পাকিস্তানী মডেল ও উৎসাহ

mongla cement factory

মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি

বাংলাদেশে সামরিকবাহিনীর বাণিজ্যে জড়িত হওয়ার বিষয়টি যে শুধুমাত্র পাকিস্তান থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া তাই নয় - বরং সামগ্রিকভাবে এবিষয়ে পাকিস্তানের দৃষ্টান্তকে মডেল হিসাবে অনুসরণের লক্ষণ সর্বত্রই সুস্পষ্ট৻

উত্তরাধিকার হিসাবে সেনা কল্যাণ সংস্থাকে পাবার পরও পাকিস্তানের অনুকরণে সেনাবাহিনীর তরফ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয় শুধুমাত্র তাদের জন্য আলাদা একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠার - যার আয় বা সম্পদ থেকে সাহায্য বা সুবিধা সশস্ত্রবাহিনীর অন্য কোন শাখার সদস্যরা পাবেন না - বরং তা শুধু সামরিকবাহিনীর সদস্যদের কল্যাণের লক্ষ্যেই কাজ করবে৻

সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ফৌজি ফাউন্ডেশন প্রায় দুই দশক সচল থাকার পরও পঁয়ষট্টির পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তানের সামরিক কর্তারা আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট প্রতিষ্ঠা করেন৻

ফৌজি ফাউন্ডেশন থাকার পর আবার কোন যুক্তিতে এবং কীভাবে পাকিস্তানে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট গঠিত হলো? এপ্রশ্নের জবাবে ‘ মিলিটারি ইনকর্পোরেটেড : ইনসাইড পাকিস্তান‘স মিলিটারি ইকোনমি‘ গ্রন্থের রচয়িতা ডঃ আয়েশা সিদ্দিকা বলেন যে আসলে আরো চারটি ফাউন্ডেশন গঠিত হয়৻ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট, নৌবাহিনী বেহরিয়া ফাউন্ডেশন, বিমানবাহিনী শাহিন ফাউন্ডেশন এবং এখন হয়েছে পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরী ফাউন্ডেশন৻

ডঃ সিদ্দিকার মতে এর কারণ অংশত আন্ত-বাহিনী প্রতিযোগিতা৻ যদিও তিনবাহিনীর জন্য প্রতিষ্ঠিত ফৌজি ফাউন্ডেশনের সুবিধা সবচেয়ে বেশী ভোগ করছিলো সেনাবাহিনী, তবুও সেই সেনাবাহিনীই প্রথমে আরেকটি প্রতিষ্ঠান আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট চালু করে৻

তখন তাদের যুক্তি ছিলো যে সেনাবাহিনী যেহেতু সবচেয়ে বড় বাহিনী এবং সর্বাধিক সংখ্যক সেনাসদস্য প্রতিবছর অবসরে যায় তাই ফৌজি ফাউন্ডেশনের আয় তাদের জন্য যথেষ্ট নয়৻

এরপর ১৯৭৮ সালে বিমানবাহিনী প্রতিষ্ঠা করে শাহিন ফাউন্ডেশন এবং নৌবাহিনী চালু করে বেহরিয়া ফাউন্ডেশন ১৯৮১ তে৻

পাকিস্তানের মতো একই যুক্তি

বাংলাদেশেও একই যুক্তি দেখিয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয় আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট প্রতিষ্ঠার৻

১৯৯৮ সালের জুন মাসে এই ট্রাষ্ট যাত্রা শুরু করলেও মাত্র দুই দশকের মধ্যে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের সম্পদের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে৻

pakistan army welfare trust

পাকিস্তান আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের মূল ভবন

সেনা কল্যাণ সংস্থার ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধি ততোটা দর্শনীয় না হলেও আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের ক্ষেত্রে চিত্রটা কিন্তু একেবারেই বিপরীত৻ বলা চলে, ট্রাষ্টের বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলো অনেক বেশী লাভজনক বলেই আপাতদৃশ্যে মনে হয়৻

আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের নিয়ন্ত্রণ তার ট্রাষ্টি বোর্ডের হলেও তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ মূলত সেনাসদরে কেন্দ্রীভূত৻ সেনাপ্রধান হলেন ট্রাষ্টের প্যাট্রন বা পৃষ্ঠপোষক , আর চেয়ারম্যান হলেন এডজুটেন্ট জেনারেল এবং সচিব ছাড়া বাকী ছজন সদস্যই সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার অধিকারী সামরিক কর্মকর্তা৻

ট্রাষ্টের কার্যক্রম সম্পর্কে জানার জন্য সেনাসদরের সাথে যোগাযোগের পর কয়েক মাস অপেক্ষা করেও সেনাবাহিনীর কোন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি৻

তবে এই ট্রাষ্ট যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সেনাবাহিনীতে ছিলেন এবং বর্তমানে সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে গবেষণা করছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম মুনীরুজ্জামান৻ জেনারেল মুনীরুজ্জামান সেনাবাহিনীর এধরণের বাণিজ্যে জড়িত হওয়া সমর্থন না করলেও এর প্রতিষ্ঠাকালের ঘোষিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন যে এগুলো লাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং তা বাণিজ্যিকভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে থাকে৻ এগুলো থেকে যেসব লাভ আসবে তা সৈনিকদের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে৻

এধরণের ট্রাষ্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চাকাঙ্খী বাণিজ্যিক প্রকল্পে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে যে বাংলাদেশের সামরিকবাহিনী পাকিস্তানের মডেল অনুসরণ করেছে শুধু তাই নয়, অন্তত একটি উদ্যোগের ক্ষেত্রে সরাসরি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ছাপ সুস্পষ্ট৻

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ঋণে সেনা কল্যাণ সংস্থার প্রকল্প:

mongla cement factory

মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি

সম্প্রতি আমি গিয়েছিলাম খুলনার কাছে মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরীতে৻ এই মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর প্রথম ইউনিটটি চালু হয় ১৯৯৪ সালে৻ তখন ঐ ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ছিলো ঘন্টায় পঁয়ষট্টি টন৻

২০০২ সালে মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরীতে সংযোজিত হয়েছে দ্বিতীয় আরেকটি ইউনিট – যেটির উৎপাদন ক্ষমতা ঘন্টায় ৩৫ টন৻ অর্থাৎ এখন তার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ঘন্টায় একশো টন৻

সেনাকল্যাণ সংস্থার এই সিমেন্ট এলিফেন্ট ব্রান্ড নামে বাজারে প্রচলিত৻ তবে, এই প্রতিষ্ঠানও ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালে লোকসানের মুখে পড়েছিলো৻ অবশ্য, ২০০৮ ও ২০০৯ সালে মংলা সিমেন্ট তার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশী মুনাফা করেছে৻ ২০০৮ এ যেখানে তাদের লক্ষ্য ছিলো বারো কোটি টাকা – সেখানে মুনাফা পৌঁছেছে ২৪ কোটি টাকায়৻

এক হিসাবে দেখা যায় –সেনাকল্যাণ সংস্থার সবকটি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মোট মুনাফা যা তার প্রায় অর্ধেকটই আসে এই একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরী থেকে৻

এই সিমেন্ট কারখানার ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায় যে ১৯৮৮ সালের তেরোই অক্টোবর পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হয় যে চুক্তির মূল বিষয় ছিলো পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ৻

পাকিস্তানের বিমানবাহিনী ও সামরিকবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা এমনভাবে কথা বলেন যাতে মনে হয় তাঁরা বাংলাদেশের সামরিকবাহিনীকে পাকিস্তানের সম্প্রসারিত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক অঙ্গ বলে মনে করেন৻

ড: আয়েশা সিদ্দিকা

সুদের হার ছিলো শতকরা মাত্র দুই শতাংশ৻ পাকিস্তানে তখন জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলের অবসান ঘটেছে মাত্র মাস দু / তিনেক আগে৻ রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনায় জেনারেল জিয়া নিহত হবার পর তৎকালীন সিনেটের চেয়ারম্যান ইসহাক খানের তত্ত্বাবধানে সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি যখন চলছিলো তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল আসলাম বেগ৻ সেসময়েই পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের জন্য এই ঋণ মঞ্জুর করে৻

এই ঋণেরই কিছুটা অংশ দিয়ে অর্থায়ন করা হয় বাংলাদেশে সেনা কল্যাণ সংস্থার প্রকল্প মংলা সিমেন্ট কারখানার৻

এক্ষেত্রে সরকারী একটি নথিতে দেখা যায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তির সাথে অসঙ্গতি থাকলেও এই প্রকল্পের যন্ত্রপাতি সংগ্রহে সেনা কল্যাণ সংস্থার তেমন একটা সমস্যা হয় নি৻

১৯৯০ এর ৬ই জুনের একটি চিঠিতে সেনাকল্যাণ সংস্থার তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে আসা একটি চিঠিতে লেখা হয়েছিলো :

‘‘সেনাকল্যাণ সংস্থা এবং পাকিস্তানের হেভি মেকানিকাল কমপ্লেক্স লিমিটেড এর সাথে চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান সরকারের চুক্তির কিছু অসঙ্গতি রয়েছে৻ (প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তিতে অগ্রিম প্রদানের কথা রয়েছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় চুক্তিতে তা নেই)৻ এব্যাপারে সত্ত্বর আমাদের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা আবশ্যক৻ ‘‘

এই প্রকল্পের অর্থ যখন জোগাড় করা হয় বাংলাদেশে তখন ছিলো সামরিক শাসন৻ আর, তৎকালীন পদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে বিবিসিকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে ঢাকায় তৎকালীন পাকিস্তানী হাইকমিশনার নিজে বেশ উদ্যোগী ছিলেন যাতে পাকিস্তানী ঐ ঋণ সেনাকল্যাণ সংস্থার সিমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে লাগে৻

‘পাকিস্তানের আগ্রহ ‘

উপমহাদেশের সামরিকবাহিনীগুলোর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডঃ আয়েশা সিদ্দিকা বলছেন বাংলাদেশের সামরিকবাহিনীকে পাকিস্তানের এধরণের সহায়তার বিষয়টি মোটেও অস্বাভাবিক নয়৻

ডঃ সিদ্দিকা বলেন যে এর মূল কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করা৻ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদস্থ এবং পুরোনো অনেক কর্মকর্তাই চান বাংলাদেশের সামরিকবাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক৻

dr ayesha siddiqa

মিলিটারি ইনকর্পোরেটেড গ্রন্থের রচয়িতা ড: আয়েশা সিদ্দিকা

ডঃ সিদ্দিকা বলেন যে তিনি অবরপ্রাপ্ত এমন এক জেনারেলকে চেনেন - যিনি এখন ব্যবসা করেন এবং অহরহই বাংলাদেশে যাওয়া আসা করেন ৻ তাঁকে কার্যত একজন যোগাযোগকারী হিসাবেও বর্ণনা করা চলে৻

ডঃ সিদ্দিকা বলেন যে তিনি এমন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন যেখানে পাকিস্তানের বিমানবাহিনী ও সামরিকবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা এমনভাবে কথা বলেছেন যাতে মনে হয় তাঁরা বাংলাদেশের সামরিকবাহিনীকে পাকিস্তানের সম্প্রসারিত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক অঙ্গ বলে মনে করেন৻ সুতরাং, তাঁরা যে বাংলাদেশের সামরিকবাহিনীকে এক্ষেত্রে সহায়তা দিতে আগ্রহী হবেন এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন ডঃ সিদ্দিকা৻

বাণিজ্যিক এসব প্রকল্প গ্রহণ এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছ্বতার প্রশ্নে বাংলাদেশে এখনও কোন রাজনৈতিক উদ্যোগ দেখা যায় না৻

আর, তাই সামরিকবাহিনীর শৃঙ্খলার যে বন্ধন, তার মোড়কে এসব বাণিজ্যিক উদ্যোগের বিষয়ে একধরণের গোপনীয়তার নীতি অনুসৃত হয়৻ ফলে, যেসব শিল্প ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ বা প্রকল্পে সামরিকবাহিনী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত সেগুলোর বিষয়ে খুঁটিনাটি তথ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব৻

ফৌজি বাণিজ্যের তৃতীয় পর্বে আমরা নজর দেবো সামরিকবাহিনীর বাণিজ্যে সম্পৃক্ত হবার শুরুটা যেখানে সেই সেনা কল্যাণ সংস্থার কার্যক্রমের দিকে ৻

(এই প্রামাণ্য ধারাবাবাহিকটি বিবিসি বাংলায় প্রচারিত হচ্ছে প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যে ও রাতের অনুষ্ঠান - প্রবাহ এবং পরিক্রমায়৻ )

সর্বশেষ সংবাদ

অডিও খবর

ছবিতে সংবাদ

বিশেষ আয়োজন

BBC navigation

BBC © 2014 বাইরের ইন্টারনেট সাইটের বিষয়বস্তুর জন্য বিবিসি দায়ী নয়

কাসকেডিং স্টাইল শিট (css) ব্যবহার করে এমন একটি ব্রাউজার দিয়ে এই পাতাটি সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে৻ আপনার এখনকার ব্রাউজার দিয়ে এই পাতার বিষয়বস্তু আপনি ঠিকই দেখতে পাবেন, তবে সেটা উন্নত মানের হবে না৻ আপনার ব্রাউজারটি আগ্রেড করার কথা বিবেচনা করতে পারেন, কিংবা ব্রাউজারে css চালু কতে পারেন৻