|
অবরুদ্ধ পূণ্যভূমি ৬ - স্বপ্নের বাণিজ্যিক রাজধানী | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
একসময় নাবলুস ছিল ফিলিস্তিনী অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের প্রানকেন্দ্র৻ প্রয়াত ইয়াসের আরাফাত বলেছিলেন স্বাধীন ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র হলে নাবলুস হবে সেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক রাজধানী ৷ অবশ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের সে স্বপ্ন এখনও স্বপ্নই ৷ বদলে ইসরাইলী দখলদারিত্বের নতুন নতুন উপসর্গে পর্যূদস্ত নাবলুসের ব্যাবসা আর শিল্প৷ পশ্চিম তীরের যে কোন জায়গা থেকে নাবলুসে ঢোকার বা বেরুনোর একটা রাস্তাই খোলা রেখেছে ইসরাইলীরা ৷ সেই হাওয়ারা চেকপয়েন্ট পেরিয়ে দেখলাম প্রতিশ্রুতিমত অপেক্ষা করছেন স্থানীয় সাংবাদিক আতেফ সাইদ৷ কিংবদন্তির নাবলুস জিরজিম পর্বত ঘেরা বহু প্রাচীন এই শহরের উল্লেখ আদি বাইবেলে রয়েছে৷ অবশ্য প্রাচীন সে হিব্রুতে নাবলুসের নাম স্কেইম৷ নাবলুস নামটি রোমানদের দেয়া৷ নাবলুস শব্দের অর্থ নতুন শহর৷ অনেক ইতিহাস আর কিংবদন্তি নাবলুসকে ঘিরে৷ বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মীয় গোষ্ঠি হিসেবে পরিচিত সুমেরিতানদের বিশ্বাস নাবলুসকে ঘিরে থাকা এই জিরজিম পর্বতেই আব্রাহাম তার এক সন্তানকে ইশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে উদ্যত হয়েছিলেন৷ ক্রুসেডের সময় মুসলিম যোদ্ধা সালাহদিনের প্রধান পর্যবেক্ষন চৌকি ছিল জিরজিম পর্বতে ৷ এখনও রয়েছে তার ধবংসাবশেষ ৷ তারপর ফিলিস্তিনী জাতীয়তাবাদের বিকাশ হয়েছে অধুনিক নাবলুসকে ঘিরে৷ ১৯৩০ ও ৪০ এর দশকে ইসরাইল সৃষ্টির বৃটিশ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনীদের প্রতিবাদ, প্রতিরোধের কেন্দ্র ছিল নাবলুস৷ আর এখনও নাবলুসের শরনার্থী শিবিরগুলো, বিশেষ করে বালাতা শরনার্থী শিবির জঙ্গীদের প্রধান একটা ঘাঁটি৻ সে কারনে এ শহর ইসরাইলীদের সবচে শ্যেন দৃষ্টিতে৷ এমন কোন মাস নেই নাবলুসে সৈন্যদের অভিযান চলেনা৷ পি এস ই তে হামাস ভীতি
নির্বাচনে হামাসের জয়ের পর থেকে দুমাসে শেয়ারের দাম অন্তত ৫০ শতাংশ দাম পড়ে গেছে৷ সবচে নামকরা যে শেয়ার, পাদিকো (প্যালেস্টাইন ডেভলপমেন্ট এ্যন্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানী), বছরের শুরুতে বাজারে তার শেয়ারের দাম ছিল সাড়ে নয় ডলার৷ মার্চের শেষে তখন সাড়ে চার ডলারে গিয়ে ঠেকেছে ৷ উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীদের একজন হোসেন আমরান৷ চাকরি নেই৷ কয়েকজন আত্মীয়, বন্ধু মিলে মিলে তহবিল তৈরী করে ব্যাবসা করছেন৷ প্রায় ৬০,০০০ মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ তার৷ আমরান বললেন টানা দু মাসের দরপতনে অনেক লোকের দেউলিয়া হওয়ার জোগাড়৷ বাজারে বড় বড় কজন আরব বিনিয়োগকারী শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছেন৷ “ফাতাহ যখন ক্ষমতায় ছিল, তারা বিদেশীদের সাহায্য পাচ্ছিল৷ হামাস এখন ক্ষমতায়, সবাই আমাদের বয়কট করছে৷ এই বাজারে কেউ এখন আর ভরসা পাচ্ছেনা,“ আমরান বললেন৷ পাশ থেকে আরেকজন যুবক বললেন হামাস সরকারকে শুরু থেকেই অকার্যকর করার জন্য বাজারে এই অবস্থা তৈরী করা হচ্ছে৷ “সব ষড়যন্ত্র বুঝলেন৷“ এমনিতেই দ্বিতীয় ইন্তিফাদার পর থেকে অর্থাৎ ২০০০ সাল থেকে ইসরাইলীদের কঠোর অবরোধে নাবলুস পর্যুদূস্ত৷ তারপর হালে ফিলিস্তিনীদের নিজেদের রাজনৈতিক অর্ন্তদ্বন্দ্ব, পশ্চিমা অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধ-- এসবে পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে পড়েছে৷
তুর্কী অটোম্যান শাসনামলে তৈরী বাজারে দোকানের যত সারি, কেনার লোক তত চোখে পড়েনা৷ মানুষজনের অধিকাংশেরই প্রথম কথা, কাজ নেই৷ বাজারের এক চা, কফির দোকানের প্রৌঢ় এক ওয়েটার বললেন ইন্তিফাদার আগে ইসরাইলে কাজ করে দিনে দু`শ, তিনশ শেকেল নিয়ে ঘরে ফিরতেন৷ পাঁচবছর ধরে সব বন্ধ৷ বললেন রক্তে ক্যানসার ধরা পড়েছে৷ তারপরেও এই কাজ করে পেট চালাতে হচ্ছে ৷ আরেকজন যুবক বললেন জুতোর কারখানায় কাজ করতেন৷ কারখানা বন্ধ৷ চায়ের দোকানের অধিকাংশ লোকই খোলাখুলি বললেন তারা হামাসকে ভোট দিয়েছেন৷ যখন বললাম হামাসকে ভোট দিয়ে তারা আরো দুর্ভোগ ডেকে এনেছেন কিনা, সবারই প্রায় একই উত্তর৷ হামাস থাকলো কি ফাতাহ থাকলো তাতে তাদের দুর্ভোগ বাড়বে বা কমবে বলে তারা বিশ্বাস করেননা৷ বললেন হামাস আসার অনেক আগে থেকেই এ শহর ইসরাইলীরা অবরোধ করে রেখেছে৷ আল নাসের প্রিন্টিং প্রেস বাজারের অদুরে শহরের এক প্রান্ত নাবলুসের শিল্প এলাকা৷ রাস্তায় খানা খন্দ ভর্তি৻ বোঝাই যায় দীর্ঘ দিন সংস্কার হয়না৷ সারি দেয়া ফ্যাক্টরি৷ কিছু বন্ধ৷ কিছু চলছে৷ অধিকাংশই ভোজ্য তেল শোধনের৷ মূলত জলপাই থেকে তেল তৈরীর কারখানা৷ এই শিল্প এলাকাতেই ফিলিস্তিনী অঞ্চলের সবচে বড় ছাপাখানা আল নাসের প্রিন্টিং প্রেস৷ ছাপাখানার ম্যানেজার আব্দুর রহিম হিজাওয়ি ৷ ৩৬ বছর ধরে কারখানার ওঠাপড়ার প্রত্যক্ষ সাক্ষী৷ বললেন ব্যাবসা চলছে ভালো মন্দ মিলিয়ে৷ তবে হাজারো বিপত্তি৷ সরকারের জন্য কাজ করলে বিল পেতে ছ মাস এক বছর লেগে যায়৷
সবচে অসুবিধে মাল আনা নেয়া করা৷ মাঝে মধ্যেই নাবলুসে পন্য ঢোকা বন্ধ থাকে৷ জিনিস খদ্দেরের কাছে সময়মত পৌছনো যাবে কি যাবেনা তা নিয়ে সর্বক্ষনই অনিশ্চয়তা৷ নাবলুস থেকে হেবরন, নাবলুস থেকে রামাল্লা যাওয়ার পথে রাস্তায় একের পর এক চেক পয়েন্ট৷ গাজায় যাওয়া তো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে৷ এক দেড় ঘন্টার পথ পেরুতে ট্রাকের সকাল থেকে সন্ধ্যে গড়িয়ে যায়৷ “তারপর ট্রাক যখন পৌছুলো খদ্দেরের অফিস বন্ধ৷ রাত অপেক্ষা করে পরের দিন ডেলিভারি দিতে হয়৷ খরচ অনেক বেড়ে যায়“৷ যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল কেনেন যাদের কাছ থেকে তারা আসতে পারেনা নাবলুসে৷ টেলিফোনে, ইমেলে সবকিছু সারতে হয়৷ “স্যাম্পল দেখার উপায় নেই৷ সামনা সামনি কথা বলার উপায় নেই৷ সবকিছু টেলিফোনে“৷ ছাপাখানার মেশিনপত্র জার্মানীর্৻ মিঃ হিজাওয়ি বললেন বছরে একবার সার্ভিসিং লাগে৷ মাঝে মধ্যে জটিল সমস্যা দেখা দেয়৷ জার্মানী থেকে এখানে লোক ভয়ে আসতে চায়না৷ তখন দিনের পর দিন ধরে টেলিফোনে, ইমেলে তাদের কাছে শুনে শুনে মেশিন ঠিক করতে হয়৷ তারপর রয়েছে মাঝে মধ্যেই ইসরাইলী সৈন্যদের নাবলুসে অভিযান, অবরোধ, কারফিউ৷ প্রেসের মধ্যেই তখন খাওয়া দাওয়া, শোয়া৷ মিঃ হিজাওয়ি বললেন ২০০১ সালে আট মাস এভাবে প্রেস চালিয়েছেন৷ কারফিউ ভাঙ্গলে সপ্তাহে দু একদিন অনেক ঘুরে পায়ে হেঁটে পাহাড়ের ওপর দিয়ে বাড়ীতে যেতেন পরিবারের সাথে দেখা করতে৷ “যখন দেশের বাইরে যাই, দেখি মানুষ কত স্বাধীন কত নিরাপদ৷ কিনতু সেই ১৯৪৮ থেকে আমাদের কাঁধের ওপর যেন সবমসময় একটা বোঝা৷ আমরা ফিলিস্তিনীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি,“ বিদায় নেয়ার আগে বললেন মিঃ হিজাওয়ি৷ আল নাসের প্রিন্টিং থেকে বেরিয়ে গেলাম ফিলিস্তিনী অঞ্চলের ভোজ্য তেল শোধনের সবচে বড় কারখানা ভেটওয়েলে৷ জলপাই, ভুট্টা থেকে তেল, বাটার ওয়েল তৈরী হয়৷ কারখানার জেনারেল ম্যানেজার মাহদি মাসরি৷ সেই একই অভিযোগ৷ কাঁচামাল আনা, উতপাদিত পন্য অন্যত্র পাঠানো সার্বক্ষনিক দুঃস্বপ্ন৷ “ইসরাইলীরা এমন নিয়ম চালু করেছে যে একটা ট্রাকে করে আপনি কারখানা থেকে পন্য নিয়ে নাবলুসের বাইরে নিতে পারবেননা“৷ প্রথমে ট্রাকে করে হাওয়ারা চেক পয়েন্টে যেতে হবে৷ সমস্ত মাল নামাতে হবে৷ সৈন্যরা পরীক্ষা করবে৷ তারপর ট্রাকে মাল উঠবে৷ শুধু তখন সেই ট্রাক ছাড়বে৷ “এই প্রতিকুলতার সাথে আমরা খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি৷ চেকপয়েন্টে গুদাম বানাতে হয়েছে৷ কিনতু খরচ সাংঘাতিক বেড়ে যাচ্ছে“৷ ফলে আমদানি করা পন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় তারা পারছেন না৷ “একসময় জর্ডানের বাজারে আমাদেও তেলের একচ্ছত্র অধিপত্য ছিল৷ এখন অবস্থা উল্টে গেছে৷ জডার্ন থেকে এখানে তেল আসছে“৷ “বুঝলাম তাদের (ইসরাইলের) নিরাপত্তার ভয় রয়েছে৷ কিন্তু আমাদের ইসরাইলে যাওয়ার তো দরকার নেই৷ জডার্ন যাওয়ার পথটার ওপর বাধাটা শুধু তুলে নিক৷ তাহলেও তো কারখানাগুলো বাঁচতো“৷ ফল যেটা হচ্ছে, মি: মাসরি বললেন, যাদের উপায় আছে তারা নাবলুস ছেড়ে চলে যাচ্ছে৷ বেশ কিছু মানুষ বিনিয়োগ নিয়ে এসেছিল৷ তারা এখন জডার্ন, আরব আমিরাতের দিকে চলে যাচ্ছে৷ বললেন ঠিক লেবাননে যে ঘটনা ঘটেছিল এখানেও সেটাই হচেছ৷ “আমরা ফিলিস্তিনীরা নাটকের শেষ দৃশ্যে হাজির হয়েছি৷ ফাতাহর সাথে হামাসকে, হামাসের সাথে ফাতাহকে মানিয়ে নিতে হবে৷ একসাথে বসে শান্তির একটা চেষ্টা করতেই হবে৷ আর কোন উপায় নেই ৷ অবশ্য ইসরাইল যদি শান্তি চায়,“ কন্ঠে চরম হতাশা নিয়ে বললেন মাহদি মাসরি৷ মেয়র আদলি ইয়াইশ
বললেন বিদেশী সাহায্য বন্ধ হলে তা মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে আসবে নাবলুসের জন্য৷ “হাজার হাজার মানুষ শহরের চারটি শরণার্থী শিবিরে মানবেতর অবস্থায় রয়েছে৷ কাজকম্ম নেই ৷ পশ্চিমাদের দায়িত্ব রয়েছে তাদের প্রতি৷ তারাই ইসরাইল সৃষ্টির পেছনে ছিল বলেই এ লোকগুলো ঘরছাড়া“৷ “আমার পূঁজি এবং শক্তি আমার সদিচ্ছে, দক্ষতা আর এই শহরের মানুষের জন্য মমতা ৷ আমি সাধ্যমত চেষ্টা করছি মানুষের দূর্ভোগ কিছুটা লাঘব করতে,“ বললেন নাবলুসের নগরকর্তা৻ হাওয়ারা চেক পয়েন্ট “মাঝে মাঝে সন্ধ্যে হয়ে গেলে বলে আজ যাওয়া যাবেনা৷ অনেক ড্রাইভার আগের রাতে এসে লাইনে বসে থাকে“৷ হাওয়ারার ইসরাইলী চেক পয়েন্টের লাইনে দাড়ানো ফিলিস্তিনী ট্রাকগুলোর ইঞ্জিনের ধকুপুকুনি শুনে মনে হচ্ছিল আরাফাতের স্বপ্নের বানিজ্যিক রাজধানী নাবলুসই যেন ধুকছে ৷ | স্থানীয় লিংকস্ অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৫ - ইহুদি বসতি তেকোয়া 01 জুন, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৪ - ঠিকানা শরণার্থী শিবির 25 মে, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৩ - কালান্দিয়া চেকপয়েন্ট 18 মে, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ২ - সন্ত্রস্ত নেতানিয়া12 মে, 2006 | Lei অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি05 মে, 2006 | Lei | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||