বিজ্ঞানের আসর

২৬ অক্টোবর ২০১৩ শেষবার আপডেট করা হয়েছে ২৩:১৪ বাংলাদেশ সময় ১৭:১৪ GMT

hominid_skull_georgia
জর্জিয়ায় পাওয়া হোমিনিডের খুলি

আগেকার তত্ব খারিজ করে একদল বিজ্ঞানী বলছেন, আলাদা আলাদা নয় বরং একটি প্রজাতির প্রাচীন মানব বা হোমিনিড থেকেই আধুনিক মানব বা হোমো সেপিয়েন্সের উদ্ভব।

মানুষের বিবর্তনের নানা তত্বের মধ্যে একটা হলো – আধুনিক মানব প্রজাতি অর্থাৎ হোমো সেপিয়েন্সের কোনো একক পূর্বপুরুষ নেই, এবং ২০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে একাধিক প্রজাতির দু-পেয়ে প্রজাতির অস্তিত্ব ছিল। কিছু নৃবিজ্ঞানী মনে করেন, এরকম প্রজাতির সংখ্যা ছিল কমপক্ষে তিনটি। এদের নাম হচ্ছে যথাক্রমে হোমো হ্যাবিলিস, হোমো রুডলফেনসিস, আর হোমো ইরেকটাস ।

কিন্তু সম্প্রতি আরেক দল বৈজ্ঞানিক দাবি করছেন, এটা ঠিক নয়। সায়েন্স সাময়িকীতে লেখা এক নিবন্ধে তারা বলছেন, আফ্রিকা এবং ইউরেশিয়াতে পাওয়া প্রাচীন মানুষের ফসিলের বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা তাদের ধারণা হয়েছে যে এগুলো একই প্রজাতির একাধিক বংশধারা – যা বিবর্তিত হয়ে আধুনিক মানবপ্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে।

হোমিনিড

বিজ্ঞানীদের এই দলটি জর্জিয়ার ডমানিসি-তে পাওয়া একটি হোমিনিড খুলি পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। ১৮ লাখ বছরের পুরোনো এই মাথার খুলিটির মস্তিষ্কের গর্তটা ছোট, দাঁতগুলো বড়, মুখমন্ডল লম্বা। - যা হোমো হ্যাবিলিস এবং হোমো ইরেকটাস উভয়ের মধ্যেই পাওয়া যায়।

জর্জিয়ার জাতয়ি জাদুঘরের ডেভিড লর্ডকিপানিৎজ ওই বিজ্ঞানীদের দলের একজন। তিনি বলছেন, "প্রথম দিককার হোমো প্রজাতির যেসব ফসিল আমরা পেয়েছি তার মধ্যে এটি সবচেয়ে সম্পূর্ণ। এত ভালো নমুনা আগে আমরা কখনো পাইনি। এই মাথার খুলিটাতে এমন সব অংশ রয়েছে যা আমরা আগে পাইনি। এটা হচ্ছে সেই সময়কার কথা যখন মানবজাতির পূর্বপুরুষরা আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। ডমানিসিতে যা পাওয়া গেছে , তা হলো এর সবচাইতে বড় সংগ্রহ। এখানে যা পেয়েছি, তার মধ্যে চেহারার পার্থক্য থাকা সত্বেও এমন সব মিল আছে – যাতে মনে হয় এগুলো একটাই জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন লোকের ফসিল।"

জর্জিয়ায় পাওয়া হোমিনিডের দাঁত

ডমানিসির এই সংগ্রহকে বলা হচ্ছে আফ্রিকার বাইরে পাওয়া প্রাচীন মানব ফসিলের এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত নমুনা। এগুলো পাওয়া গেছে আট বছর আগে, আর তার পর থেকে চলেছে পরীক্ষা নিরীক্ষা। বিজ্ঞানীরা এই ফসিলগুলোকে আফ্রিকা থেকে পাওয়া হোমিনিড ফসিলের সাথে তুলনা করে দেখেছেন।

লর্ডকিপানিৎজকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যারা মনে করেন যে তিনটি পৃথক মূল প্রজাতি থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক মানুষের সৃষ্টি – তাদের উদ্দেশ্যে তিনি কি বলতে চান।

তিনি বলছেন, "এমন হতে পারে যে আসলে মূল প্রজাতি একটিই, তিনটি নয়। এখানে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হলো যে আমরা একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠীর ফসিল পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছি। এটা বিজ্ঞানের জন্য একটি নতুন পর্যায়। আমরা টুকরো টুকরো বা বিচ্ছিন্ন নমুনা নয়, বরং একটি প্রাচীন মানুষের একটি পুরো দলকে জরিপ করতে পারছি। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে এটা একটা সূচনা মাত্র, কারণ আমাদের আরো ৫০ হাজার বর্গ মিটার খনন কাজ চালাতে হবে।"

সব বিজ্ঞানীই অবশ্য এই তত্বের সাথে একমত নন। তারা বলছেন, এই বিজ্ঞানী দলটি যে বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, তা এমন সিদ্ধান্তে পৌছার জন্য যথেষ্ট নয়।

চেহারায় পার্থক্যের কারণ জিনের কিছু উপাদান

dna, genes

একেকজন মানুষের চেহারা যে আলাদা হয় – তার পেছনে জিনের কোন উপাদানগুলো কাজ করে তার সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, এটা কাজে লাগতে পারে মুখমন্ডলের বিকৃতি নিরাময়ের জন্য।

পিতামাতার সাথে সন্তানের চেহারার মিল থাকে, চেহারায় মিল থাকে একই পরিবারের আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেও। একই জাতিগোষ্ঠীর লোকদের মধ্যেও সাদৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু তার পরও আমরা সবাই বুঝি যে যত মিলই থাকুক কোন দুটি মানুষ কখনোই সম্পূর্ণ এক রকম দেখতে হয় না, কিছু না কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকেই ।

কি ভাবে তৈরি হয় এই পার্থক্যগুলো? নতুন এক জেনেটিক গবেষণা থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে ডিএনএ’র মধ্যে এমন হাজার হাজার ক্ষুদ্র অংশ আছে – যা নির্ধারণ করে কিভাবে একটি মানুষের মুখ আরেক মানুষের মুখ থেকে আলাদা দেখতে হয়।

সায়েন্স জার্নাল-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মানবদেহের জিনে এমন কিছু উপাদান থাকে যা নির্ধারণ করে যে মানুষের মুখ সময় এবং বয়েসের সাথে সাথে কিভাবে, কতটা পরিবর্তিত হবে ।

dna genes

যে গবেষকরা এটা আবিষ্কার করেছেন তাদের একজন হলেন ড: এক্সেল ভিজেল। তিনি বিবিসির কাছে ব্যাখ্যা করছিলেন, এই উপাদানগুলো কি ভাবে কাজ করে।

"মানুষের ডিএনএতে জিন ছাড়াও, আরো বহু রকমের বাড়তি জেনেটিক উপাদান থাকে। আমরা জিন বলতে যা বুঝি - বা বইপত্রে দেখি, এই উপাদানগুলো কিন্তু ঠিক তা নয়। এগুলো হচ্ছে ছোট ছোট সুইচের মতো, যা আমাদের ডি এন এ-র ভেতরে কোথাও বসে থাকে । যখন জরায়ুর ভেতরে মানবদেহের ভ্রূণ বাড়তে খাকে, তার মুখাবয়ব তৈরি হতে থাকে – তখন এই উপাদানগুলো জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেটা করে অত্যন্ত নির্ভুল ও নিখুঁতভাবে।"

ড: ভিসেল বলছিলেন, মানবদেহের মুখাবয়বে যেসব জন্মগত ত্রুটি দেখা যায় – তা কি কারণে হয়, সেটা হয়তো এই সব জেনেটিক সুইচগুলো আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে জানা সম্ভব হবে।

"আমাদেরকে এই কাজে যে বিষয়টা উদ্বুদ্ধ করেছে, তা হলো – মানুষের মুখাবয়বের গঠনে যেসব ত্রুটি দেখা যায় - এই সুইচগুলোর কোনো কোনোটা হয়ত এর পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে। আমরা যখন মুখাবয়বের গঠনের সমস্যায় আক্রান্ত কোন রোগীকে দেখি, আমরা এর কারণ হিসেবে বুঝি যে তার জিনের কোনো বৃদ্ধি বা মিউটেশনের সমস্যা হয়েছে। তবে এখন আমরা সন্দেহ করছি যে, এমন অনেক রোগীও থাকতে পারেন - যাদের এই সমস্যার মূলে রয়েছে ওই যেসব সুইচের কথা বলছিলাম – তারই কোনো মিউটেশনের সমস্যা ।"

জলবায়ুর পরিবর্তন বিশ্লেষণ করার জন্য শক্তিশালী কম্পিউটার মডেল

climate chart

ভুমিকম্প বা সুনামির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই তার পূর্বাভাস দেয়া এখনো বিজ্ঞানীদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে টাইফুন বা হারিকেনের মতো সামুদ্রিক ঝড় বা জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে আগাম সতর্কবার্তা দেবার প্রযুক্তি ক্রমাগতই আরো পরিশীলিত হচ্ছে।

জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এমন কিছু উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার মডেল তৈরি করেছেন যা দিয়ে এসব দুর্যোগকে আরো নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের আরগন ল্যাবরেটরিজের কম্পিউটেশনাল জলবায়ু বিজ্ঞানী রবার্ট জ্যাকব ব্যাখ্যা করছিলেন, কিভাবে তিনি আমাদের পৃথিবী পুরো বায়ুমন্ডলটারই একটি কম্পিউটার মডেল তৈরি করেছেন। এখানে বিশাল বিশাল কম্পিউটার স্ক্রিনের ওপর পুরো বায়ুমন্ডলেই একটা মডেল আকারে দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলছেন, "এর আগে যেসব মডেল ছিল তাতে এক একটা বিন্দু ছিল ১০০ মাইল বা তার বেশি দূরে দূরে। কিন্তু এই মডেলটাতে দুটি বিন্দুর দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার। তার মানে আবহওয়ামন্ডল থেকে পাওয়া তথ্যগুলো সংশ্লেষণ করে আমরা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারছি আবহ্ওয়ার গতিপ্রকৃতি।"

"তা ছাড়া, বাতাসে গ্রীনহাউজ গ্যাস বা কার্বন নির্গমন বেড়ে গেলে প্রকৃতিতে কি প্রভাব পড়বে - তাও অনুমান করা সম্ভব। আমরা যেটা করতে পারছি, এই মডেলে কার্বনের মাত্রাটা বাড়িয়ে দিয়ে দেখতে পারছি যে এর পরিণতিতে টাইফুনের সম্ভাব্য তীব্রতা কতটা বৃদ্ধি পায়। আমরা এই মডেলে কৃত্রিমভাবে সামুদ্রিক ঝড়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারছি, আগে যেসব দুযোর্গ ঘটেছে তার উপাত্তগুলো এতে প্রয়োগ করে পরীক্ষা করতে পারছি যে ভবিষ্যতে বাস্তব জগতে যদি এরকম দুযোগ হয়- তাহলে তা কি চেহারা নিতে পারে, এবং কেন।"

সহজ কথায়, এই বিজ্ঞানীরা যেটা তৈরি করেছেন তাকে বলা চলে জলবায়ুর একটা মডেল যাতে আবহাওয়াগত পরিবর্তনগুলো নিয়ে গবেষণাগারেই পরীক্ষা নিরীক্ষা করা যাবে।

এ সপ্তাহের বিজ্ঞানের আসর পরিবেশন করেছেন পুলক গুপ্ত।