ইতিহাসের সাক্ষী

১৭ নভেম্বর ২০১৩ শেষবার আপডেট করা হয়েছে ২৩:২৬ বাংলাদেশ সময় ১৭:২৬ GMT

১৯৭৫ এর গ্রিন মার্চের স্মরণে মরক্কোতে উৎসব

১৯৭৫ সালের নভেম্বরে মরক্কোর বাদশাহ হাসান অভিনব কায়দায় সাহারা মরুভূমিতে তৎকালীন স্পেনের নিয়ন্ত্রিত একটি ভূখণ্ড দখলের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

তার নির্দেশে পঁচাত্তরের ৬ই নভেম্বর মরক্কোর কয়েক লাখ মানুষ মিছিল করে ঐ ভূখণ্ডের দিকে এগোয়। ইতিহাসে ঐ মিছিলকে গ্রিন মার্চ হিসাবে পরিচিত। বাদশার নির্দেশ ছিল নিরস্ত্র অবস্থায় স্প্যানিশ উপনিবেশটিতে ঢুকে পড়ার।

ঐ মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন মরক্কোর টিভি সাংবাদিক মানিনু সাদিক।

বিবিসির কাছে এক স্মৃতিচারণে তিনি বলেন মিছিলে পুরুষের পাশাপাশি মহিলারাও অংশ নিয়েছিল। মিছিলে অসংখ্য পতাকা উড়ছিল। আর সবার হাতে ছিল কোরান। আবার অনেকের হাতে ছিল বাদশাহ হাসানের ছবি।

"মরক্কোর পতাকার রং লাল। ফলে মিছিলটাকে মনে হচ্ছিল যেন লাল একটি স্রোত। স্রোতটি যেন শত বছরের ঔপনিবেশিক একটি শক্তিকে ভেঙ্গে চুরমার করার জন্য এগিয়ে চলেছে"।

মরু এই অঞ্চলটি স্প্যানিশরা দখল করেছিল উনবিংশ শতকের শেষ দিকে। নাম দিয়েছিল স্প্যানিশ সাহারা। এর একদিকে ছিল আটলান্টিক মহাসাগর, এবং সেই সাথে ছিল ফসফেট খনি।

কিন্তু ১৯৭৫ সাল নাগাদ, স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে, এবং আঞ্চলিক দুই শক্তি --মরক্কো এবং আলজেরিয়া অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণের জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ে।

সেই প্রেক্ষাপটে মরক্কোর বাদশাহ হাসান ঐ গণ-মিছিলের সিদ্ধান্ত নেন।

মহিলা-পুরুষ মিলিয়ে মিলিয়ে লাখ তিনেক মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেছিল।

মানিনু সাদিক জানান দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকেও মহিলারা এসেছিল। মারাকেশ থেকে যেমন, তেমনি অ্যাটলাস পর্বতের উঁচুতে বিভিন্ন গ্রাম থেকেও এসেছিলেন অনেকে। তাদের অনেকেই জীবনে কোনদিন সমুদ্র দেখেননি।

"আমার মনে আছে অনেক মহিলা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে অবাক হচ্ছিলেন কি করে পানি এত নীল। তবে ফেজ বা মারাকেশের মত শহরগুলো থেকে অনেক ধনী-অভিজাত পরিবারের মহিলারাও ছিলেন।"

বাদশাহ হাসান বলেছিলেন, স্প্যানিশরা যদি গুলিও চালায়, মিছিল চালিয়ে যেতে হবে। তবে স্প্যানিশরা গুলি করেনি।

তারপর হঠাৎ করেই একদিন বাদশাহ হাসান মিছিলকারীদের ঘরে ফিরে যেতে বললেন। মানিনু সাদিকের ভাষায় একটা কঠিন, বিভ্রান্তিকর দিন ছিল সেটি।

"অনেক মানুষ ফিরতে চাইছিল না। তারা বুঝতেই পারছিল না যে বাদশাহ দুদিন আগে বললেন গুলি হলেও যেন মিছিল না থামে, তিনিই আবার ফিরে যেতে বলছেন। অনেকে এটাকে একটা পরাজয় হিসাবে দেখছিলেন"।

এক সপ্তাহের মধ্যে মিছিলকারীদের সবাই বাড়ি ফিরে গেল। ১৪ই নভেম্বর ঘোষণা এলো, স্পেন উপনিবেশটি ছেড়ে দেবে। বদলে সাগরে মাছ শিকারের এবং ফসফেট খনিতে তাদের অধিকার থাকবে।

এলাকাটির নতুন নামকরণ হলো ওয়েস্টার্ন সাহারা বা পশ্চিম সাহারা। ভূখণ্ডটির উত্তরাংশ গেল মরক্কোর নিয়ন্ত্রণে। দক্ষিণাংশ পেল মৌরতানিয়া। ভাগাভাগি থেকে বাদ পড়লো আলজেরিয়া। পুরো ঘটনাটি বাদশাহ হাসানের পক্ষে গেল।

তবে ঐ চুক্তির মধ্যে রোপন হল ভবিষ্যতের দীর্ঘ এক বিরোধ আর অশান্তির বীজ। স্বাধীন ওয়েস্টার্ন সাহারার দাবিতে শুরু হল পোলিসারিও ফ্রন্ট নামে একটি গেরিলা সংগঠনের সশস্ত্র তৎপরতা। তাদের মদত দিল আলজেরিয়া। পরের ক’দশক ধরে চলল যুদ্ধ আর অশান্তি।

তবে মরক্কোতে ৭৫ এর ঐ গ্রিন মার্চকে দেশের ইতিহাসের মহান একটি পর্ব হিসাবে দেখা হয়। যে ঘটনার মধ্য দিয়ে মরক্কো তাদের পাওনা ভূমির অধিকার ফিরে পেয়েছিল এবং আধুনিক একটি সমাজ হিসাবে মরক্কোর নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল।