ফেলানি হত্যার পুনর্বিচারের সিদ্ধান্ত নিল বিএসএফ

ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ জানিয়েছে, সীমান্তে বাংলাদেশের কিশোরী ফেলানি খাতুন হত্যা মামলার ‘রিভিশন ট্রায়াল’ বা পুনর্বিচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।

বিএসএফের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার ওপর ফেলানি খাতুন হত্যাকান্ডের যে রায় বিএএসএফের বিভাগীয় আদালত দিয়েছে, সেই রায়ের সঙ্গে তারা একমত হতে পারছেন না। তাই অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে অবিলম্বে পুনর্বিচার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। বিএসএফেরই আভ্যন্তরীণ আদালতে এই বিচার হবে।

বিএসএফের মহাপরিচালক সুভাষ যোশি বাংলাদেশ সফরে যাওয়ার মাত্র একদিন আগে ফেলানি হত্যাকান্ডের বিচারের ব্যাপারে এই সিদ্ধান্ত জানানো হলো। ঢাকায় দুই দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের এক বৈঠকে যোগ দিতে সুভাষ যোশি সেখানে যাচ্ছেন। বিএসএফের মহাপরিচালক হিসেবে এটিই হবে তার প্রথম ঢাকা সফর।

দিল্লি থেকে বিবিসির শুভজ্যোতি ঘোষ জানান, ফেলানি হত্যা মামলার রায়ে বাংলাদেশে যে বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, সে পটভূমিতেই বিএসএফ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তিনি জানান, ঢাকা সফরে যাওয়ার আগে বিএসএফের মহাপরিচালক শুক্রবার দিল্লিতে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তারপরেই বিএএসএফের তরফ থেকে ফেলানি হত্যা মামলার পুনর্বিচারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারী ভোরে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার অন্তর্গত চৌধুরীহাট সীমান্ত চৌকির কাছে কাঁটাতারের বেড়া পেরনোর সময়ে ফেলানি খাতুন কনস্টেবল অমিয় ঘোষের গুলিতে মারা যান। দীর্ঘক্ষণ তাঁর দেহ বেড়ার ওপরেই ঝুলে ছিল।

নিহত এই কিশোরির ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় বাংলাদেশে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই হত্যাকান্ডের জন্য বি এস এফের কড়া নিন্দা করেছিল।

বি এস এফের ১৮১ নম্বর ব্যাটালিয়নের কনস্টেবল অমিয় ঘোষের বিরুদ্ধে ভারতীয় দন্ডবিধির ৩০৪ ধারায় অনিচ্ছাকৃত খুন এবং বি এস এফ আইনের ১৪৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছিল।

সেনাবাহিনীর কোর্টমার্শালের অনুরূপ বি এস এফের নিজস্ব আদালত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্ট এই মামলায় অমিয় ঘোষকে নির্দোষ বলে মুক্তি দেয়। এই মামলাটিই এখন আবার পুনর্বিচারের সিদ্ধান্ত নিল বিএসএফ।

ফেলানির পরিবারের প্রতিক্রিয়া

বিএসএফের এই সিদ্ধান্তের পর ফেলানি খাতুনের বাবা নুরুল ইসলাম বিবিসিকে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, "আমরা চাই বিচারটা যেন সুষ্ঠুভাবে হয়, ভালোভাবে হয়। আমি চাই, যে বা যারা আমার মেয়েকে হত্যা করেছে, তাদের যেন ফাঁসি হয়। ভারত সরকারের কাছে, বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। নতুন সিদ্ধান্তের কথা জেনে আমার ভালো লাগছে। ভালোভাবে যেন বিচারটি শেষ করা হয়, এটাই আমার চাওয়া।"

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা এখনি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন মন্তব্য করতে চান, বরং পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করছেন।

মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলছেন, রায়ের বিষয়টি যখনি আমরা জানতে পেরেছি, বিভিন্ন লেভেলে আমরা বিএসএফের সাথে যোগাযোগ করেছি। তারা আমাদের জানিয়েছে, যে রায়টি হয়েছে, সেটি মহাপরিচালক পর্যায়ে যায়নি এবং সেখান থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। যেকোনো বাহিনীতে, নিন্মপর্যায়ে যখন কোন বিচারিক রায় হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত সেটি বাহিনী প্রধান নিশ্চিত না করেন, সেটাকে চূড়ান্ত রায় বলা যাবে না। এটা নিশ্চিত হয়নি বলেই আমরা জেনেছি। বাহিনী প্রধানের কাছে যখন বিষয়টি যায়, তিনি কিন্তু অনেকগুলো বিষয় দেখেই সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সামগ্রিকভাবেই বিচারিক বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি আইনি বিষয় যেমন দেখেন, পারিপার্শ্বিক বিষয় দেখেন, প্রেক্ষাপট দেখেন।

বিজিবি জানিয়েছে, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সীমান্তের হত্যাকাণ্ড আর আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার বন্ধের বিষয়েও আলোচনা হবে।

বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফেলানি হত্যার বিচারের পাশাপাশি পাশাপাশি সীমান্তে হত্যা বা গুলিবর্ষণের মতো ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই বিষয়টিতেও তারা জোর দিচ্ছেন।