মুজাহিদ: আল বদর থেকে জামায়াত

  • ১৭ জুলাই ২০১৩
জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ

জামায়াতে ইসলামীর সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে পরিচিত আলী আহসান মো: মুজাহিদ। একযুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই দলের দ্বিতীয় সর্ব্বোচ্চ পদে অর্থাৎ সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দলটির সমমনা বাংলা দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর মনে করেন, লিঁয়াজো করারও একটা ক্ষমতা মি: মুজাহিদের রয়েছে। তিনিই জামায়াতের পক্ষ থেকে অন্য দলের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে আসছিলেন।

মি: বাবর বলেছেন, জেনারেল এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময় বিএনপি,আওয়ামী লীগসহ অন্যদলগুলোর সাথে মি: মুজাহিদ লিঁয়াজো করতেন জামায়াতের পক্ষ থেকে।

৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এর বিপক্ষের তৎপরতায় অন্যতম একজন সংগঠক হিসেবে দ্রুত পরিচিতি পেয়েছিলেন আলী আহসান মো: মুজাহিদ।

সেই যুদ্ধে গণহত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে গবেষণা করেছেন এম এ হাসান। তিনি বলছিলেন, ‘মি: মুজাহিদ ৭১’র শুরুতে তেমনটা পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু যুদ্ধ যতই এগিয়ে যায়, মি: মুজাহিদও আল বদর বাহিনীর অন্যতম একজন সংগঠক হিসেবে এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের অন্যতম নেতা হিসেবে সারাদেশে পরিচিতি পান।

মি: হাসান উল্লেখ করেছেন, ‘মি: মুজাহিদ আল বদর বাহিনী গঠনে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজাকার ক্যাম্পগুলোও পরিদর্শন করে সেগুলোও সক্রিয় করার কাজ করেছিলেন। যুদ্ধে অনেক গুরুতর মানবতা বিরোধী অপরাধ আল বদর বাহিনীই সরাসরি ঘটিয়েছিল এবং সর্বশেষ ঘটনা ছিলো মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের দু’দিন আগে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড।’

আলী আহসান মো: মুজাহিদের জন্ম ফরিদপুর শহরে পশ্চিম খাবাসপুর এলাকায় তাঁর দাদার বাড়িতে ১৯৪৮ সালে।

সেখান থেকেই বিএ পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছিলেন ৭০ সালে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেটে মাস্টার্স পাশ করেছিলেন। স্কুল জীবনেই বাবার হাত ধরে তিনি জামায়াতের ছাত্রসংগঠনের সাথে জড়িত হয়েছিলেন।

মি: মুজাহিদের ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর জানিয়েছেন, তাঁর বাবা ৭১ সালের জুলাই মাসে ছাত্র সংঘের সাধারণ সম্পাদক এবং দু’মাসের মাথায় সংগঠনটির সভাপতি হয়েছিলেন।

মি: মাবরুর বলছিলেন, ‘আমার দাদা মরহুম মওলানা আব্দুল আলী ১৯৬২সাল থেকে ৬৪ সাল পর্যন্ত ফরিদপুরে জামায়াতে ইসলামী থেকে এমএলএ ছিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই আমার বাবা এবং তাঁর কয়েক ভাই স্কুল জীবনেই ইসলামী ছাত্র সংঘের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন।’

মি: মুজাহিদ ৬৮ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। ৭০ এর ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় এসে ছাত্রসংঘের ঢাকা জেলা শাখার সেক্রেটারী হয়েছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি হন।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে আলী আহসান মো: মুজাহিদ আত্মগোপনে গিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের শেষদিকে যখন পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূল হয়, তখন তিনি নারায়ণগঞ্জে তাঁর শ্বশুর বাড়িতে থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত হয়েছিলেন। তবে জামায়াতের রাজনীতি থেকে সরে যাননি।

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ

মুক্তিযুদ্ধের পর যে চার বছর জামায়াত নিষিদ্ধ ছিল, সেই প্রেক্ষাপটে আইডিএল নামে তিনিও অন্য সহকর্মীদের সাথে দলের তৎপরতা চালাতেন।

আলী আহমেদ মাবরুর-এর বক্তব্য হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের পর তাঁর বাবা ঢাকা,নারায়ণগঞ্জ এবং ফরিদপুর, এর মধ্যেই থেকেছেন। ৭৩ সালে মি: মুজাহিদ তাঁর মামাতো বোনকে বিয়ে করেন।

নারায়ণগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে থেকে আদর্শ স্কুল নামের একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। সেই স্কুলে ৭৭সাল থেকে চার বছর তিনি অধ্যক্ষও ছিলেন।

শিক্ষক থাকার সময়ও তিনি জামায়াতের রাজনীতি করতেন। ৮১ সালে ঢাকায় এসে তিনি মহানগর জামায়াতের আমীর হয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমীর থেকে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হয়েছিলেন।

২০০০ সালে জামায়াতের দ্বিতীয় সর্ব্বোচ্চ পদ সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পান। তিন বছরের বেশি সময় ধরে গ্রেফতার থাকলেও তিনি জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে রয়েছেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময়ে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হয়েছিলেন আলী আহসান মো: মুজাহিদ। সেই সরকারের পাঁচ বছর তিনি সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি জামায়াতের নেতা হিসেবে প্রথম সংসদ নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন ১৯৮৬ সালে জেনারেল এরশাদ সরকারের সময়ে । এরপর ২০০১ সাল বাদ দিয়ে সবক’টি সংসদ নির্বাচনেই অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু জিততে পারেননি।

ফরিদপুরে নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেন আলতাফ হোসেন। তিনি বলছিলেন, ছাত্র সংঘের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় এর বিপক্ষে মি: মুজাহিদের তৎপরতার বড় অংশ ছিলো ঢাকায়। কিন্তু সেই ভূমিকার বিষয়টিই এখনকার জামায়াত নেতার প্রতিটি নির্বাচনেই বড় ইস্যু হয়ে দেখা দিতো।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার দেড় বছরের মাথায় ২০১০ সালের জুন মাসে জামায়াতের আরও তিনজন শীর্ষ নেতার সাথে আলী আহসান মো: মুজাহিদকে গ্র্রেফতার করা হয় ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানার অভিযোগে একটি মামলায়।

পরে তাঁর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয় এবং এখন এর রায় হলো।

সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগে তার মৃত্যুদন্ডের আদেশ হয়েছে।