বাংলাদেশে উর্দূভাষী : কতটা মিশতে পারছে মূলস্রোতে

ঢাকার মিরপুরে উর্দুভাষী ও স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষে ১০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় আজ ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাকে ঘিরে ক্যাম্পের ভেতরে থাকা লোকজন এবং স্থানীয়দের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে।

ক্যাম্পে বসবাসকারী
ক্যাম্পে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন এসব উর্দূভাষী জনগন।

রবিবার মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে বিহারী নামে পরিচিত এই জনগোষ্ঠী বিক্ষোভ করেছেন হতাহতের প্রতিবাদ জানিয়ে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্যাম্পে চার দশকের বেশি সময় ধরে বাস করা এসব উর্দুভাষীদের সাথে ও স্থানীয় বাঙ্গালীদের মধ্যেকার সম্পর্ক কোন পর্যায়ে রয়েছে?

ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার জন্ম খালেদ হোসেনের। জন্মসূত্রেই বাংলাদেশের নাগরিক মি. হোসেন পড়াশোনা শেষে এখন আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন।

তিনি বলছিলেন উর্দুভাষী হিসেবে জেনেভা ক্যাম্পে জন্ম নেওয়াই তাকে এই পর্যন্ত আসতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তবে সেসব প্রশাসনিক জটিলতা।

ক্যাম্পে বা ক্যাম্পের বাইরে বসবাসের সময় স্থানীয় বাঙ্গালীদের সাথে সম্পর্কের তেমন কোন টানাপোড়েনের মধ্যে তিনি পড়েননি।

মি: হোসেন বলেন, “জন্মের পরেই দেখলাম আমি জেনেভা ক্যাম্পে, বাবা-মা আটকে পরা পাকিস্তানী। আমি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলাম, গ্রাজুয়েশন করলাম এখন ল’ প্রাকটিস করছি। অনেক ডিসক্রিমিনেশনের শিকার হতে হয়েছে। তবে কিছু ভাল মানুষ অবশ্যই ছিল যাদের অনেক সাহায্য পেয়েছি”।

ঢাকায় যে কয়টি ক্যাম্প রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম মিরপুরের কালসির বিহারী ক্যাম্প। দীর্ঘদিন ধরে এর পাশেই বাস করছেন মেহেরুন্নিসা হক।

তিনি বলছিলেন ১৯৭৩ সালে যখন তারা এখানে থাকা শুরু করেন তখন কিছুটা অস্বস্তি কাজ করলেও সময়ের আবর্তে তাদের সম্পর্ক একে অপরের কাছে খুব ভাল প্রতিবেশী হিসেবেই প্রতীয়মান হয়েছে।

মিসেস হক বলছিলেন,“১৯৭৩ সালে যখন থাকতে আসি তখন সম্পর্ক খুব ভাল না থাকলেও খুব খারাপ ছিল না। কিন্তু এখন অনেক ভাল। আমাদের বাজার এক, আমরা একই কলের পানি খায়। কখনো আলাদা কিছু মনে হয়নি”।

বাংলাদেশের এসব উর্দুভাষী যারা বিহারী নামেই বেশি পরিচিত তাদের জন্য সারা দেশে ১১৬ টি ক্যাম্প রয়েছে। ক্যাম্পের ভিতরে ও বাইরে আনুমানিক ছয় লাখের মত উর্দুভাষী এসব মানুষ বাস করছেন।

বাংলাদেশে গত চার দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাস করছে এসব উর্দুভাষী মানুষ- যাদের কেও কেও নিজেদের নিজেদের আটকে পড়া পাকিস্তানী হিসেবে পরিচয় দেন।

শনিবারের সংঘর্ষ
শনিবারের সংঘর্ষের পর বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছে ক্যাম্পগুলো।

এদের বেশির ভাগেরই জন্ম বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। এসব উর্দুভাষী মানুষ বাংলাদেশের মূল সমাজের সাথে তারা কতটা মিশতে পেরেছেন?

উর্দুভাষীদের সংগঠন উর্দু স্পিকিং পিউপিলস ইয়ুথ রিহেবিলিটেশন মুভমেন্টের সভাপতি সাদাকাত খান বলছিলেন স্থানীয় বাঙ্গালিদের সাথে তাদের সম্পর্ক ভাল।

তবে ১৯৯৫ সালের তাদের ক্যাম্পের জমির ওপর স্থানীয় বাঙালিদের জন্য তৎকালীন সরকারের দেওয়া প্লট বরাদ্দের কারণেই তার ভাষায় বহিরাগতদের সাথে তাদের এই সমস্যাগুলোর সূত্রপাত হয়।

মি: খানের বর্ণনায়,“আমাদের বাড়িঘর যেখানে ছিল সেখানে সরকার ক্যাম্প করে। কিন্তু ১৯৯৫ সালে এই জমির ওপর স্থানীয় বাঙ্গীদের প্লট অ্যালোটমেন্ট দেওয়া হয়।

তারপর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলার লোকজন এসে এখানে স্থানীয় মাস্তানদের ভাড়া করে আমাদের ওপর হামলা চালায়। এ অবস্থা দূর করার জন্য সরকারকে জমি সংক্রান্ত ঝামেলা দূর করতে হবে।”

২০০৩ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে উর্দুভাষী এ জনগোষ্ঠীর ভোটার তালিকায় নাম নিবন্ধন করা হয়।

ক্যাম্প ও ক্যাম্পের বাইরে অনেকেই রয়েছেন যারা পড়াশোনা শেষে কর্মজীবন শুরু করেছেন মিশে গেছেন সমাজের মুল স্রোতে।

তবে জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে মূলত স্থানীয়দের সাথে তাদের এই সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে বলে মনে করেছেন উর্দুভাষী এই জনগোষ্ঠী।