অবরোধে বিপর্যস্ত কৃষক

বাংলাদেশে অব্যাহত রাজনৈতিক সহিংসতা, অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকেরা।

শীত মৌসুমে সবজির প্রচুর ফলন হলেও অবরোধের কারণে বাজারজাত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েছেন কৃষকেরা।

গবেষকরা বলছেন, এবারের মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও তার বেশিরভাগই নষ্ট হচ্ছে পণ্য পরিবহন সংকট তীব্র হওয়ার ফলে।

ঢাকার কয়েকটি বাজার ঘুরতে ঘুরতে মোহাম্মদপুর এলাকায় এমন এক সবজি ব্যবসায়ীর দেখা মিললো যিনি নিজের উৎপাদিত সবজি নিজেই বিক্রি করতে ঢাকায় এসেছেন।

সবজি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। যিনি এসেছেন সাভার থেকে। তার খামারে উৎপাদিত সবজি নষ্ট হতে বসেছে বলেই তিনি প্রতিদিন এ কাজটি করছেন।

তিনি বলছেন, “বেচাকেনা খুবই কম, মাল আনি কিন্তু লাভতো নাই। সবতো বেচা হয়না। কষ্ট করে আসলেওতো লাভ নাই, কষ্টেরতো দাম পাইতেছিনা”।

তিনি আরো বলছেন বাজারে পাইকারি বিক্রেতা না থাকার কারণে শীত মৌসুমের অধিকাংশ শাকসবজিই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আর কৃষকদের হতাশাও যেন বাড়ছে।

ঠিক একই ধরনে মন্তব্য করেন ঈশ্বরদীর ভালুইমাড়ির কৃষক মোহাম্মদ জাহিদুল।

তিনি বলেন, “এই ধরেন কপি, এটাতো নষ্ট হয়ে যায় এটাতো রাখা যায়না। ১৪০০ টাকা মনের কপি এখন ৪০০ টাকা মন। ধনেপাতা, গাজর সবকিছুইতো আমার মাঠে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কমে ছাইরাওতো লাভ হচ্ছেনা”।

কৃষকদের মতো কৃষি গবেষকরাও বলছেন, বাংলাদেশে এবারের মৌসুমে শীতকালীন সবজির ফলন বেশি হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা আর হরতাল অবরোধের মতো প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ কৃষকেরা।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ডঃ মাহবুব হোসেন, “শাকসবজি যেটা উৎপাদন হয় তার ৩০ শতাংশ মাত্র যারা উৎপাদন করে তারা হয়তো খায়, অথবা গ্রামের বাজারে বিক্রি হয়। বাকি ৭০ শতাংশ মফস্বল বা ঢাকা শহরে আসে। চলমান পরিস্থিতিতে আসাটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এবার যে পরিমাণ শাকসবজি উৎপাদন হয়েছে তার অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। ফলে গ্রামের কৃষকেরাও লাভ পাবেনা। সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শহরের ভোক্তারা যেটাও পাচ্ছে তা বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে”।

কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজারে ঢুকতেই দেখা গেলো বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ভর্তি প্রায় ডজনখানেক ট্রাক দাড়িয়ে আছে। রাস্তার পাশে অনেক সবজি পচে আছে। দেখা যাচ্ছে বিক্রেতার তুলনায় ক্রেতার সংখ্যা অনেক কম।

কারওয়ান বাজারে দেখা মিললো একজন পাইকার ব্যবসায়ী মোঃ কামাল হোসেনের। যিনি কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের এক কৃষকের কাছ থেকে চার টাকা দামে বাধাকপি কিনে এনে এগার টাকা দামে বিক্রি করছেন।

হরতাল অবরোধের মধ্যে পরিস্থিতি পণ্য পরিবহন সংকটের কথা উল্লেখ করে মিঃ হাসান বলছেন, আগের তুলনায় এখন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আর পণ্য পরিবহনের গাড়ী ভাড়াও অগ্রিম দিতে হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ঢাকার অন্যতম এই কাঁচামালের আড়তে এসে দেখা মিললো এমন অনেক ব্যবসায়ীর যারা বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি বিক্রি করছেন বিভিন্ন দামে। কারণ তাদের একটা- বর্তমান পরিস্থিতিতে পণ্য পরিবহন খরচ। তবে প্রশ্ন হলো, শহরের ক্রেতারা যত দামেই শাকসবজি পাননা কেন উৎপাদনের কেন্দ্রে যিনি সেই কৃষক কি পাচ্ছেন তার ন্যায্যমূল্য?

সবজির পাইকার ব্যবসায়ী মোঃ আমির হোসেনের কাছে এর উত্তর মেলে। তিনি বলেন, “কৃষক মারা যাচ্ছে। তারা মাল বেচতে পারছেনা। পাইকাররাও যাইতে পারতেছেনা। অবরোধে গাড়ী জ্বালায়ে দিতেছে, তারা ভয়ও পাইতেছে। কৃষকরাতো ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে পড়ছে”।

শীতকালীন এ মৌসুমে শাকসবজির বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে যে হাসি নেই তা কৃষক, পাইকার ব্যবসায়ীদের কন্ঠেই স্পষ্ট ধরা পড়ে। তবে কৃষি গবেষকরা বলছেন, উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য যেন কৃষকের হাতে পৌঁছে যায় তার জন্য উৎপাদিত শাকসবজির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।