BBC navigation

আসামে 'বিদেশী বিতাড়ণ' আন্দোলনের লক্ষ্য বাঙালি মুসলমান?

সর্বশেষ আপডেট সোমবার, 24 সেপ্টেম্বর, 2012 13:59 GMT 19:59 বাংলাদেশ সময়

দক্ষিণ আসামের কোকরাঝাড় এলাকার দাঙ্গায় গৃহহীণ একটি মুসলিম পরিবার

আসামের কম-বেশী সব শহরেই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে ‘বিদেশী বিতাড়ণ’ আন্দোলনের তোড়জোড়৻ জায়গায় জায়গায় মিটিং-মিছিল, জমায়েত, মানব-শৃঙ্খল৻

অনেকটা ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত যে আন্দোলন আসামকে উত্তাল করে তুলেছিল, তার আদলে৻

গৌহাটি, ডিব্রুগড়, তিনসুকিয়া, জোড়হাট, তেজপুর- সবখানেই উঠেছে এক স্লোগান- “বহিরাগত, আসাম এরি উলাই যোয়া” (বহিরাগত, আসাম ত্যাগ করো)৻

আর আন্দোলনের লক্ষ্য সেই রাজ্যের লাখ লাখ পূর্ববঙ্গীয় মূলের মুসলমান, যাদের প্রথমে ইংরেজ আনতে শুরু করেছিল আসামের অসংখ্য নদীর চর-চাপোরী এবং নিচ জমিতে ফসল ফলানোর জন্য৻

এদের এক সময় ‘ন-অসমীয়া বা ‘নতুন অসমীয়া’ বলে গ্রহণ করা হয়, কারণ মূলত কৃষিজীবী এই সব মুসলমানরা জায়গা-জমি পেয়ে আসামকে নিজের মাতৃভূমি হিসাবে গ্রহণ করে, একের পরে এক জন-গণনায় (আদম শুমারি) নিজের মাতৃভাষা অসমীয়া বলে লিখে থাকে৻

যখন আসামের বাঙালিরা ১৯৬০-৬১ সালে মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবীতে পথে নামে, শিলচর শহরের রেললাইনের ধারে ১১ জন যুবক-যুবতী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়, সে-সময় পূর্ব-বঙ্গীয় মূলের এই মুসলমানরা ব্রহ্মপুত্রের উপত্যকায় সে আন্দোলনে জড়ায় নি৻

কিন্তু ১৯৭৯ সালে আসামে নিখিল অসম ছাত্র সংস্থা (আসু)-র নেতৃত্বে যে ‘বিদেশী বিতাড়ণ’ আন্দোলন শুরু হয়, প্রথম থেকেই মূলত তার লক্ষ্য ছিল এইসব মুসলমানরা৻

আসামে ত্রান শিবির

আসামে ত্রান শিবির

একদা ন-অসমিয়া থেকে তাদের পরিচিতি রাতারাতি বদলে যায়, স্থানীয় অসমীয়ারা তাদের ‘মিঞা’ এবং ‘বাংলাদেশী’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করে৻

আন্দোলনকারীদের কু-নজরে পড়ে এমনকি যারা ১৯৭১-এ বাংলাদেশের জন্মের আগে পূর্ববঙ্গ অথবা পূর্ব-পাকিস্তান ছেড়ে আসামে এসেছে৻

উনিশ্শ-উনোসত্তর থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত চলা আন্দোলনের সময় অনেক হানাহানি হয়েছে৻

অবিভক্ত নগাঁও জেলার নেলিতে ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে একদিনের হত্যাকান্ডে ১৮০০-র বেশী মুসলমান প্রাণ হারায়৻

পরবর্তী সময়ে বোড়ো উপজাতিদের জন্য গড়ে ওঠা স্বশাসিত পরিষদের এলাকায় ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অফ বোড়োল্যান্ড’ বা এনডিএফবি জঙ্গীদের আক্রমণে প্রচুর মুসলমান প্রাণ হারায়৻

তখন অবশ্য বাঙালি হিন্দু অথবা সাঁওতাল ও নেপালীদের লক্ষ্য করেও এনডিএফবি হামলা চালাতো৻

কিন্তু এ’বছর জুলাই মাসে পশ্চিম আসামের ওইসব জেলাগুলোতে যে জাতিগত সংঘর্ষ শুরু হয়, তা সীমাবদ্ধ থাকে বোড়ো এবং পূর্ববঙ্গীয় মূলের মুসলমানের মধ্যে৻

এক’শর বেশী প্রাণহানি হয়েছে ওই এলাকায়, চার লাখের বেশী মানুষ গৃহহীন হয়েছে, যাদের সিংহভাগ মানুষ হল ওইসব মুসলমানরা৻

ভয় আর অনিশ্চয়তা

প্রশাসন যখন এইসব গৃহহীনদের ঘরে ফেরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, ঠিক তখনই এনডিএফবি এবং বোড়োল্যান্ড জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি দাবী করে, ভারতীয় নাগরিকত্ব স্পষ্টভাবে যাচাই না করে এইসব মুসলমানদের নিজগ্রামে ফিরতে দেওয়া যাবে না৻

ফেরার চেষ্টা করার সময় তাদের লক্ষ্য করে কয়েকটি জঙ্গী হামলাও সংগঠিত করা হয়৻

শরনার্থী শিবির পরিচালনকারী কর্মকর্তারা বলছেন, আশ্রয় নেওয়া অনেক মুসলমান এখন নিখোঁজ - শিবিরেও নেই, গ্রামেও ফেরেনি৻

সম্ভবত ভয় ও অনিশ্চয়তার কারণে আসাম ছেড়ে পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছে৻

"আমরা কবে আসামে এসেছি, আজ আর তা কেউ দেখতে চান না৻ এখানে আমরা সবাই আজ বাংলাদেশী"

হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরী

এনডিএফবি এবং তার সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ আসাম বা ‘আলফা’-র আলোচনা পন্থী গোষ্ঠী এবং ‘আসু’ ও অসম জাতীয়তাবাদী যুব ছাত্র পরিষদের মতো অসমীয়া গোষ্ঠীগুলো৻

বোড়োভূমিতে চলতে থাকা হানাহানি তাদের ক্ষয়িষ্ণু ভাবমূর্তি চাঙ্গা করার এক নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে৻ তাই এদের মধ্যে চলছে জোট বাঁধার পালা৻

এমনকি মেঘালয়ের রাজ্যপাল এবং ভারতের ন্যাশনাল সিকিওরিটি গার্ডস এর প্রাক্তন মহাপরিচালক রঞ্জিত শেখর মুসাহারিও এই নিয়ে “বিদেশী বিতাড়ণ” আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন৻ উনি বোড়ো সম্প্রদায়ের ৻

বস্তুতপক্ষে এই আন্দোলন আসামের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী মেঘালয়, নাগাল্যান্ড এমনকি মনিপুরেও৻

নাগাল্যান্ডের ডিমাপুর শহরে ইতমধ্যেই নাগা কাউন্সিল, নাগা স্টুডেন্টস ফেডারেশন আর নাগা হোহো এক মঞ্চে শামিল হয়ে হুমকি দিয়েছে, তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘বিদেশীদের’চিহ্নিত করবে৻

নাগাল্যান্ড সরকার অবশ্য তাদের গ্রেপ্তারের হুমকি দেওয়ায় এই সংগঠনগুলো খানিকটা পিছিয়ে যায়৻

মেঘালয় ও মণিপুরেও স্থানীয় অনেক সংস্থা ‘বিদেশী চিহ্নিত করতে সচেষ্ট হবে বলে হুমকি দিয়েছে৻

নর্থইস্ট স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন ইতমধ্যেই সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারত জুড়ে এই দাবীতে একদিনের বনধ্‌ পালন করেছে৻

এখন, আসামের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশর বেশী হল এই পূর্ববঙ্গীয় মূলের মুসলমান৻ রাজ্যের বেশ কিছু জেলায় এরা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ৻

মূলত এই সম্প্রদায়ের মধ্যে গড়ে ওঠা আসাম ইউনাইটেড ডেমক্রেটিক ফ্রন্ট বা ‘এইউডিএফ’ আজ রাজ্য বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দল।

আর ক্ষমতাসীন কংগ্রেসও বিজেপি অথবা অসম গণ পরিষদ নয়, মওলানা বদরুদ্দিন আজমল নেতৃত্বাধীন এই এইউডিএফ-কে নিয়েই বেশী চিন্তিত৻

এই মুসলমানদের মধ্যে কারা বাংলাদেশ জন্মের আগে, অর্থাৎ ১৯৭১-এর আগে আসামে প্রবেশ করেছে আর কারা তার পরে করেছে, স্থানীয় মানুষ তা খুব একটা দেখতে চায়না৻

কারণ ১৯৮৫-র আসাম চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭১-র ২৬ মার্চের আগে যারা এসেছে, তারা ভারতীয় নাগরিক হতে পারবে৻

তাই আইনের চোখে একমাত্র যারা এই তারিখের পর ভারতে প্রবেশ করেছে, তারাই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, বাকিরা নয়৻

কিন্তু বাস্তবে কি হয়?

‘আমরা কবে আসামে এসেছি, আজ আর তা কেউ দেখতে চান না৻ এখানে আমরা সবাই আজ বাংলাদেশী'',বললেন সংখ্যালঘু নেতা এবং আসামের বর্ষীয়ান আইনজীবি হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরী৻

সম্পর্কিত বিষয়

BBC © 2014 বাইরের ইন্টারনেট সাইটের বিষয়বস্তুর জন্য বিবিসি দায়ী নয়

কাসকেডিং স্টাইল শিট (css) ব্যবহার করে এমন একটি ব্রাউজার দিয়ে এই পাতাটি সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে৻ আপনার এখনকার ব্রাউজার দিয়ে এই পাতার বিষয়বস্তু আপনি ঠিকই দেখতে পাবেন, তবে সেটা উন্নত মানের হবে না৻ আপনার ব্রাউজারটি আগ্রেড করার কথা বিবেচনা করতে পারেন, কিংবা ব্রাউজারে css চালু কতে পারেন৻