ভারতের আম আদমি পার্টির প্রার্থী তালিকা ঘোষণা

bbc
আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল

ভারতের দুর্নীতি-বিরোধী রাজনৈতিক দল আম আদমি পার্টি আগামী লোকসভা নির্বাচনের জন্য আজ তাদের প্রথম দফায় কুড়ি জনের প্রার্থী-তালিকা ঘোষণা করেছে।

দলের নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল দিয়েছেন শুক্রবার রাতে, তারপর মাত্র একদিনের ব্যবধানেই আম আদমি পার্টি পুরোদমে দেশের সাধারণ নির্বাচনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

দিল্লির কনট প্লেসের কাছে হনুমান রোডে আম আদমি পার্টির অফিসে দোতলার জানালা থেকে নিজের ইস্তফা ঘোষণা করেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল।

যেমন নাটকীয়ভাবে দিল্লির ক্ষমতায় এসেছিলেন, ঠিক ৪৯ দিনের মাথায় একই রকম নাটকীয়তায় ক্ষমতা থেকে সরেও গেলেন তিনি।

মাঝের এই দিনগুলোতে ভারতের জাতীয় স্তরের সংবাদপত্র থেকে টিভি চ্যানেল – প্রায় রোজই সবার এজেন্ডা ঠিক করে দিয়েছে দিল্লির আম আদমি পার্টি সরকার।

জল বা বিদ্যুতের মাশুল কমানো, রাজপথে মুখ্যমন্ত্রীর ধরনা কিংবা মুকেশ আম্বানির বিরুদ্ধে এফআইআর – তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়েই তুমুল তর্কবিতর্ক হয়েছে, দেখা গেছে জনমতও কার্যত দুভাগ।

এমন কী যে জনলোকপাল বিল পেশ করতে না-পেরে শেষ পর্যন্ত কেজরিওয়াল সরে গেলেন তার পরের জরিপেও দেখা গেছে দিল্লির প্রায় অর্ধেক লোক তাঁর সিদ্ধান্ত সমর্থন করছেন।

আম আদমি পার্টির তাত্ত্বিক নেতা যোগেন্দ্র যাদবও নিশ্চিত, এই পদত্যাগ তাদের দলের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করবে।

তিনি বলছেন, ‘আমরা এমন এক সরকারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি যাদের ক্ষমতা ছাড়তে কোনও কুন্ঠা নেই।

যে দেশে ক্ষমতা মানে সব কিছু, সেখানে এই সরকার নীতির প্রশ্নে ক্ষমতা ছেড়ে দেখিয়েছে।’

মি যাদব সেই সঙ্গেই যোগ করছেন, ‘আমাদের দল তৈরি হয়েছিল কতগুলো নীতির ভিত্তিতে – যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনলোকপাল।

কিন্তু অন্য দলগুলো যখন সেই বিল পেশ পর্যন্ত করতে দিচ্ছে না, তখন মি কেজরিওয়াল পদত্যাগ করে একেবারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন!’

ফলে নীতির প্রশ্নে অবিচল এবং ক্ষমতার প্রতি নির্মোহ – এই ইমেজ তুলে ধরেই দুআড়াই মাস পরের লোকসভা নির্বাচনে এখন লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আম আদমি পার্টি।

কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অনেকেই বলছেন, দিল্লির মতো একটা শহরে তারা যে নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছেন – বাকি দেশে তার পুনরাবৃত্তি করা কার্যত অসম্ভব।

মেট্রো শহরগুলোর বাইরে তাদের সংগঠন এখনও নেই বললেই চলে, অভাব আছে দেশের বিশাল গ্রামীণ কেন্দ্রগুলোতে প্রচার চালানোর মতো লোক বা অর্থবলেরও।

প্রায় চার দশকের প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সৌগত রায় যেমন মনে করেন – দিল্লির ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়াটাও ভোটে আম আদমি পার্টির বিপক্ষেই যাবে।

লোকসভার সদস্য মি রায় বিবিসিকে বলছিলেন, ‘প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে মানুষ একটা বিকল্প খুঁজছিল – কিন্তু সেই বিকল্প আম আদমি পার্টি নয় সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে।

সরকার চালানোর ক্ষমতা বা যোগ্যতাই তাদের নেই।’

সৌগত রায়ের ধারণা আম আদমি পার্টি দিল্লি বা তার আশেপাশের এলাকায় কয়েকটা আসন জিততে পারে ঠিকই – কিন্তু লোকসভা ভোটে গোটা দেশে তাদের আসনসংখ্যা দশও ছাড়াবে না।

এমন কী আম আদমি পার্টির প্রতি জনসমর্থনও দিন-কে-দিন কমবে বলে পূর্বাভাস করছেন সৌগত রায়, কারণ তিনি বলছেন, ‘ওরা তো অ্যানিার্কিস্ট, সিস্টেমের ভেতর থেকে কীভাবে কাজ করতে হয় সেই ধারণাই ওদের নেই!’

কিন্তু আম আদমি পার্টির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় রাজনীতিতে যে ব্যতিক্রমী ধারার সূচনা হয়েছিল, তাহলে কি তা এত তাড়াতাড়ি মুখ থুবড়ে পড়বে?

রাজনৈতিক ভাষ্যকার রশিদ কিদোয়াই কিন্তু তাদের নিয়ে এখনই হতাশ হতে রাজি নন।

মি কিদোয়াই বলছেন, ‘তারা বড় দলগুলোর জন্য হুমকি – কারণ এতদিন এই দলগুলো নিজেদের মধ্যে একটা গোপন নীরব বোঝাপড়া করে দেশের রাজনৈতিক সিস্টেম চালিয়েছে। আর বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো এই সিস্টেমকে মদত দিয়ে গেছে – কারণ ক্ষমতায় যারাই থাকুক তারা ঠিকই সুবিধা পেয়ে গেছে।’

‘কিন্তু আম আদমি পার্টির জন্যই এখন সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, কাঁটাছেড়া চলছে।

ফলে লোকসভা ভোটে তারা পাঁচ বা পনেরো – যতগুলোই আসন পাক, আম আদমি পার্টির প্রাসঙ্গিকতা থাকবেই’, মনে করছের রশিদ কিদোয়াই।

আগামী লোকসভা ভোটে আম আদমি পার্টি দিল্লি বিধানসভা ভোটের মতোই চমকপ্রদ ফল করবে – এ কথা কেউই বলছেন না।

কিন্তু বিশেষ করে শহরপ্রধান কেন্দ্রগুলোতে তারা অনেক অঙ্ক উল্টে দেবে এবং ভোটের পরেও প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হিসেবে রয়ে যাবে – সেটা কিন্তু অনেকেই আঁচ করছেন।