কার্টুন ডোরিমন নিয়ে বিতর্ক

doreamon

বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের অভিভাবকদের মধ্যে একটি কার্টুনচিত্র নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরী হয়েছে। ডোরিমন নামের এ কার্টুনটি মূলত: জাপানী কার্টুন হলেও বাংলাদেশে এটি প্রচারিত হয় ভারতীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেলে হিন্দী ভাষায়।

শিশুদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় এ কার্টুনটি দেখে শিশুরা বাংলা ভাষার চেয়ে হিন্দী ভাষার প্রতি বেশী আগ্রহী হয়ে উঠছে বলে অভিভাবকেরাও শংকা প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের অনেকেও এ বিষয়টিকে উদ্বেগের সাথেই দেখছেন। কিন্তু কেন একটি কার্টুন নিয়ে এত বিতর্ক ?

কার্টুন ডোরিমন জাপানী ভাষা থেকে হিন্দীতে ভাষান্তরিত করা হয়েছে। শিশুদের জন্যে ভারতীয় একটি হিন্দী চ্যানেলে এই কার্টুনটি প্রতিদিনই দেখানো হয়। কিন্তু ক্যাবল কানেকশনের কল্যাণে এই কার্টুনটি বাংলাদেশেও শিশুদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়।

৬ বছর বয়সী শিশু সুবাইয়া তাইয়্যিবা রূপকথা। খুব সাবলীলভাবেই হিন্দীতে ডোরিমন কার্টুনের গান গাইতে পারে। শুধু গানই নয়, সাবলীলভাবে হিন্দীতে কথাও বলতে পারে সে।

শুধু রূপকথাই নয়। রূপকথার মতো বাংলাদেশের শহর এবং মফস্বলের অনেক শিশুই হিন্দীতে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারে।

অনেক শিশুই এখন বাসায়, বন্ধুদের সাথে এমনকি স্কুলেও হিন্দী ভাষায় কথা বলছে। ইংরেজী মাধ্যমে পড়াশোনা করা শিশুদেরও দ্বিতীয় ভাষা হয়ে দাড়িয়েছে হিন্দী

শিল্পী খন্দকার, অভিভাবক

রূপকথার মা শিল্পী খন্দকার বলছিলেন শিশুর একটি নতুন ভাষা শেখাকে সমস্যা কেন মনে করছেন অভিভাবকেরা। "এটা আমাদের একটা জাতীয় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। সিন্দাবাদের ভূতের মতো এটি আমাদের কাঁধে উঠে বসেছে। অনেক শিশুই এখন বাসায়, বন্ধুদের সাথে এমনকি স্কুলেও হিন্দী ভাষায় কথা বলছে। ইংরেজী মাধ্যমে পড়াশোনা করা শিশুদেরও দ্বিতীয় ভাষা হয়ে দাড়িয়েছে হিন্দী।"

গত বেশ কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশেষ করে পত্রিকায় অভিভাবকেরা শিশুদের এই হিন্দী ভাষাপ্রীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে মিসেস খন্দকার যে আশংকা প্রকাশ করছেন, তা আসলেই কতটা বাস্তবসম্মত?

শিশু শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এবং গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. শারমিন হক বলছিলেন, অভিভাবকদের এই আশংকা অমূলক কিছু নয়। বরং ভবিষ্যতে এর ফলাফল আরো খারাপ হতে পারে।

"বেড়ে ওঠার সময়ে একটি ভাষাই যথেষ্ট। দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিশুরা স্কুলে ইংরেজী শিখছে। এরপর সে আবার কার্টৃন দেখে হিন্দী ভাষা শিখছে । এর ফলে তার ভাষার বিকাশ ব্যহত হচ্ছে।"

doremon

হিন্দী ভাষায় ভাষান্তরিত এ কার্টুনটি আসলে শিশুদের মধ্যে কতটা জনপ্রিয়? এটি জানার জন্যে রাজধানীর একটি স্কুলে গিয়ে দেখা গেল, সেখানকার প্রাথমিক পর্যায়ের অধিকাংশ শিশুরই সবচেয়ে পছন্দের টেলিভিশন অনুষ্ঠান হিন্দী ভাষান্তরিত ডোরিমন কার্টুন।

ডোরিমনের কল্পকাহিনী নির্মিত হয়েছে ভবিষ্যত থেকে আসা একটি রোবট বিড়ালকে নিয়ে। যে কিনা নোবিতা নামের একটি ছেলেকে সাহায্য করার জন্য বিংশ শতাব্দীতে এসে হাজির হয়। ১৯৬৯ সালে সর্বপ্রথম জাপানী এই কার্টুনটি কমিকস হিসেবে প্রকাশিত হয়।

২০০৮ সালে জাপানের সংস্কৃতিকে অন্যান্য দেশের কাছে তুলে ধরার জন্যে, জাপানী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ডোরিমনকে দেশটির প্রথম কার্টুন দূত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ডোরিমনের কার্টুনের কাহিনী নিয়েও আপত্তি রয়েছে অভিভাবকদের।

স্কুলের শিশুদের সাথে থাকা বেশ কয়েকজন অভিভাবকেরাও হিন্দী কার্টুন নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেন।

ড. হক বলছিলেন, ভিন্ন সংস্কৃতির এ কার্টুনের প্রতি শিশুরা যদি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ে। তবে তা সামাজিকভাবেও বিভিন্ন দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

কিন্তু একটি কার্টুন নিয়ে এত অভিযোগ স্বত্ত্বেও, অভিভাবকেরা শিশুদের কেন সেই কার্টুন দেখতে দিচ্ছেন? একজন অভিভাবক বলছিলেন "এই কার্টুন বন্ধ করে দেয়া হোক। কার্টুন যদি চলে, তবে বাচ্চাদের সেটা দেখা থেকে বিরত রাখা সম্ভব না।"

দক্ষ নির্মাতার অভাব এবং বাজেট স্বল্পতার কারণে স্থানীয় চ্যানেলগুলো শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণের ঝুঁকি নিতে চায় না

শামীম শাহেদ, বাংলাভিশন

ড. হক বলছিলেন, অভিভাবকেরাও অনেকসময়ই চান, যে বাচ্চারা যেন কিছু একটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

তবে এ সমস্যার একটি বড় কারণ হিসেবে অভিভাবকদের কথায়ও বারবার উঠে আসছিলেো বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলোতে শিশুতোষ অনুষ্ঠানের স্বল্পতার কথা।

বাংলাদেশে বর্তমানে একটি সরকারী টেলিভিশন চ্যানেল এবং বেশ অনেকগুলো বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল থাকা স্বত্তেও শিশুতোষ অনুষ্ঠানের এই স্বল্পতা কেন? স্থানীয় চ্যানেলগুলো কি শিশুদের জন্য অনুষ্ঠান তৈরী এবং প্রচারে আগ্রহী নয়?

বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান শামীম শাহেদ বলছিলেন, "কেউ কেউ আগ্রহী। তবে এক্ষেত্রে দক্ষ নির্মাতার অভাব এবং বাজেট স্বল্পতার কারণে অনেকেই শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণের ঝুঁকি নিতে চান না।"

কিন্তু অনেক অভিভাবকেরাও বলছিলেন, কার্টুনটি বাংলায় বা ইংরেজীতে ভাষান্তরিত করে বাংলাদেশে প্রচার করা হোক। তবে সেটিও বেসরকারী টেলিভিশনগুলোর জন্যে লাভজনক হবে না বলেই ধারণা করছেন মি. শাহেদ।

সমাধান কিভাবে হবে, সেটা নিয়ে হয়তো সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিদের আরো ভাবতে হবে। কিন্তু ভিন্ন ভাষার এই ডোরিমন কার্টুনটি যে শিশুদের ভাষা শিক্ষা এবং সামাজিক বিকাশ নিয়ে অভিভাবকদের কপালে একটি চিন্তার রেখা ফেলে দিয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

সর্বশেষ সংবাদ

অডিও খবর

ছবিতে সংবাদ

বিশেষ আয়োজন

BBC navigation

BBC © 2014 বাইরের ইন্টারনেট সাইটের বিষয়বস্তুর জন্য বিবিসি দায়ী নয়

কাসকেডিং স্টাইল শিট (css) ব্যবহার করে এমন একটি ব্রাউজার দিয়ে এই পাতাটি সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে৻ আপনার এখনকার ব্রাউজার দিয়ে এই পাতার বিষয়বস্তু আপনি ঠিকই দেখতে পাবেন, তবে সেটা উন্নত মানের হবে না৻ আপনার ব্রাউজারটি আগ্রেড করার কথা বিবেচনা করতে পারেন, কিংবা ব্রাউজারে css চালু কতে পারেন৻