জনগণের তোপের মুখে পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী

  • ১৭ জুন ২০১৩
মমতা ব্যানার্জী
মমতা ব্যানার্জী, মুখ্যমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ

কলকাতার উপকন্ঠে বারাসাতে গণধর্ষণ করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল যে কিশোরীকে, ঘটনার ১০ দিন তাঁর বাড়ীতে যাওয়ার পর রোববার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়েন।

স্থানীয় মহিলাদের প্রতিবাদের জবাবে মেজাজ হারিয়ে তাঁদের ধমক দেন মমতা ব্যানার্জী এবং বিক্ষোভকারীদের বামপন্থী সমর্থক বলেও উল্লেখ করেন।

পরে খুব দ্রুত তাঁকে নিহত কিশোরীর বাড়ি থেকে চলে যেতে হয়।

রোববার দুপুরে হঠাৎই কামদুনি নামের ওই গ্রামটিতে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি গণধর্ষিতা ও নিহত কলেজ ছাত্রীর পরিবারের সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন, তখনই বাড়ির বাইরে স্লোগান শুরু হয়। মুখ্যমন্ত্রী অত্যাচারিতা মেয়েটির পরিবারকে আশ্বাস দেন যে ধৃতদের বিরুদ্ধে ১৫ দিনের মধ্যে চার্জশিট পেশ করা হবে, এক মাসের মধ্যে শাস্তি এবং ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচার হবে দোষীদের৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দোষীদের ফাঁসি চাইবে রাজ্য সরকার৷

বিক্ষোভকারীরা বেশীর ভাগই ছিলেন মহিলা। তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জানতে চান যে কেন এতদিন তিনি যান নি ওই গ্রামে। মিনিট পাঁচেক থেকেই তিনি যখন বাড়ির বাইরে আসেন, তখন বিক্ষোভ আরও বেড়ে যায়৻ এই সময়েই মেজাজ হারিয়ে বিক্ষোভরত মহিলাদের দিকে ধেয়ে গিয়ে মমতা ব্যানার্জীকে বলতে শোনা যায় "চুপ করুন, বেশি কথা বলবেন না।" এর পরে গাড়ীতে উঠতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "অভিযু্ক্ত ও আজ যাঁরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তাঁরা সিপিএমের কর্মী সমর্থক।''

গত ৭ই জুন দুপুরবেলা কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরার সময়ে একটি নির্মীয়মাণ কারখানার ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করে ২০ বছর বয়সী ঐ মেয়েটিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় । ওই ঘটনায় ধৃতেরা সবাই স্থানীয় ব্যক্তি এবং সকলেই নেশাগ্রস্ত ছিলেন।

মুখ্যমন্ত্রীর আগে তাঁর মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা বেশ কয়েকবার কামদুনি গ্রামে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই স্থানীয় মানুষের বিক্ষোভে তাঁদের পিছু হঠতে হয় – কেউই ঢুকতে পারেন নি।

ঐ কলেজ ছাত্রীর দুই ভাইকে যখন মহাকরণে ডেকে পাঠিয়ে চাকরি আর ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেন মুখ্যমন্ত্রী, মৃত মেয়েটির পরিবার সব প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করে দেন।

এতদিন মুখ্যমন্ত্রীর ওই নির্যাতিতা মেয়েটির বাড়ীতে না যাওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে – যখন বিরোধীনেত্রী থাকার সময় যে কোনও ঘটনা ঘটামাত্র মমতা ব্যানার্জী ছুটে যেতেন, সেখানে কামদুনির ঘটনা ঘটার এতদিন পরেও মুখ্যমন্ত্রী কেন সেখানে গেলেন না – এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমেও কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি মুখ্যমন্ত্রী।

সম্প্রতি প্রকাশিত ভারতের জাতীয় অপরাধ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে যে সারা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই মহিলাদের ওপরে অত্যাচারের সংখ্যা সবথেকে বেশী। গতবছরও মহিলা নির্যাতনের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে ছিল পশ্চিমবঙ্গ।

পরিসংখ্যান আর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলির মধ্যে রয়েছে পার্ক স্ট্রীটে চলন্ত গাড়ীতে গণধর্ষণ থেকে শুরু করে একের পর এক ঘটনা।

কামদুনির এই কলেজছাত্রীর ধর্ষণ ও মৃত্যুর পরেও গত কয়েকদিনে দক্ষিনবঙ্গেই একই ধরনের আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।

কিন্তু বেশিরভাগ ঘটনাতেই মুখ্যমন্ত্রী নিজে অথবা তাঁর দলের নেতা নেত্রীরা প্রতিক্রিয়া হয়েছে ‘ওটা সাজানো ঘটনা’ আর সর্বশেষ সংযোজিত হল অভিযুক্তরা সিপিএম-এর লোক।

সাধারণ মানুষদের একটা বড় অংশ বলছে, ক্ষমতাসীন দল আর সরকারের এই ধরনের মন্তব্যে আসলে অপরাধের মানসিকতা রয়েছে যাদের, তাদের সাহস বেড়ে যাচ্ছে। নৃশংসতার নিরিখে আগের ঘটনাগুলোকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, পুলিশপ্রশাসন এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে জাতীয় পরিসংখ্যানে গলদ আছে – এত ধর্ষণ, অত্যাচার পশ্চিমবঙ্গে হয় না।

অথচ রাজ্যের মহিলা কমিশন বিবিসিকে জানিয়েছে, জাতীয় পরিসংখ্যানের থেকেও অত্যাচার-নির্যাতনের আসল সংখ্যাটা আরও বেশী। অনেক সময়ে অত্যাচারিতা মহিলারা অভিযোগ জানান না আবার অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ অভিযোগই নেয় না।

এই খবর নিয়ে আরো তথ্য