বিজ্ঞানের আসর

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩ শেষবার আপডেট করা হয়েছে ১৭:১৯ বাংলাদেশ সময় ১১:১৯ GMT

voyager

সৌরজগতের সীমা পার হয়ে গেছে মহাকাশযান ভয়েজার। উৎক্ষেপণের ৩৬ বছর পর তা এখন সূর্যের সবগুলো গ্রহ পার হয়ে পৌছে গেছে মহাকাশের এক অজানা অন্ধকার জগতে।

আজ থেকে ৩৬ বছর আগে, ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণ হয়েছিল মহাকাশযান ভয়েজারের। প্রথম পরিকল্পনা ছিল, ভয়েজার সৌরজগতের বাইরের দিকের গ্রহগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেখানেই তা থেমে থাকে নি - চলতেই থেকেছে সামনের দিকে। চলতে চলতে এখন ভয়েজার পৌছে গেছে পৃথিবী থেকে ১২শ কোটি মাইল দূরে, সূর্যের চারদিকে ঘুরতে থাকা গ্রহের সবগুলো ছাড়িয়ে।

এতই দূর যে ভয়েজার থেকে পাঠানো রেডিও সিগন্যালের পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময় লাগে ১৭ ঘন্টা। এই প্রথম মানুষের তৈরি কোন বস্তু সৌরজগৎ পেরুতে পারলো।

সৌরজগতের বাইরের এই জগৎ হচ্ছে একটি তারা থেকে আরেকটি তারার মাঝথানের জগৎ - যাকে বলে ইন্টারস্টেলার স্পেস - ঠান্ডা, অন্ধকার এবং মানব অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বাইরের এক জগৎ।

ভয়েজার প্রজেক্টের একজন বিজ্ঞানী এড স্টোন বলছিলেন, এ এক ঐতিহাসিক ঘটনা, প্রথম পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা বা চাঁদে মানুষের পদার্পণের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ।

voyager

"৪০ বছর আগে যখন ভয়েজারের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন এটাই আমাদের আশা ছিল যে একদিন এই ইন্টারস্টেলার স্পেসে সেখানে আমরা পৌঁছাবো। কিন্তু আমরা কেউ জানতাম না - সূর্যের চারদিকে থাকা যে গ্যাসের বুদবুদের মধ্যে আমাদের সৌরজগৎ - তা কত বড়, এবং এই ভয়েজার মহাকাশযান তা অতিক্রম করার মতো দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারবে কিনা। যখন আমরা উপাত্ত পরীক্ষা করে প্রথম এটা বুঝতে পারলাম, তখন একটা আশ্চর্য অনুভুতি হয়েছিল – ৪০ বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া একটি মহাকাশযান সত্যি সেখানে পৌঁছেছে।"

আসলে ভয়েজার সৌরজগৎ পার হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন আগেই। বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ভয়েজারের সেন্সরগুলো থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছিল যে তার চারপাশের পরিবেশ বদলে গেছে। ভয়েজারের ভেতর বসানো একটি যন্ত্র থেকে আশপাশের চার্জসমৃদ্ধ বস্তুকণার ঘনত্ব মাপা যায়। গত বছরের নভেম্বর নাগাদ পাওয়া উপাত্ত থেকে দেখা গেল ভয়েজারের বাইরে প্রতি কিউবিক মিটারে প্রোটনের সংখ্যা হঠাৎ করে ১০০ গুণ বেড়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা আগেই হিসেব করেছিলেন যে সূর্যের প্রভাব-বলয়ের বাইরে গেলেই এরকম কিছু একটা ঘটবে।

তথন শুরু হলো হিসেব-নিকেশ এবং কয়েকদফা হিসেব করে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে ২০১২ সালের ২৫শে আগস্টের দিকে ভয়েজার সৌরজগতের শেষ সীমা পার হয়েছে।

ভয়েজার প্রকল্পেরই আরেক বিজ্ঞানী গ্যারী স্টার্ক বলছেন, "এখন মহাকাশযানটি যেখানে আছে তা তারাদের মাঝখানে যে মহাজাগতিক শূন্যতা – সম্পূর্ণই অজানা এক জগৎ। এ এক অসাধারণ অর্জন, আমাদের সত্যি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে মানুষের মহাকাশ অভিযান শুরু হবার মাত্র ৫৫ বছরের মধ্যেই আমরা সৌরজগতের সীমারেখা পার হতে পেরেছি। সূর্য থেকে সৃষ্টি হওয়া পদার্থ দিয়ে তৈরি যে জগৎ – ভয়েজার এখন তার বাইরে। তার চারদিকে এখন যে সব বস্তুকণা – তা সূর্য থেকে সৃষ্ট নয়। এগুলো তৈরি হয়েছে আশপাশের অন্য তারা থেকে, সুপারনোভা অর্থাৎ বিস্ফোরিত তারার অবশিষ্টাংশ থেকে, বা অন্যান্য উৎস থেকে। সুতরাং আক্ষরিক অর্থেই ভয়েজার এখন একেবারেই অচেনা পরিবেশের মধ্যে পা রেখেছে।"

ভয়েজার এখন সৌরজগতের ওপার থেকে পৃথিবীতে পাঠাতে থাকবে ছবি আর বার্তা। তা অব্যাহত থাকবে যতদিন তার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা কাজ করে। তবে প্রায় দশ বছর পর তাও শেষ হয়ে যাবে।

golden record
ভয়েজারের 'গোল্ডেন রেকর্ড'

কিন্তু ভয়েজার তখনও সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে, কিন্তু পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ আর হয়তো থাকবে না।

ভয়েজার বহন করছে এই পৃথিবীর মানুষ ও প্রকৃতির শব্দ, কথা, আর সঙ্গীত

এই ভয়েজারের মধ্যে রাখা আছে একটি সোনালী রেকর্ড, যাতে ধরা আছে মানব সভ্যতার নানা নিদর্শন আর প্রাণীজগতের নানা রকম শব্দ। যেমন মানুষের ছবি, কথা, পৃথিবীর নানা দেশের গান, যন্ত্রসঙ্গীত, যানবাহনের শব্দ, নানা রকম প্রাণীর ডাক, নানা রকম সাংকেতিক বার্তা ইত্যাদি। নানা রকম ভাষার নমুনা এতে আছে। আছে বাংলা ভাষাও।

উদ্দেশ্য হলো, সৌরজগতের বাইরে অন্য কোন কোথাও যদি প্রাণের অস্তিত্ব, বা বুদ্ধিমান প্রাণীর সভ্যতা থেকে থাকে, তারা যেন এটা থেকে এই পৃথিবীর মানুষ এবং পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।

যারা এই রেকর্ডটি তৈরি করেছিলেন তাদের একজন হলেন আমেরিকান বিজ্ঞান লেখক টিমোথি ফেরিস।

তিনি বলছেন, "আমরা প্রায় ১০/১২ জন লোক এই প্রকল্পে জড়িত ছিলাম, সায়েন্স ফিকশন লেখক কার্ল সাগানসহ । আমাদের পরিকল্পনা ছিল যে নানা রকম শব্দ দিয়ে পৃথিবীর একটি চিত্র তুলে ধরা। ধরুন, আমরা যদি অন্য কোন গ্রহ থেকে, অন্য কোন সভ্যতা থেকে একটা রেডিও সিগন্যাল পাই, – তা হলে আমরাও তো সেই অচেনা গ্রহ এবং তার অধিবাসীদের জীবন থেকে নানা শব্দ শুনতে চাইবো। তাই না? ঠিক এটাই আমরা করতে চেয়েছি। কথা ছিল যে এটাতে পৃথিবীর নানা দেশের সঙ্গীত থাকবে, যেন তা পৃধিবীর সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে । রেকর্ডটা এমনভাবে ভয়েজারের ভেতরে একটি বাক্সে রাখা আছে - যাতে কসমিক রশ্মিতে এর কোন ক্ষতি না হতে পারে।"

ব্রিটিশ বিজ্ঞান লেখক ক্রিস রাইলি বলছেন, এর তাৎপর্য শুধু সৌরজগত অতিক্রম করার মধ্যেই সীমিত নয়।

voyager

ক্রিস রাইলি বলছেন, "আমরা যে শুধু সূর্যের প্রভাব-বলয় পার হয়েছি তাই নয়। এটা তার চাইতেও বড় ব্যাপার। বহুকাল ধরেই আমরা আমাদের গ্যালাক্সিতে অন্য কোন বুদ্ধিমান প্রাণী বা সভ্যতা আছে কিনা তা জানার চেষ্টা করছি, কিন্তু নিশ্চিত কিছুই আমরা জানতে পারি নি। তেমন কেউ থেকে থাকলে হয়তো কোনদিন তারা ‌এই রেকর্ডটা শুনতে সক্ষম হবে। এটা এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে তা অন্তত ১০০ কোটি বছর টিকে থাকতে পারে। এমনও হতে পারে যে এটা হয়তো মানবসভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেলে বা এমনকি পৃথিবী কোন কারণে ধ্বংস হয়ে যাবার পরও টিকে থাকবে। তখন হয়তো এই রেকর্ডটাই একমাত্র প্রমাণ হয়ে থাকবে যে মানুষ বলে কোন কিছুর একদিন অস্তিত্ব ছিল।"

জীবন্ত প্রাণীর দেহে স্টেমসেল সৃষ্টি

এতদিন স্টেমসেল বা কৃত্রিম দেহকোষ তৈরি হতো গবেষণাগারে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন জীবন্ত প্রাণীদেহের ভেতরেই স্টেমসেল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

এই দেহকোষ অনেকটা প্রাথমিক স্তরের মানব ভ্রূণ যে ধরণের কোষ দিয়ে তৈরি – প্রায় তেমনি। এগুলো প্রাণীদেহের অন্য যে কোন কোষের মধ্যে টিকে থাকতে এবং বাড়তে পারে। কাজেই একে নানা ভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। কারো হৃদযন্ত্রের সমস্যা হলে ডাক্তাররা হয়তো এউ প্রযুক্তি ব্যবহার করে হৃদপিন্ডের জন্য নতুন কোষ তৈরি করতে পারবেন। হয়তো বা গজানো সম্ভব হবে নতুন প্রত্যঙ্গও।

এর জেনেটিক রহস্য আবিষ্কার করেছেন গতবছর নোবেল পুরস্কার পাওয়া প্রফেসর শিনিয়া ইয়ামানাকা। তারই সূত্র ধরে বিজ্ঞানীরা জীবন্ত ইঁদুরের দেহের ভেতরেই স্টেমসেল তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন বিজ্ঞানী।

stemcell

এদের একজন মাদ্রিদের ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্রের প্রফেসর ম্যানুয়েল সেরানো।

তিনি বলছেন, "আমরা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ইদুরের দেহে এমন জিন স্থাপন করেছি - যার চারটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং বিকাশের কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেয়া যায়। এটাই প্রফেসর ইয়ামানাকা আবিষ্কার করেছেন, আর আমরা একে এমনভাবে কাজে লাগিয়েছি যাতে একটা এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করে তা 'অন' বা 'অফ' করা যায় । দেখা গেলো, জীবন্ত ইঁদুরের দেহেও তা একইভাবে কাজ করছে এবং টেরাটোমা বা এক বিশেষ ধরণের টিউমার উৎপন্ন হচ্ছে, যা অনেকটা মানব ভ্রুণের টিস্যুর মতো। এটা থেকে দেহকোষ তৈরি হয়। এখন আমরা একে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই যাতে তা ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু নতুন করে তৈরি করে দিতে পারে। তার ফলে ভবিষ্যতে এটা চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত করা যেতে পারে।"

এইডসের টিকা আবিষ্কারে অগ্রগতি

এইডসের চিকিৎসার পথে আরো এক ধাপ অগ্রগতি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এমন একটি টিকা আবিষ্কার করেছেন – যা বানরের দেহে এইচআইভির সমতুল্য ভাইরাস নির্মূল করতে সক্ষম।

hiv virus

বিজ্ঞানীরা বহুকাল ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন এইচআইভি-এইডসের টিকা আবিষ্কারের জন্য। সম্প্রতি আমেরিকান বিজ্ঞানীরা এমন এক টিকা তৈরি করেছেন যা বানরের দেহে এইচআইভির সমতুল্য যে সংক্রমণ হয়ে থাকে তার বিরুদ্ধে কার্যকরী হয়েছে। বানরের এই ভাইরাসকে বলে এসআইভি এবং এটা এইচআইভির চাইতেও ১০০ গুণ শক্তিশালী, সাধারণত দুবছরের মধ্যেই আক্রান্ত বানর মারা যায়।

কিন্তু আক্রান্ত বানরকে এই নতুন আবিষ্কৃত টিকা দেয়ার পর দেখা গেছে যে অন্তত অর্ধেক ক্ষেত্রেই সেই টিকা এসআইভি ভাইরাসকে সমুলে ধ্বংস করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওরিগনের হেলথ এন্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লুইস পিকার এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তিনি বলছেন, "সম্পূর্ণ সাফল্য দাবি করা কঠিন, এমন হতে পারে যে কিছু দেহকোষে ওই ভাইরাস রয়ে গিয়ে থাকতে পারে , তা আমাদের চোখে পড়েনি। কিন্তু আমরা অত্যন্ত কড়া মান রক্ষা করে পরীক্ষা চালিয়েছি। আধুনিক প্রযুক্তিতে যত পরীক্ষা করানো যায় সবই করিয়েছি। কিন্তু ওই বানরগুলোর দেহে কোন এসআইভি ভাইরানের অস্তিত্ব ছিল না।"

এখন বিজ্ঞানীরা এই টিকারই এমন একটি সংস্করণ তৈরি করেছেন যা এইচআইভি ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা যাবে। এখন নানা রকম পরীক্ষা করা হচ্ছে – এটা কতটা নিরাপদ তা জানার জন্য।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন আগামী দু'বছরের মধ্যেই মানবদেহে এই টিকা পরীক্ষা করা সম্ভব হবে। হতেই পারে যে আমরা এইচআইভি প্রতিরোধী একটি কার্যকর টিকার খুব কাছাকাছি চলে এসেছি।

এ সপ্তাহের বিজ্ঞানের আসর পরিবেশন করেছেন পুলক গুপ্ত।