ইতিহাসের সাক্ষী

২৬ জুলাই ২০১৪ শেষবার আপডেট করা হয়েছে ২২:১০ বাংলাদেশ সময় ১৬:১০ GMT

abu ghraib
আবু গ্রাইবে কুকুর দিয়ে বন্দীনির্যাতন

ইরাকে ২০০৩ সালের মার্কিন অভিযানের কয়েক মাসের মধ্যেই সেখানকার আমিরিকানদের পরিচালিত কারাগারগুলোতে বন্দীদের নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ দেখা দেয়।

এর মধ্যে সবচাইতে আলোচিত ছিল আবু গ্রাইব নামের একটি কারাগারের বন্দী নির্যাতনের ঘটনা।

ওই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এরকম কয়েকজনের সাথে কথা বলেছেন বিবিসির লুসি বার্নস।

২০০৩ সালের মার্চ মাস। ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযান পুরোদমে চলছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আল-জাজিরার রিপোর্টার হিসেবে তখন কাজ করতেন সালাহ হাসান। তার কর্মস্থল ছিল বাগদাদের উত্তরে দিয়ালা প্রদেশে। একটি বিস্ফোরণের খবর সংগ্রহ করতে যাবার পথে আমেরিকান সৈন্যরা তাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

তিনি আল-জাজিরার হয়ে কাজ করেন এটা শোনার সাথে সাথেই তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়। নিয়ে যাওয়া হয় আবু গ্রাইব কারাগারে।

abu ghraib
আবু গ্রাইব

এর এক মাস আগেই গ্রেফতার করা হয়েছিল ইসলামী শিক্ষক আলি শালাল আব্বাসকেও।

"সেটা ছিল অক্টোবরের ১৩ তারিখ, আমি তখন কাজের জন্য বাগদাদ যাচ্ছি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম কেন তারা আমাকে আটক করছে। আমার সাথে তখন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের যোগাযোগ ছিল। কারণ আমার ধারণা ছিল যে বিমানবন্দর দখলের জন্য যে লড়াই হয়েছিল - তাতে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই জন্যই আমেরিকানরা আমাকে গ্রেফতার করেছিল এবং আমাকে নিয়ে গিয়েছিল আবু গ্রাইবে।"

বাগদাদের ঠিক বাইরেই আবু গ্রাইব কারাগার। সাদ্দাম হোসেনের সময় এই কারাগার কুখ্যাত ছিল নির্যাতন এবং হত্যাকান্ডের জন্য। তখন আমেরিকান সৈন্যরা এই কারাগারের একটা অংশকে তাদের সামরিক কারাগার হিসেবে ব্যবহার করতো।

এই কারাগারে বন্দীদের উলঙ্গ করে রাখা, যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, গায়ে গরম বা ঠান্ডা পানি ঢালা, জিজ্ঞাসাবাদের সময় মানসিক চাপ প্রয়োগ করা, কুকুর দিয়ে ভয় দেখানো, কানের কাছে উচ্চগ্রামে মিউজিক বাজানো - ইত্যাদি নানা রকমের নির্যাতন করা হতো।

abu ghraib
আবু গ্রাইব কারাগার

"আমার এখন আর মনে নেই কতবার আমাকে জিজ্ঝাসাবাদ করা হয়েছিল। সম্ভবত প্রতি দু দিনে একবার করে। সব জিজ্ঞাসাবাদেই নানাভাবে মানসিক চাপ প্রয়োগ করার পন্থা কাজে লাগানো হতো। কখনো কখনো ব্যবহার করা হতো কুকুর। সেই কুকুরগুলোকে আমাদের মুখের খুব কাছে নিয়ে আসা হতো। আমরা খুব কাছে তেকে তাদের ঘেউ ঘেউ চিৎকার শুনতে পেতাম। কখনো কখনো জিজ্ঞাসাবাদের সময় আমাদের ওপর ঠান্ডা পানি ঢালা হতো। কখনো কখনো শরীরের ওপর ঢেলে দেয়া হতো গরম চা।"

শালাল বলছিলেন, "তারা দুটো লাউডস্পীকার নিয়ে এলো। একেকটা প্রায় এক মিটার চওড়া। আমাকে ঘরের মধ্যে উপুড় করে শোয়ানো হলো। এর পর আমার দুই কানের ঠিক পাশে লাউডস্পীকার দুটি বসিয়ে তার পর তারা বনি-এমের ব্যবিলন ব্যাবিলন গানটা চালিয়ে দিলো। ভীষণ জোরে। এর পর দু একদিন আমি কিছুই শুনতে পেতাম না। ওরা আমাকে প্রশ্ন করতো কিন্তু আমি কোন জবাব দিতে পারতাম না। ওরা ভাবতো আমি ভান করছি। কিন্তু আসলে আমি ওদের প্রশ্ন শুনতেই পাচ্ছিলাম না।"

২০০৪ সালেল বসন্তকাল নাগাদ আবু গ্রাইবের নির্যাতনের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনাম হলো। পত্রপত্রিকায় ছবি বেরুলো, আমেরিকান সৈন্যরা ইরাকী বন্দীদের ওপর নানা ধরণের অবমাননাকর যৌন নিপীড়ন চালাচ্ছে। ইলেকট্রিক শক বা কুকুর দিয়ে হুমকি দিচ্ছে।

শালাল বলছিলেন, "সেলের দরজাগুলো ছিল শিক দিয়ে তৈরি । সুতরাং করিডোর থেকে সবাই দেখতে পেতো ভেতরে কি হচ্ছে। এবং তারা রাতদিন ২৪ ঘন্টা ধরে বন্দীদের নির্যাতন করতো। তারা সেখানে বন্দীদেরকে ধর্ষণ করতো। নারী ও পুরুষ সবাই। একজন আমেরিকান মহিলার হাতে ছিল একটা কৃত্রিম পুরুষাঙ্গ। সেটা দিয়ে সে একজন পুরুষ বন্দীকে ধর্ষণ করেছিল - সবার চোখের সামনে। লোকটি ছিল একটা মসজিদের ইমাম। এই ঘটনার দশদিন পরই তারা তাকে বললো, ওঃ আমাদের ভুল হয়ে গেছে। তোমার এখানে থাকার কথা নয়। তাকে ছেড়ে দেয়া হলো।"

abu ghraib
আবু গ্রাইব

আলি শালাল আব্বাসকে ছেড়ে দেয়া ৬৮ দিন পর। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের হস্তক্ষেপের ফলে।

সালাহ হাসানকে ছেড়ে দেয়া হয় দুমাস পর, যখন আলজাজিরা একজন আইনজীবী ইরাকের আদালতে তাকে হাজির করার রায় পেলেন।

শালাল বলেন, "আমি এখনো দুঃস্বপ্ন দেখি। আমাকে যেভাবে আহত করা হয়েছিল তা থেকে সেরে উঠতে আমাকে অনেকগুলো অপারেশন করাতে হয়েছে। সেখানে আমাদের যেভাবে অপমান করা হয়েছে, যেভাবে অত্যাচার করা হয়েছে তা আমাদের দেশকে আরো সহিংসতার পথে ঠেলে দিয়েছে।"

সালাহ হাসানের কথায় , "আবু গ্রাইব কারাগারের সেই অভিজ্ঞতা আমার স্মুতিতে স্থায়ী হয়ে গেছে। আমি ভুলতে চাইলেও তা সম্ভব নয়। আমার মনে বার বার সেই ঘটনাগুলো ফিরে আসতো । পরিবারের সাথে আমার সম্পর্কও আর আগের মতো নেই। সবকিছুই বদলে গেছে। আমার স্ত্রী বলে, আমি এর পর অনেক বদলে গেছি। আরো কঠোর হয়ে গেছি। একটুতেই রেগে যাই।"

সালাহ হাসান এখনো আলজাজিরাতেই কাজ করেন। থাকেন দোহায়। তিনি সহ চারজন আবুগ্রাইব কারাগারের সাবেক বন্দী এখন একটি আমেরিকান বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ এনে মামলা লড়ছেন।

আলি শালাল আব্বাসও এমনি একটি মামলা করেছিলেন তবে তা খারিজ হয়ে গেছে। এর পর তিনি নির্যাতনের শিকারদের চিকিৎসা করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বার্লিনে অবস্থান করছেন।