বর্ণময় এক রাজনীতির অবসান: লালু প্রসাদ

  • ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৩
লালু প্রসাদ যাদব
লালু প্রসাদ যাদব

বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও ভারতের সবচেয়ে বর্ণময় রাজনীতিবিদদের অন্যতম লালুপ্রসাদ যাদবকে পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি মামলায় আদালত সোমবার দোষী সাব্যস্ত করেছে।

ঝাড়খন্ডের রাঁচিতে বিশেষ সিবিআই আদালত তাদের রায় ঘোষণার পর পরই মি যাদবকে জেলে যেতে হয়েছে, আর সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায়ের জেরে সঙ্গে সঙ্গে খোয়াতে হয়েছে সংসদের সদস্য পদও।

তিনি বিহারের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন পশুখাদ্য কেনার জন্য বরাদ্দ থেকে ৩৭ কোটি টাকা সরকারি অর্থ নয়ছয় করা হয়েছিল এই অভিযোগে লালুপ্রসাদ যাদবসহ মোট ৪৫জনের বিরুদ্ধে মামলা চলছিল গত ১৭ বছর ধরে; অবশেষে তাদের প্রত্যেককেই দোষী বলে চিহ্নিত করেছে আদালত।

বিহারে এক সময় প্রবাদ ছিল, সামোসাতে যতদিন আলু থাকবে, ওই রাজ্যেও লালুর শাসন চলবে। কিন্তু লালুপ্রসাদ যাদব বা তার পরিবারের বিহার শাসনের পাট চুকেছে সেও প্রায় এক দশক হল, আর সোমবার রাতটি তাঁকে কাটাতে হচ্ছে রাঁচির বীরসা মুন্ডা সেন্ট্রাল জেলে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন যিনি অকপটে ঘোষণা করতেন, তাঁকে এখন ভাবতে হচ্ছে কত বছর জেলে কাটাতে হবে।

আর পার্লামেন্টে লালুপ্রসাদের এই জাতীয় ঠাট্টাতামাশাও এখন আপাতত ইতিহাস, কারণ সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আর এমপি-ও নন।

বাকপটু এই রাজনীতিবিদ সোমবারের রায়ের পর একটি কথাও বলেননি, শুধু তার ক্রিকেটার-রাজনীতিক ছেলে তেজস্বী যাদব জানিয়েছেন এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা জনতার আদালতে যাবেন।

তাঁর বাবা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেছেন লালুপ্রসাদের ছেলে। তবে বাস্তবতা হল, তাদের দল রাষ্ট্রীয় জনতা দলকে বাদ দিলে দেশের প্রায় সব দলই একবাক্যে এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে।

এমন কী, লালুপ্রসাদের গত কয়েক বছরের সঙ্গী কংগ্রেসও এখন তাকে ছেড়ে বিহারে নীতীশ কুমারের সঙ্গে হাত মেলানোর অঙ্ক কষছে।

আর ভারতে প্রভাবশালী রাজনীতিকদের দুর্নীতির জন্য কখনও কোনওদিন সাজা হয় না -- এই ধারণাটা পাল্টাতে পারে আজকের পরে, বলেছে বিজেপি।

দলের মুখপাত্র রাজীবপ্রতাপ রুডি আরও বলছিলেন, ''গত ১০ বছর ধরে কংগ্রেসের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করে দুর্নীতির অভিযোগ আড়াল করে এসেছেন লালুপ্রসাদ। কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারলেন না। অনেক দেরিতে হলেও সিবিআই আদালত অবশেষে একটা নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিল।''

যে লালুপ্রসাদ যাদবকে এক সময় মানুষ চিনত বিহারের মসিহা বা পরিত্রাতা হিসেবে, তিনি জেলে যাওয়ার পর রাজ্যের নানা জায়গায় আজ দেদার আতসবাজিও ফেটেছে।

সিপিআই(এমএল) দলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বিহারের রাজনীতির অলিগলি খুব ভাল চেনেন, তিনি বলছিলেন এতে কিন্তু অবাক হওয়ার কিছু নেই।

তাঁর কথায়, ''১৯৯০ সালে লালুপ্রসাদ যাদব যখন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তখন তাঁকে ঘিরে বিহারের গরিব, বঞ্চিত মানুষ বিরাট স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের মোহভঙ্গ হয়েছে। আজ তিনি সেই অতীতের মলিন ছায়া ছাড়া কিছু নন।''

ফলে গোটা বিহার বা ঝাড়খন্ডে সোমবার কোথাও কোনও বড় বিক্ষোভ পর্যন্ত দেখাতে পারেনি রাষ্ট্রীয় জনতা দল। দলের প্রবীণ নেতা রঘুবংশ প্রতাপ সিং স্পষ্টই বলছেন, তারা এখন তাকিয়ে আছেন এখন উচ্চ আদালতের দিকে।

হাইকোর্টে আপিল করলে রায় খারিজ হতে পারে, এটুকুই এখন লালুপ্রসাদের দলের বলভরসা। কিন্তু এমন রঙিন ও আকর্ষণীয় চরিত্রের এক রাজনীতিকের আজকের এই করুণ পরিণতির পেছনে রহস্যটা কী?

বামপন্থী নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যর ব্যাখ্যা করছেন, লালুপ্রসাদ অবশ্যই একজন ব্যতিক্রমী ও বর্ণময় রাজনীতিক – কিন্তু হাসিঠাট্টা কিংবা বিনোদনের মোড়কে তিনি আর তাঁর রাজনৈতিক শূন্যতাকে ঢাকতে পারছেন না! ''ফর্ম দিয়ে কনটেন্টের ব্যাঙ্করাপ্সিকে আর কতদিন আড়াল করা যাবে?'', বলছেন তিনি।

রাজনৈতিক সারবস্তুর দেউলিয়াপনাটা আগেই ফাঁস হচ্ছিল, আর রাঁচির সিবিআই আদালত ভারতের সবচেয়ে আলোচিত রাজনীতিবিদদের একজন, লালুপ্রসাদ যাদবের রাজনৈতিক অবিচুয়ারিটাও লিখে ফেলল বলে অনেক পর্যবেক্ষকই ধারণা করছেন।