BBCBengali.com
BBCHindi.com
BBCNepali.com
BBCSinhala.com
BBCTamil.com
BBCUrdu.com
 
সর্বশেষ আপডেট: 25 মে, 2006 - প্রকাশের সময় 18:52 GMT
 
বন্ধুকে ইমেইল করুন ছাপার উপযোগী সংস্করণ
অবরুদ্ধ পুণ্যভূমি ৪ - ঠিকানা শরণার্থী শিবির
 

 
 
Al Jalazone refugee Ayesha
ছেলের মৃত্যুর সাক্ষী আয়েশা
এখনও পশ্চিম তীর ও গাজার এক-তৃতীয়াংশ ফিলিস্তিনীর ঠিকানা শরণার্থী শিবির ৷ অভাব, অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘ দখলদারিত্বের চাপে-- এ সব শিবিরে বেড়ে উঠছে ক্রদ্ধু, বেপরোয়া প্রতিশোধ পরায়ন এক প্রজন্ম

রামাল্লা থেকে মাইল সাতেক দুরে ফিলিস্তিনী শরণার্থী শিবির আল জালাযোন ৷ সরু অলি গলির দুপাশে ঠাসাঠাসি দোতলা তিনতলা বাড়ী, রংচটা দেয়াল ৷ গত পঞ্চাশ বছর ধরে দু`তিন প্রজেন্মর প্রায় এগার হাজার ফিলিস্তিনীর ঠিকানা এই শিবির ৷

তাদের একজন ষাটোর্ধ বিধবা আয়েশা ৷ এই শিবিরেই ইসরাইলী সৈন্যদের গুলিতে ছেলেকে হারিয়েছেন তিনি, হারিয়েছেন সবচেয়ে প্রিয় নাতিকে ৷

একজন শরণার্থীর উপাখ্যান

আয়েশার জন্ম বর্তমানের ইসরাইলী শহর জাফার কাছে এক গ্রামে ৷ ১৯৪৮ এ আরব-ইসরাইলী যুদ্ধের সময় তিনি কিশোরী ৷ লাখ লাখ ফিলিস্তিনীর মত সেসময় তার পরিবারও গ্রাম ছাড়ে৷ প্রথমে তারা ওঠেন জেরিকোর কাছে আখবদ জাবের শরণার্থী শিবিরে, পরে চলে আসেন আল জালাযোন ৷ এখানেই আছেন গত পঞ্চাশ বছর ৷ স্বামী মারা গেছেন বেশ আগে ৷ থাকেন ছোট মেয়েকে নিয়ে ৷

বসে ছিলেন যেখানে পেছনে বাধানো তার নিহত ছেলে আওয়াদ হাসানের ছবি ৷ ১৯৯৪ তে বাড়ীর সামনে নিহত হয় আওয়াদ ৷ পাশেই নাতির ছবি ৷ সুদর্শন কিশোর ৷

 আমার চোখের সামনে, বাড়ীর সামনে আমার জলজ্যান্ত যুবক ছেলেকে গুলি করে মারল
 
আল জালাযোন শিবিরের বাসিন্দা আয়েশা

কিভাবে মৃ্ত্যু হল এ দুজনের, দোভাষির মাধ্যমে জিজ্ঞেস করতে বেশ কিছুক্ষন চুপ থাকলেন আয়েশা ৷ তারপর ইশারা করে দরজার বাইরে নিয়ে গেলেন আমাকে৷

বাড়ীর সামনে ছোট্ট চত্বরের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন ঠিক এখানে দাড়িয়ে গাড়ী ধুচ্ছিল
আওয়াদ ৷ তিনি ছিলেন ছেলের ঠিক পেছনে ৷ সেদিন সারা শিবিরে প্রচুর ইসরাইলী সৈন্য ৷ কাছে কোথাও গোলমালের শব্দ শোনা যাচ্ছিল ৷ বললেন ইসরাইলী একজন সৈন্য চিৎকার করে ঘরের ভেতরে যাওয়ার কথা বললো ৷

“আমরা ঢুকতে যাচ্ছি ৷ হঠাত পেছন থেকে গুলি ৷ পেছনে তাকিয়ে দেখি রক্তে ভেসে যাচ্ছে আওয়াদ ৷
আমার চোখের সামনে, বাড়ীর সামনে আমার জলজ্যান্ত যুবক ছেলেকে গুলি করে মারল,“ বলতে বলতে চোখের কোন ভিজে উঠলো আয়েশার ৷

“একজন ইসরাইলী সৈন্য কঙ্কালের মত কি একটা আঁকা একটি কাগজ তুলে চিৎকার করছিল-- প্রতিশোধ, প্রতিশোধ“৷

আয়েশার কথায় কোন ঝুট ঝামেলায় থাকতো না আওয়াদ৻ মাইকেল জ্যাকসনের গানের খুব ভক্ত ছিল৻ আমেরিকা যাওয়ার চেষ্টা করছিল ৷ সেদিনই কাগজপত্র জমা দিতে যাওয়ার কথা ছিল ৷ রামাল্লায় কারফিউ চলছিল বলে যেতে পারেনি ৷

তারপর ছেলের শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে ১৫ বছরের নাতি, তার বড় মেয়ের একমাত্র ছেলের মৃ্ত্যু দেখতে হয়েছে আয়েশাকে ৷

“সৈন্যরা তার ঠিক দুচোখের মাঝখানে গুলি করেছিল“৷ শিবিরের কাছে কালান্দিয়া নামে জায়গায় ইসরাইলীরা যেখানে দেয়াল তুলছে সেখানে আরো কিছু ছেলের সাথে বিক্ষোভ করছিল ঐ কিশোর ৷ ইসরাইলী সৈন্যরা সরাসরি গুলি করেছিল তাদের ওপর ৷ ২০০৩ সালের ৯ই ডিসেম্বর ৷

“তার মা --আমার বড় মেয়ে-- তখন থেকে অসুস্থ,“ আয়েশা বললেন৷

ঠিকানা শরণাথী শিবির

Rafah refugee camp
রাফার শরণার্থী শিবির

১৯৪৮ এ আরব-ইসরাইলী যুদ্ধের পর দশ লাখেরও বেশী ফিলিস্তিনী অধুনা ইসরাইল থেকে ঘর ছাড়া হয়ে গাজা ও পশ্চিম তীর ছাড়াও সিরিয়া, জডার্ন, লেবানন, মিশরে গিয়ে ওঠে ৷ তারপর ১৯৬৭ র যুদ্ধে যোগ হয় আরো লাখ চারেক৻

জাতিসংঘের হিসেবেই নিবন্ধিত ফিলিস্তিনী শরণার্থীর সংখ্যা এখন ৪২ লাখের মত ৷ এদের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ফিলিস্তিনীর স্থায়ী ঠিকানা এখনও শরণার্থী শিবির ৷ অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজাতে এখনও ২৭ টি শিবিরে সাড়ে ছ`লাখ ফিলিস্তিনীর বসবাস ৷ দশকের পর দশক ধরে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, এমনকি অধিকাংশ সময় খাদ্যেরও মূল যোগানদাতা জাতিসংঘ ৷

 আমি তো এখানে জেলখানায়৷ এই ক্যাম্প থেকে ইউনিভার্সিটি, আবার ক্যামপ
 
আল আমারি শিবিরের আহমেদ

এসব ফিলিস্তিনী শরণার্থী শিবিরগুলোর দেয়ালে দেয়ালে, দোকানে, রেস্টুরেন্টে, ঘরে অবধারিতভাবে একধরনের পোষ্টার চোখে পড়বেই ৷ তা হল ইসরাইলী সৈন্যদের গুলিতে নিহত, আত্মঘাতি হামলা করতে গিয়ে নিহত কিশোর, তরুন, যুবকের ছবি ৷ পোষ্টারের ব্যাকগ্রাউন্ডে ফিলিস্তিনী পতাকা, কোনটায় জেরুসালেমের আল আকসা মসজিদের প্রতিকৃতি ৷ কোনটায় ইয়াসের আরাফাতের প্রতিকৃতি৻ কোনটায় নিহত হামাস নেতা শেখ ইয়াসিনের ৷

শিবিরের ছোট ছোট বাচ্চাদের কাছে জিজ্ঞেস করলেও বলে দেবে পোষ্টারে এই তরুনের কি নাম, কবে কোথায়, কিভাবে মারা গেছে সে ৷ বলবে তাদের ঘরে কার কার পোষ্টার রয়েছে ৷

ইসরাইলীদের বক্তব্য এ সব শরণার্থী শিবিরে কিশোর তরুনদের জঙ্গীবাদে দীক্ষা দেয়া হয় ৷ ছোট থেকেই ঢোকানো হয় হিংসার বীজ ৷

আল-আমারি শরণার্থী শিবির

রামাল্লার উপকন্ঠে এই শরণার্থী শিবির থেকে ২০০২ সালে এক তরুনী জেরুসালেমের আত্মঘাতি হামলা চালিয়ে ইসরাইলে নতুন এক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল ৷ কারন ২৭ বছরের ওয়াফা ইদ্রিস ছিল প্রথম কোন মেয়ে আত্মঘাতি হামলাকারি ৷ তখন থেকে এই আল আমারি ইসরাইলী সৈন্যদের কড়া নজরদারীতে৻ মাঝে মধ্যেই অভিযান চলে এখানে ৷

ক্যাম্পে প্রবেশের প্রায় মুখে ভিডিও গেমসের ছোট একটি দোকান ৷ সাত-আট থেকে শুরু করে ১৬/১৭ বছরের বেশ কজন কিশোর তরুনের ভীড় ৷ খেলছে দুজন, বাকিরা ভীড় করে দেখছে ৷

তাদের একজন মোহাম্মদ ৷ ১৮ বছর বয়স ৷ সবে রামাল্লার বিরজেত বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছে ৷ এই ক্যামেপই জন্ম ৷ কিনতু আদিবাস এল্লুদ৻ এল্লুদ এখন ইসরাইলের একটি শহর ৷ ১৯৪৮ এ আরব-ইসরাইলে যুদ্ধে দখল করা ৷

আল আমারি শরণার্থী শিবিরি

কেমন কাটছে জীবন এই শিবিরে- জিজ্ঞেস করলাম মোহাম্মদকে ৷ “আমি তো এখানে জেলখানায় ৷ এই ক্যাম্প থেকে ইউনিভার্সিটি, আবার ক্যাম্প“৷

“অনেক জায়গায় যেতে ইচ্ছে করে, উপায় নেই“৷ কালান্দিয়া চেক পয়েন্ট ৷ বিতুনিয়া চেকপয়েন্ট ৷ ইসরাইলীরা সৈন্যরা থামাবে ৷ বলবে যাওয়া যাবে না ৷

ফিলিস্তিনী তরুন, যুবকদের প্রায় সবারই এই একই আক্ষেপ ৷ বিশেষ করে দু`হাজার সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা গণ-আন্দোলন শুরুর পর থেকে তাদের চলাফেরার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রন আরোপ করেছে ইসরাইল৷

বয়স যদি কম হয়, বিশেষ করে ঠিকানা যদি কোন শরণার্থী শিবির হয়, ইসরাইলী চেকপয়েন্ট গলে বেরুনো প্রায় অসম্ভব ৷

 জীপ নিয়ে সৈন্যরা একজনের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিয়েছিল ৷ আমি দেখেছি
 
জাবেদ, আল আমারি শিবির

দোকানের বাইরে দেয়ালে লাইন দিয়ে সাঁটা ইন্তিফাদায় নিহত দুই তরুনের পোষ্টারের সম্পর্ক জিজ্ঞেস করলে আহমেদ বলল আমার ঘরেও কয়েকজনের ছবি আছে ৷ তিনটি বড়, ছোট ছোট
অনেকগুলো ৷

মোহাম্মদ বলল এই ক্যাম্প থেকেও অনেকে মারা গেছে ইন্তিফাদায়, যাদের অনেকেই তার চেনা
ছিল ৷ বেশ কজনের নাম বলল ৷

“লড়াই ছাড়া কোন উপায় নেই ৷ নারী, পুরুষ সবাই লড়াই করব,“ ধীরে ধীরে কঠিন হতে থাকলো ১৮ বছরের তরুনের মুখ ৷

মন দিয়ে আমাদের কথোপকথন শুনছিল বছর আটেকের একটি বালক ৷ নাম জাবেদ ৷ জিজ্ঞেস করলাম বড় হয়ে কি হবে ? উত্তর দিল সৈনিক হবে ৷ কেন জিজ্ঞেস করতে বলল ইসরাইলী সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করব ৷

জাবেদ বলল একবার ট্যাংক নিয়ে ক্যাম্পে ঢুকে সৈন্যরা গুলি করছিল ৷ “আমি ভয় পেয়েছিলাম ৷ জীপ নিয়ে তারা একজনের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিয়েছিল ৷ আমি দেখেছি“৷

অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং গাজায় সাড়ে ছ লাখের মত ফিলিস্তিনী শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা ৷ ফিলিস্তিনী পর্যবেক্ষকদের মতে বেকারত্ব, অনিশ্চিত ভবিষ্যত, রাজনৈতিক মীমাংসায় স্থবিরতা এবং নিত্যদিনের জীবনযাপনে ইসরাইলী দখলদারিত্বের ধাক্কা -- এসবের ফলে এসব শিবিরে জন্ম হচ্ছে জঙ্গী, বেপরোয়া এক প্রজন্মের ৷ জঙ্গী সংগঠনগুলোর শক্ত ঘাঁটি হয়ে উঠেছে এসব শরণার্থী
শিবির ৷

হারানো শৈশব

আল আমারি শরণার্থী শিবিরের ভিডিও গেমসের দোকানের মালিক ওয়ালিদ ৷ বছর পঞ্চাশ বয়স ৷ মাঝে কয়েকবছর উপসাগরের একটি দেশে গ্রাফিক ডিজাইনারের কাজ করেছেন ৷ দুবছর আগে ফিরেছেন পরিবার ও ছেলেমেয়েদের জন্য ৷ কাজ না পেয়ে এই দোকান খুলে বসেছেন ৷

ওয়ালিদের জন্ম এই শিবিরে ৷ পূর্বপুরুষের বাড়ী এল্লুদে ৷ ১৯৪৮ এ ইসরাইলীরা এল্লুদ দখল করে নেয়ার পর তার তার দাদা ও বাবা পরিবার সহ এখানে পালিয়ে আসে৷ অন্যান্য আত্মীয়স্ববজনদের কেই চলে যায় মিশরে, কেই জর্ডানে ৷

 আশা করি আল্লাহ সুদিন আনবেন ৷ না হলে এসব ছেলেরা সব সন্ত্রাসী হবে
 
ওয়ালিদ, আল আমারি শিবির

“আপনি যদি এই ক্যাম্পের জীবন সম্পর্ক জানতে চান, এককথায় বলব নরক ৷ বিশেষ করে বাচ্চাদের কোন স্বাভাবিক শৈশব নেই ৷ খেলনা নিয়ে খেলা, মাঝে মধ্যে বেড়াতে যাওয়া ৷ ওরা জানেইনা এসব“৷

বললেন এখানকার ছোট ছোট শিশুরা জানে তাদের দূর্ভোগের ইতিহাস ৷ “আপনি ছ- সাত বছরের একজন বাচ্চাকেও পরিচয় জিজ্ঞেস করে দেখুন ৷ তাদের জন্ম হয়ত রামাল্লার এই শিবিরে, কিন্তু বলবে আমি তেল আবিব থেকে, আমি জাফা থেকে, আমি রামাল্লা থেকে“৷

ওয়ালিদ বললেন ইসরাইলী সৈন্যরা এই ক্যাম্পে ঢোকেনি এরকম একটা মাসও যায়না ৷ “সৈন্যরা ক্যাম্পে ঢুকে যা করে -- গুলি, ধাক্কা দিয়ে দরজা ভেঙ্গে ফেলা, কিছু তরুন যুবককে ধরে নিয়ে যাওয়া -- বাচ্চারা এসব জন্ম থেকে দেখছে“৷

ওয়ালিদ বললেন আগে ছিল দখলদারিত্ব ৷ এখন সাথে যোগ হয়েছে চরম অর্থনৈতিক দুর্দশা ৷ আগে দখলদারিত্ব ছিল, কিন্তু কাজ ছিল ৷ এখন তাও নেই ৷

“আশা করি আল্লাহ সুদিন আনবেন ৷ না হলে এসব ছেলেরা সব সন্ত্রাসী হবে,“ বিদায় দেয়ার আগে বললেন ওয়ালিদ৷

Palestine refugee map

 
 
স্থানীয় লিংকস্
সর্বশেষ সংবাদ
 
 
বন্ধুকে ইমেইল করুন ছাপার উপযোগী সংস্করণ
 
  RSS News Feed
 
BBC Copyright Logo ^^ পাতার শুরুতে
 
  প্রথম পাতা | বিশেষ আয়োজন | অনুষ্ঠান| বেতার তরঙ্গ | আবহাওয়া
 
  BBC News >> | BBC Sport >> | BBC Weather >> | BBC World Service >> | BBC Languages >>
 
  আমাদের সম্পর্কে | যোগাযোগ | সাহায্যের বোতাম | গোপনীয়তা সংক্রান্ত বিবৃতি