরা মেনে নিয়েছিলাম আদি ফিলিস্তিনী ভূমির ২২ শতাংশতে আমাদের রাষ্ট্র হবে৷ সেই আপোষের ওপর আমরা আর আপোষ করতে পারিনা,“ মিঃ আব্দুল্লাহ বললেন৷ সুতরাং যে পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে ইসরাইল সংঘাত এড়িয়ে থাকতে চাইছে, ফিলিস্তিনীরা তাতে সায় না দিলে তা কিভাবে সম্ভব হবে ? জিজ্ঞেস করেছিলাম ডঃ ক্যামেরুন ব্রাউনকে তিনি বললেন দেখুন ইসরাইলীদের মধ্যে একটা বিশ্বাস তৈরী হয়েছে, তারা যা কিছুই করুক, তাতে এই সমস্যার স্থায়ী কোন সমাধান হবেনা৷ হামাস ফিলিস্তিনী অঞ্চলে ক্ষমতায় আসার পর সে চিন্তা আরো দৃঢ় হয়েছে৷ সুতরাং তারা এখন চিন্তা করছে বিরোধের মাত্রা কমের মধ্যে কিভাবে রাখা যায়৷ “তারা পুরোপুরি সমাধানের কথা ভাবছে না, ভাবছে কিভাবে নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রাখা যায়,“ বললেন ডঃ ব্রাউন৷ “পুরো ৯০ এর দশক ধরে ইসরাইলী সমাজে যে বিতর্ক ছিল তা পুরো অঞ্চল কুক্ষিগত করা নিয়ে নয়৷ ইসরাইলের বিশ থেকে তিরিশ শতাংশের বেশী লোক কখনই চাইনি যে জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর সবটাই ইসরাইলের“৷ প্রধান যে প্রশ্ন ছিল, ডঃ ব্রাউন বললেন, ফিলিস্তিনীদের সাথে একটা চুক্তি করে আস্থা রাখা যাবে কিনা৷ ইয়াসের আরাফাতকে নিয়ে সবসময় দিধা দ্বন্দ ছিল৷ কিনতু হামাস আসার পর সেই দ্বিধা অন্তত দুর হয়েছে ৷ হামাস ইসরায়েলের অস্তিত্বই স্বিকার করেনা, সুতরাং তাদের সাথে কোন কথাই চলতে পারেনা৷ “সুতরাং ইসরাইলের ভেতর ডান বাম নির্বিশেষে একটা ঐক্যমত্য হয়েছে যে ফিলিস্তিনীরা একটি চূড়ান্ত সামগ্রিক নিস্পত্তিতে পৌছুনোর জন্য এখনও প্রস্তুত নয়৷ ইসরায়েলী রাজনীতিকরা তাই ভাবছেন আপাতত তাদের এই বিরোধ ব্যাবস্থাপনা করে যেতে হবে“৷ বিরোধের এই ব্যাবস্থাপনা কিভাবে করবে তা নিয়ে কি ভাবছে ইসরাইল? ডঃ ব্রাউন বললেন অদুর ভবিষ্যতে পশ্চিম তীর থেকে একতরফা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা পুরোপুরি কার্যকর করা হবে সে সম্ভাবনা খুবই কম ৷ “বরঞ্চ অবস্থা সামাল দিয়ে দিয়ে একটা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা চলতে থাকবে৷ আত্মঘাতি হামলা ঠেকাতে দেয়াল তৈরী অব্যাহত থাকতে৷ প্রত্যন্ত ছোট ছোট ইহুদি বসতি প্রত্যাহার করা হবে৷ ফিলিস্তিনীদের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে৷ বেছে বেছে ফিলিস্তিনী জঙ্গীদের হত্যার নীতি চলতে থাকবে“৷ | স্থানীয় লিংকস্ অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ১০ - ফ্রন্টলাইন জেরুসালেম20 জুলাই, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ৯ - ইহুদিরাষ্ট্রের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় 12 জুলাই, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ৮ - একের মুক্তিসংগ্রাম অন্যের কাছে সন্ত্রাস 22 জুন, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ৭ - জীবন প্রবহমান 22 জুন, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ৬ - স্বপ্নের বাণিজ্যিক রাজধানী 15 জুন, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৫ - ইহুদি বসতি তেকোয়া 01 জুন, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৪ - ঠিকানা শরণার্থী শিবির 25 মে, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৩ - কালান্দিয়া চেকপয়েন্ট 18 মে, 2006 | Lei | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||