|
অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ৭ - জীবন প্রবহমান | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
প্রায় চার দশকের ইসরাইলী দখলদারিত্ব ফিলিস্তিনীদের জীবনের রন্ধ্রে গিয়ে ঢুকেছে৷ চেক পয়েন্ট, অবরোধ, সেনা অভিযান -- দখলদারিত্বের এ সব উপসর্গ থেকে তাদের সরে থাকার কোন উপায় নেই৷ কিনতু তার ভেতরেও ফিলিস্তিনীদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের আকাঙ্খা চোখে পড়ার মত৷ আল কাসাভা থিয়েটার পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনী শহর রামাল্লার কেন্দ্রে আল কাসাভা থিয়েটার৷ সিনেমার পাশাপাশি এখানে নাটক, থিয়েটার, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়৷ শহরের বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র বলা যায় আল কাসাভাকে৷ মার্চের শেষে মিশরীয় চলচ্চিত্রের এক উথসব চলছিল আল কাসাভায় ৷ বিকেলের শো শেষে বেশ কজনের সাথে আলাপ হল-- কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে মেয়ে থেকে শুরু করে, সাধারন গৃহবধূ, শিক্ষক, চলচ্চিত্র নির্মাতা এরকম অনেকের সাথে৷ একদল ছাত্রের সাথে কথা বলার ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম এই দখলদারিত্বের জীবনে সিনেমা উপভোগের প্রেরণা তারা কিভাবে পান৷ রামাল্লার উপকন্ঠে আবুদিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোহান্নাস উত্তর দিলেন উপভোগ নয়, উপভোগের চেষ্টা৷ কিছুক্ষনের মধ্যেই হাসি আর খুনসুটি ছাপিয়ে তাদের কন্ঠে স্পষ্ঠ হতে থাকলো ক্ষোভ আর হতাশা৷ “আমি আমার দেশের সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতে চাই৷ কিনতু পারি না৷ এখানে আপনি শুধু স্বপ্ন দেখতে পারেন ৷ কিনতু কিছু করার ক্ষমতা আপনার হাতে নয়,“ মোহান্নাস বলল৷ মুহুর্তে বোঝা গেল এই একটা শহরের গন্ডিতে জীবন যাপনে এসব তরুন কতটা মানসিক চাপের ভেতর৷ কথা হল আদিলা লাইদির সাথে৷ বীরজেত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক৷ পুরো অবয়বে আধুনিকতা, রুচি আর শিক্ষার স্পষ্ট ছাপ৷ আল কাসাভার নিয়মিত দর্শক তিনি৷ বললেন পৃথিবীর যে কোন দেশে যে কোন সাধারন মানুষ যে কারনে সিনেমা দেখতে আসে, তিনিও সে কারনেই এখানে৷ “এটা ঠিক যে আমরা দখলদারিত্বের মধ্যে রয়েছি, কিনতু আমরা স্বভাবিক মানুষ“৷ “দখলদারিত্বের মধ্যে আছি বলে আমরা তো সারাক্ষন মনকষ্ট নিয়ে বসে থাকতে পারিনা৷ অনেক মানুষ তাই যখন যতটা সম্ভব বিনোদেনের সুযোগ খোঁজে“৷ চলচ্চিত্রকার রায়েদ অন্দোনি আদিলা লাইদি পরিচয় করিয়ে দিলেন ফিলিস্তিনী চলচ্চিত্রকার রায়েদ আন্দোনির সাথে৷ ১৯৯৮ থেকে চলচ্চিত্র নির্মান করছেন তিনি ৷ তার খ্যাতি এখন আর্ন্তজাতিক স্তরে৻ বছরের অধিকাংশ সময় এখন দেশের বাইরে থাকেন ৷ তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র, যেটি ফ্রান্সের টিভি চ্যানেল আর টি এফের জন্য বানানো, তার চিত্রায়ন হয়েছে রামাল্লা, নাজারেথ এবং প্যারিসে৷
শুরুতেই বললেন জীবন যাপনের বাস্তবতা তার অনুভূতিকে অনেকটাই আলোড়িত করছে ৷ তার ছবিতেও তার প্রতিফলন হয় ৷ “কিনতু তার অর্থ এই নয় যে আমরা শুধু সে কথাই সারাদিন ভাবি“৷ অন্দোনির সদ্য বানানো প্রামান্য চলচ্চিত্রটির উপজিব্য নাজারেথের এক সঙ্গীত পরিবার৷ তিন ভাই৷ বড় দু ভাই গাইয়ে৷ ছোট ভাইও সে পথে যেতে চায় ৷ কিনতু বাবা স্বস্তি পাচ্ছেন না৷ পরিবারের মধ্যে প্রজেন্মর দ্বন্দ্ব৷ সারা পৃথিবীর সাধারন গল্প৷ মোটা দাগে ইসরাইলী দখলদারিত্ব বা ফিলিস্তিনী প্রতিরোধের গল্প নয়৷ “পৃথিবীর যে কোন জায়গায় যে কোন সাধারন মানুষের মত আমাদের জীবনেও নানারকম অনেক গল্প রয়েছে ৷ আমাদের সঙ্গীত, আমাদের সংস্কৃতি,“ আন্দোনি বললেন৷ কিনতু একইসাথে বললেন : “এই বিচ্ছিরি বাস্তবতাও সর্বক্ষন আমাদের ঘিরে রয়েছে ৷ আমার প্রতিদিনের জীবনের ছোট ছোট বিষয়গুলোও সেই বাস্তবতা নিয়ন্ত্রন করছে ৷ আমি ইচ্ছেমত ঘুরতে ফিরতে পারিনা৷ পাশের বেথলেহেমে এক মাসেও একবার মাকে দেখতে যেতে পারিনা“৷ “আমার এই বাস্তবতাকে আমি অস্বিকার করতে চাইনা, পারিওনা ৷ কারন দখলদারিত্বের জীবন সবচে জঘন্য জীবন৷ তারপরও আমি চাই না এই যন্ত্রনা আমার ভেতরে সর্বক্ষন চেপে থাকুক৷ আমি একজন স্বাভাবিক মানুষের মত পৃথিবীর সবকিছু নিয়ে ভাবতে চাই“৷ আল ফুনুন আল কাসাভার অদুরে ফিলিস্তিনী পপুলার আর্ট সেন্টার৷ ফিলিস্তিনী অঞ্চলে নাচ,গান,সংস্কৃতি চচ্র্চার মূল কেন্দ্র বলা যায় এই সেন্টারকে৷ এ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই গত বিশ বছর ফিলিস্তিনী পারফর্মিং আর্ট নতুন জীবন পাচ্ছে৷ আলফুনুনের মত নৃত্যগোষ্ঠি গড়ে উঠেছে, যারা এখন সারা পৃথিবী ঘুরে অনুষ্ঠান করছে৷
সন্ধ্যেয় আর্ট সেন্টারের একটি হলঘরে নাচের অনুশীলন চলছিল৷ শেখাচ্ছিলেন আলফুনুনের অন্যতম স্থপতি ওমর আল বারগুতি৷ বললেন ফিলিস্তিনী ঐতিহ্যবাহি নাচের সাথে আধুনিক পশ্চিমা নাচের সংমিশ্রন করার চেষ্টা করছেন তারা ৷ বললেন দখলদারিত্বের কারনে সৃজনশীলতা ভেসে যাবে তা হয়না৻ “বৃটেনে বা আমেরিকা বা অন্য যে কোন দেশে নাচ যেমন গুরুত্বপূর্ন, ফিলিস্তিনীনেও তাই ৷ অন্য সব জাতির মত আমরাও নাচের মাধ্যমে আবেগ, অনুভূতি, আত্মপরিচয় প্রকাশের চেষ্টা করছি,“ ওমর বারগুতি বললেন৷ “আমাদের সেই পরিচয়ের একটি অংশ আমরা পরাধীন, কিনতু সেটাই আমাদের একমাত্র পরিচয় নয়“৷ ইমান হামুরী ১৯৮০ র দশকে প্রথম ইন্তিফাদার সময় প্রতিষ্ঠিত এই আর্ট সেন্টারের পরিচালক ইমান হামুরী ৷ বললেন দখলদারিত্বের গ্রাস থেকে ফিলিস্তিনীদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ধরে রাখা এখন বিরাট এক চ্যালেঞ্জ৷ “দখলদারিত্ব শুধু যে আমাদের রাজনৈতিক পরিচয় ধ্বংস করছে তাই নয়, আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য গ্রাস করার চেষ্ট করছে৷ আমরা সেটাকে যেটুকু পারি ঠেকানোর চেষ্টা করছি,“ ইমান হামুরী বললেন৷ “তারা (ইসরাইলীরা) দাবী করে ফিলিস্তিনীদের ঐতিহ্যবাহি যে পোশাক সেটা নাকি তাদের৷ এমনকি আমাদের খাদ্যও নাকি তাদের“৷ বললেন লোকজ দেশাত্ববোধক গানের ক্যাসেটা বের করার জন্যও এক শিল্পীকে ইসরাইলীরা ছ মাস জেলে ভরে রেখেছিল৷ প্রথম ইন্তিফাদার সময় সেটা৷ কজন নৃত্যশিল্পিকেও জেলে ভরা হয়েছিল৷ ইমান হামুরী আক্ষেপ করে বললেন এখনও তাদের দলের অনেক শিল্পী দেশের বাইরে যেতে পারেনা৷ “এমনকি গাজায় যেতে পারিনা আমরা ৷ জেরুসালেম যেতে পারিনা“৷
ইমান হামুরী দাবী করলেন পরাধীনতার অজুহাতে কোন ধরনের স্থুলতাকে তারা প্রশ্রয় দেন না৷ “কোনভাবেই মনে জায়গা দিই না যে পরাধীন বলে মানুষ আমাদের মান নিয়ে মাথা ঘামাবে না, আমাদের ত্রুটি ক্ষমা করে দেবে৷ বরঞ্চ আমরা যেখানেই অনুষ্ঠান করতে যাই, আমাদের যন্ত্রপাতির চাহিদা, ব্যাবহার দেখে তারা বিস্মিত হয়“৷ ইমান হামুরী বললেন দখলদারিত্বের মধ্যে সৃজনশীলতা ধরে রাখা কষ্টের ৷ “মাঝে মধ্যে সৈন্যদের নির্মম আচরনের পেছনে কোন যুক্তি থাকেনা৷ ইচ্ছে করে অপদস্ত করে৷ আসলে ফিলিস্তিনীদের মর্যাদাবোধ, স্পৃহাকে ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করছে তারা৷ কিনতু তাদের এ আচরন আমাদের আরো শক্তি যোগাচ্ছে“৷ বললেন এমনকি মাঝে মাঝে দুর্ভোগ নিয়েও ফিলিস্তিনীরা কৌতুক করতে শিখেছে৷ চেক পয়েন্টে কার কি অভিজ্ঞতা, কেউ জেল থেকে বেরুলে সেখানে তারা কি করত, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের সাথে কেমন আচরন করা হয়েছে এসব নিয়ে গল্প হয়৷ হাসি ঠাট্টা হয়৷ হাসতে হাসতে বললেন : “আরবীতে একটা প্রবাদ আছে যখন আপনি মহাসঙ্কটে পড়বেন, তখন প্রাণ খুলে হাসুন ৷ তাতে সেই সঙ্কট থেকে উত্তরনের কিছুটা শক্তি অন্ততঃ পাওয়া যাবে“৷ ইমান হামুরী বললেন ফিলিস্তিনীরা যেন জ্ঞানে অজ্ঞানে ঐ প্রবাদকেই অনুসরন করতে শিখেছে৻ | স্থানীয় লিংকস্ অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ৬ - স্বপ্নের বাণিজ্যিক রাজধানী 15 জুন, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৫ - ইহুদি বসতি তেকোয়া 01 জুন, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৪ - ঠিকানা শরণার্থী শিবির 25 মে, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৩ - কালান্দিয়া চেকপয়েন্ট 18 মে, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ২ - সন্ত্রস্ত নেতানিয়া12 মে, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি05 মে, 2006 | Lei | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||