|
অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ৯ - ইহুদিরাষ্ট্রের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
ইসরাইলের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব বা ফিলিস্তিনী, যারা ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির পরও নিজের জায়গায় থেকে গিয়েছিলেন ৷ কাগজে কলমে তাদের পরিচয় তারা ইসরাইলী আরব৷ ভূমির আদি বাসিন্দা হয়েও এই ইহুদি রাষ্ট্রে তারা নিতান্তই প্রান্তিক এক জনগোষ্ঠি৻ জাফার সিরি পরিবার তেল আবিবের প্রায় লাগোয়া শহর জাফা৷ শহরের চল্লিশ শতাংশই ফিলিস্তিনী আরব৷ জাফার একটি আরব মহল্লার বাসিন্দা লানা সিরি এবং তার স্বামী খদর সিরি৷ দুজনেই ছোট খাট চাকরি করেন৷ বেড়াতে এসেছিলেন লানার ভাই সামাহ আবু শাদেহ ৷ তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র৷ তিনজনেরই জন্ম এই জাফাতেই৷ জিজ্ঞেস করলাম ইসরায়েলী আরব পরিচয় নিয়ে কেমন আছেন তারা ইসরাইলে? ইসরায়েলী আরব সম্মোধনে যেন ফুসে উঠলেন লানা৷ বললেন ইসরাইলী আরব নয়৷ “আমি আরব, তার চেয়ে বড় পরিচয় আমি ফিলিস্তিনী“৷ তাকে থামাতে তার স্বামী বললেন তোমার পরিচয় পত্রে তো সেটাই লেখা৷ “আমাকে তো আত্মপরিচয় পছন্দ করে নেয়ার কোন সুযোগ দেয়া হয়নি৷ আমাকে তো বলা হয়নি তুমি কিভাবে পরিচিত হতে চাও৷ তারাই আমার গায়ে ইসরাইলী আরবের তকমা লাগিয়ে দিয়েছে,“ কন্ঠে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে বললেন লানা৻ মুহুর্তেই বোঝা গেল আত্মপরিচয় নিয়ে কতটা দ্বন্দের মধ্যে জীবন যাপন করছেন ইসরায়েলের আরব অর্থাৎ ফিলিস্তিনী জনগোষ্ঠি, যারা ইসরায়েল রাষ্ট্র সৃষ্টির পরেও নিজভূমে রয়ে গিয়েছিলেন৷ ধীরে ধীরে ঐ তিনজনের সঙ্গে কথায় ক্রমেই স্বচ্ছ হতে থাকলো কেন একই দেশে দুই জাতি দশকের পর দশক কার্যত বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করছে৷
“ধরুন পুলিশ একজন আরবকে আটকাল, একজন ইহুদিকে আটকাল৻ দুজনের প্রতি তাদের আচরণ হবে আলাদা“৷ সামাহ আবু শাদেহ ইতিহাসে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ে পি এচ ডি করছেন৷ ঝরঝরে ইংরিজি ৻ বললেন লেখাপড়া করে ভবিষ্যত কি হবে, জানেন না ৻ “আরবদের জন্য সবচে বড় সমস্যা যেটা, তা হল লেখাপড়া যত বেশী করবে, চাকরির সুবিধে তাদের তত কমবে৷ ভালো চাকরি সবই ইহুদিদের“৷ প্রতিদিনের মনস্তাত্বিক যুদ্ধ আবু শাদেহ বললেন প্রতিদিনের জীবনযাপনে বৈষম্য হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেন তিনি৻ “এদেশের প্রথম সারির পত্র পত্রিকা, টিভিতেও প্রতিদিন শুনবেন তারা গুনছে দেশে আরবদের সংখ্যা এখন কত৷ মানুষজন খোলাখুলি বলছে আরবদের সংখ্যা বাড়ার মানে এদেশের জন্য তার পরিণত ভয়াবহ“৷ বললেন শুনলে ভীষন অপমানিত লাগে৻ ফিলিস্তিনী হিসেবে নিত্যদিনের মনস্তাত্বিক সংকটের কথা তুললেন আবু শাদেহ৻ “ধরুন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র৷ ইসরায়েলে এটা খুব স্বাভাবিক বিষয় যে অধিকাংশ ছাত্র সৈনিক৷ তারা তাদের অস্ত্র ঝুলিয়ে ক্লাসে আসে৷ আমরা জানি এই সৈন্যরাই ফিলিস্তিনীদের নির্যাতন করছে, হত্যা করছে৷ ফিলিস্তিনী হয়েও দিনের পর দিন মেনে নিতে হয়“৷ বললেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা, যাদের অধিকাংশই দাবী করেন তারা উদারপন্থি , তারাও একজন আরব ছাত্রের চেয়ে একজন ইহুদি ছাত্রকে ভিন্ন চোখে দেখেন৷ “একজন ইহুদি ছাত্র যখন যখন সেনাবাহিনীকে ঢুকছে সে তার পরীক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে, পেপার জমা দেয়ার ক্ষেত্রে বেশী সময় পায়“৷ স্কুল পার হওয়ার পর সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষন ইসরায়েলে বাধ্যতামুলক, তবে আরবদের জন্য ছাড় রয়েছে, এবং সেনাবাহিনীতে আরবরা যায় না বললেই চলে৻ তারপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুনোর পর, ইসরায়েলে এটা স্বাভাবিক একটি ব্যাপার যে একই যোগ্যতার একজন ইহুদি একজন আরবের চেয়ে চাকরির ক্ষেত্রে অনেক সুবিধে পাবে৷ “বড় বড় কোম্পানি, ব্যবসার নিয়ন্ত্রক প্রায় সবাই ইহুদি৷ সেখানেও চাকরিতে একই অবস্থা“৷ লানা সিরি চাকরি করেন জাফার আরব-ইহুদি সেন্টারে৷ দু সম্প্রদায়ের সহাবস্থানে উৎসাহ দিচ্ছে বেসরকারী এই প্রতিষ্ঠান৷ বললেন এর বাইরে গিয়ে চাকরির কথা কখনই ভাবেন না তিনি “আমি সবসময় চাই আমি যেন আরব পরিবেষ্টিত কোন জায়গায় কাজ করতে পারি৷ আমার সবসময় মনে হয় ইহুদিদের সাথে কাজ করতে গেলে তারা আমাকে ছোট চোখে দেখবে“৷ বিচ্ছিন্ন সমান্তরাল জীবন দুই সম্প্রদায়ের পরস্পরের প্রতি সন্দেহ, অবিশ্বাস ইসরায়েলে রাখ-ঢাকের কোন বিষয় নয়৷ একই দেশের মধ্যে তাদের বিচ্ছিন্ন সমান্তরাল জীবন যাপন৷ আরবদের বসবাস যে সব শহরে, সেখানে কোন ইহুদির দেখা পাওয়া যাবেনা৷ উল্টোটাও একইভাবে সত্যি৷ মূলধারার রাজনীতির সাথে আরবদের যোগাযোগ নেই বললেই চলে৷ তাদের রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক দল৷ শুধু আরবদের ভোটে যে নয়-দশ জন প্রতিবার নির্বাচনে সংসদে যান তাদের অনেককেই ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি তাদের অনুগত্য নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন শুনতে হয়৷ জনসংখ্যার ২০ শতাংশ হয়েও এখন পর্যন্ত একজন আরবও এখনও পর্যন্ত ইসরায়েলে মন্ত্রী হয়নি৷ নাদিয়া হিলো জাফারই একজন আরব মহিলা এই প্রান্তিক অবস্থান থেকে ইসরায়েলী সমাজের মূল ধারায় ঢোকার চেষ্টায় নেমেছেন৷ নাদিয়া হিলো প্রথম কোন আরব যিনি লেবার পার্টির মত ইসরাইলের কোন শীর্ষ একটি দলের টিকেটে সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন এবার৷
জাফার এক ক্যাফেতে বসে কথা হচ্ছিল নাদিয়া হিলোর সাথে৻ “দেখুন ৫৭ বছর পরেও আরব দলগুলো বসময়ই বিরোধী দলেই তারা থাকবে৷ বিরোধী দলে বসে তারা শুধু কথা বলছে ৷ গনতন্ত্রে কথার প্রয়োজন রয়েছে৷ কিনতু সাধারন আরবরা এখন সমাধান চাইছে“৷ বরলেন যে মানুষের কাজ নেই, ঘরে পয়সা নেই, শুধু জীবীকার কথা ভাবছে৷ “তারা সবসময় শুধু ভাবছে না আমি আরব, আমি ফিলিস্তিনী৷ তার প্রধান চিন্তা তার জীবনধারন“৷ নাদিয়া হিলোর কথা সেই সমস্যার সমাধান করতে হলে বড় কোন দলের অংশ হতে হবে৷ রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পক্রিয়ার অংশ হতে হবে৷ ইহুদি জনগোষ্ঠির সাথে অংশিদারিত্বের একটা সম্পর্ক গড়তে হবে৷ “আরব হিসেবে এককভাবে এদেশে কখনই আমরা আমাদের অবস্থার উন্নতি করতে পারবনা“৷ আমার প্রতিবেশী ইহুদি যেন আমার হয়ে আমার অধিকারের জন্য লড়ে সে পরিস্থিতি তৈরী করতে হবে৷ না হলে বেশীদুর এগুনো যাবেনা ৷ আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি সেটা বুঝেছি“৷ ইসরায়েলে আরব সম্প্রদায় এখনো নাদিয়া হিলোর মত আত্মবিশ্বসী হতে পারছেন না৷ আরব সম্প্রদায়ের অধিকাংশ নেতাই মনে করেন ইসরায়েল রাষ্ট্রের মৌলিক যে চরিত্র অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটি একটি ইহুদি রাষ্ট্র হওয়ায় আরবদের সবসময় একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠি হয়েই থাকতে হবে৷ জাতীয় সংখ্যালঘুর মর্যাদা
আহমেদ তিবি৷ ইসরায়েলী সংসদের একজন আরব সদস্য৷ নাদিয়া হিলোর তীব্র সমালোচক৻ তার কথা, ইহুদি রাষ্ট্রে বিশ্বাসী একটি দলে ঢুকে তাদের ইমেজ বাড়ানো ছাড়া নাদিয়া কিছুই করতে পারবেন না৻ ইসরায়েলের ফিলিস্তিনী আরব অধ্যূষ্যিত তাইবে শহরে তার অফিসে বসে কথা হচ্ছিল৷ আহমেদ তিবি বললেন একইসাথে একটি ইহুদি রাষ্ট্র এবং গনতান্ত্রকি রাষ্ট্র হওয়াটাই ইসরায়েলের প্রধান সমস্যা৷ “ইহুদি রাষ্ট্রের এই তকমার কারনে এখানে একজন ইহুদি নাগরিকের অধিকার অন্য নাগরিকদের চেয়ে বেশী৷ এ জন্যই প্রতিটি ক্ষেত্রে আরবরা বৈষ্যমের স্বিকার“৻ নিজের শহর তাইবের উদাহরন টানলেন৷ বললেন একই মাপের আশে পাশের যে কোন ইহুদি শহরের উন্নয়ন বাজেট তাইবের চেয়ে দশ গুন৷ “ফলে ইহুদিরা এগুচ্ছে, আমরা পেছুচ্ছি ৷ কোন গনতন্ত্রে এটা হতে পারেনা“৷ আহমেদ তিবি এবং অন্য কজন আরব রাজনীতিক দাবী তুলেছেন আরব জনগোষ্ঠিকে ইসরায়েলে জাতীয় সংখ্যালঘুর মর্যাদা দেয়া হোক৷ যেমন কানাডায় রয়েছে৷ “রাষ্ট্রকে সমস্ত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে৷ রাষ্ট্র শুধু একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠির প্রতিভু হতে পারেনা“৷ তাকে জিজ্ঞেস করলাম জাতীয় সংখ্যালঘুর মর্যাদা আরবদের কি সুবিধে দেবে ? মিঃ তিবি বললেন মৌলিক পরিবর্তন আসবে৷ সাংবিধানিকভাবে তখন সংখ্যালঘুদের যে কোন আইনে, যেটা তাদের স্বার্থের পরিপন্থি, তাতে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা থাকবে৷ যেমন কানাডায় রয়েছে৷ এই দাবী কখনও গৃহিত হবে, ইসরায়েলের ইলের আরব জনগোষ্ঠি সেটা স্বপেও দেখেননা৻ জানেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠির সদিচ্ছেই তাদের প্রধান ভরসা৷ ক্নেসেটের দশজন আরব এম পি এবং বামপন্থি কিছু দলের কথার গুরুত্ব সেখানে নিতান্তই গুরুত্বহীন৷ | স্থানীয় লিংকস্ অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ৮ - একের মুক্তিসংগ্রাম অন্যের কাছে সন্ত্রাস 22 জুন, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ৭ - জীবন প্রবহমান 22 জুন, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ৬ - স্বপ্নের বাণিজ্যিক রাজধানী 15 জুন, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৫ - ইহুদি বসতি তেকোয়া 01 জুন, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৪ - ঠিকানা শরণার্থী শিবির 25 মে, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৩ - কালান্দিয়া চেকপয়েন্ট 18 মে, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ২ - সন্ত্রস্ত নেতানিয়া12 মে, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি05 মে, 2006 | Lei | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||