|
বিলেতের ছাত্রজীবন
|
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
প্রথম পর্ব
বাংলাদেশ থেকে লেখাপড়ার জন্য কারা আসছেন ব্রিটেনে, হঠাৎই বা কেন গত কয়েক বছরে এদেশে ব্রিটেনে ছাত্র আসার পরিমান এতোটা বেড়ে গিয়েছে আর বিলেতে আসার পেছনে সেইসব ছাত্রদের প্রাথমিক ভাবনাগুলো কি, এগুলোর দিকেই প্রথম পর্বে নজর দেয়া হয়৻ সম্প্রতি যেসব শিক্ষার্থীরা ব্রিটেনে আসছেন, তাদের এদেশে আসার পেছনে তারনাগুলো কি? যেসব ছাত্রের সাথে কথা বলা হয়, তারা নানা আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে এসেছেন৻ তবে অধিকাংশেরই ব্রিটেনে লেখাপড়া করতে আসার পেছনে মূল কারণটা সেই চিরায়ত: একটি উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চ শিক্ষা অর্জন করা৻ কেউ আসছেন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় শেষ করে সরাসরি স্নাতক পর্যায়ের লেখা পড়া করতে৻ নাসরিন আক্তার মাত্র কয়েক মাস হলো এসেছেন, স্নাতক পর্যায়ের লেখাপড়ার জন্য৻ মিস আখতার বলছিলেন যে স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তার ব্রিটেনে লেখাপড়া করতে আসার ইচ্ছে ছিল৻ তিনি আরও বলছিলেন যে তার পরিবারের অনেকেই বিদেশে লেখাপড়া করেছেন, তাই তারও উচ্চ শিক্ষার জন্য ব্রিটেনে আসার ইচ্ছে ছিল৻ অনেক ছাত্রেরই, অতীতের মতো ব্রিটেনে আইন বিষয়ে পড়ার আগ্রহটাই সবচাইতে বেশী৻ আর সেই সাথে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ডাক্তারিসহ সম্প্রতি হিসাবরক্ষার বিশেষ কিছু সার্টিফিকেট কোর্সেও ছাত্রদের প্রচুর আগ্রহ৻
বেশ কিছু ছাত্রের সাথে কথা হলো যারা ব্যবসায় প্রশাসনের নানা বিষয়েও এদেশে পড়ছেন৻ ঝুমা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম মেডিকাল কলেজ থেকে ডাক্তারির প্রাথমিক ডিগ্রি এম, বি,বি,এস শেষ করে এসেছেন৻ তিনি বলছিলেন যে বাংলাদেশের একটি বেসরকারী মেডিকাল কলেজে কাজ করার সময়, ঐ প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরশীপে তিনি প্রথম ব্রিটেনে আসেন ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের লেখাপড়া করতে৻ সেই ডিগ্রি অর্জন শেষ হলেও, ঝুমা বলছিলেন, ডাক্তারি পেশায় আরও উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের ইচ্ছে তার বরাবরই ছিল৻ তাই বর্তমানে তিনি ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বা এন,এইচ,এসের মেধাবৃত্তির সুবাদে আবারও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের লেখাপড়া শুরু করেছেন৻ ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটেনে বাংলাদেশীদের ছাত্র হিসেবে আসার গল্পের শুরুটা অনেক পুরনো৻ আজকাল সংখ্যার অনুপাতে বিলেতে লেখাপড়ার জন্য আসা ছাত্রের সংখ্যা বাড়লেও এ ধারা প্রায় দেড়শ বছরের৻
ঊনিশ শতকের মাঝভাগের কিছু পর থেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য এলাকার মানুষদের মত, বাঙ্গালীরাও সাম্রাজ্যের কেন্দ্র – অর্থাৎ বিলেতে শিক্ষার জন্য যাওয়া শুরু করেছিল৻ একদিকে বিশ্ব ক্ষমতা এবং সংস্কৃতির প্রধান মিলনস্থল হিসেবে, ঊচ্চ শিক্ষার জন্য বিলেতে যাওয়াটা সম্ভ্রান্ত পরিবার , বিশেষ করে জমিদার পরিবারের সন্তানদের জন্য যেমন বেশ চলনসই হয়ে ওঠে, অন্যদিকে সমগ্র বিশ্বের মেধাবীদের পীঠস্থানও হয়ে উঠেছিল সেসময়ের বিলেতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো৻ তবে এধরনের ছাত্রদের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা৻ যেমন মহাকবি মাইকেল মধুসূধন দত্ত বিলেতে এসেছিলেন সেসময় উচ্চ শিক্ষার জন্য৻ তবে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে, সরকারী এবং বেসরকারী নানা মেধাভিত্তিক বৃত্তির সুবাদে সম্ভ্রান্ত পরিবারের পাশাপাশি, বিলেতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশ ভূখন্ডের বিভিন্ন শ্রেণীর মেধাবী ছাত্ররাও যেতে শুরু করে৻ প্রধানত আইন শিক্ষার জন্য ঐতিহাসিকভাবে বাঙ্গালী ছাত্ররা ব্রিটেনে আসে, আর বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে ডাক্তারি, বিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ে শিক্ষার জন্য ছাত্ররা আসতে শুরু করে৻ উনিশশো ষাটের দশকের শেষ দিকে বিলেতে লেখাপড়ার জন্য এসেছিলেন হাবিব রহমান৻ বর্তমানে অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠন - জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটি ফর ইমিগ্র্যান্টস বা জে,ডাব্লু,সি,আই-এর প্রধান নির্বাহী মি: রহমান তার সেই ছাত্রজীবনের কথা স্মরন করে বলছিলেন যে সেসময় নানা ধরনের বৃত্তির সুবিধা ছিল, আর ছাত্ররা কিছু কাজ খুজে পেতোই৻ তবে তিনি বলছিলেন যে ব্রিটেনে আসার আগ পর্যন্ত তার কোন ধারনা ছিল না, কেমন হবে না এখানকার ছাত্রজীবন৻
সময় পাল্টেছে৻ গত কয়েক দশকে ব্রিটেনের তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শিক্ষার জন্য যাবার প্রবণতা বেড়েছে৻ ব্রিটেনে তবুও আসছেন প্রচুর ছাত্র৻ ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় – অর্থাৎ হোম অফিস এদেশে আসা বিদেশী শিক্ষার্থীদের মাঝে বাংলাদেশীদের আলাদা করে কোন তথ্য রাখে না৻ ব্রিটেনে বাংলাদেশ থেকে ছাত্র হিসেবে এক বছরে ভিসা নিয়ে এসেছেন, এমন ছাত্রের সংখ্যা – ২০০৬-২০০৭ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী তিন হাজারের ওপর৻ ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে দেশটিতে ছাত্র হিসেবে যাবার ব্যাপারেও নানা বাধ্যবাধকতা বেড়ে যাওয়ায়, গত কয়েক বছরে ব্রিটেনে ছাত্রদের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়৻ যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে এদেশে কতোজন বাংলাদেশী ছাত্র রয়েছেন তার কোন আনুষ্ঠানিক সংখ্যা তাদের কাছে নেই৻ বিভিন্ন সময়ে ছাত্র হিসেবে এখানে এসে এখনও লেখাপড়ার সাথে জড়িত থাকা ব্যক্তির সংখ্যা আনুমানিক কুড়ি হাজার বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ কর্মকর্তা৻ ব্রিটেনের বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের সংগঠনের খোঁজ করলে জানা যায় যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারনত সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনার উদ্দেশ্যে নিজ নিজ সংগঠন থাকলেও, পুরো ব্রিটেনের ছাত্রদের নিয়ে ২০০৮ সালে গঠন হয় বাংলাদেশ স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন৻
সংগঠনটির সাধারন সম্পাদক মেহেদি হাসান টিটো বলছিলেন যে তাদের মূল উদ্দেশ্য ব্রিটেনে যেসব বাংলাদেশী ছাত্র রয়েছে তাদের জন্য একটি মিলনস্থল তৈরী করা৻ তিনি বলছিলেন যে বাংলাদেশ থেকে আসা অধিকাংশ ছাত্রের প্রধান সমস্যা হয়ে দাড়ায় পার্ট টাইম কাজ খুঁজে পাওয়া এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করা৻ মি: হাসান বলছিলেন যে যারা ব্রিটেনে এসেছেন এবং আসতে আগ্রহী, উভয় ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্যের অভাব রয়েছে৻ আর এ কারণেই তাদের সংগঠনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তারা যথাসম্ভব তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি, একটি ভার্চুয়াল কমিউনিটি গঠনের চেষ্টা চলাচ্ছেন৻ বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে আসা ছাত্রের সংখ্যা যতোই বেড়েছে, তেমনই পাল্টেছে তাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট৻ এককালে কেবল সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে ছাত্ররা এসে থাকলেও সামপ্রতিক সময়ে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে অর্থনৈতিকভাবে তেমন একটা সচ্ছল নয় এমন পরিবারের সন্তানরাও আসছেন ব্রিটেনে লেখাপড়া করতে৻ বিলেতে প্রতিবছর আসতে থাকা ছাত্রদের আর্থ-সামাজিক পরিচয়ে যেমন বৈচিত্র এসেছে, তেমনি তাদের অনেকেরই আসার সাথে কেবল শিক্ষাঅর্জনই মূল কারণ নয়৻ একটি উন্নত দেশে বসবাস, ছাত্র থেকেও উপার্জনের নানা সুযোগের সাথে সাথে প্রায় প্রত্যেক ছাত্রই অকপটেই স্বীকার করলেন যে, বিলেতে অভিবাসনের সম্ভাবনা তাদের আসার একটি মূল তাড়না৻
ব্রিটেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহড় বার্মিংহামের অ্যাস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য স্নাতক পর্যায়ের লেখাপড়া শেষ করেছেন সাদি মোহাম্মদ ওয়াউদ্দিন৻ তিনি অবশ্য পুরো বিষয়টিকে খানিকটা অন্যভাবে দেখেন৻ মি: ওয়াসিউদ্দিন বলছিলেন যে অভিবাসনের সম্ভাবনাকে তিনি সোনার হরিণের সাথে তুলনা করেন৻ কারণ প্রায় সব ছাত্রই অভিবাসন পেতে চায়, কিন্তু এর জন্য তারা যে কষ্ট করেন এবং জীবনের যতোটা সময় দিয়ে দেন, তাতে সোনার হরিনের সাথে একই খাঁচায় বন্দী হয়ে থাকার মত অবস্থায় পরে যান তারা৻ অনেক ছাত্রের কাছে বিলেতে লেখাপড়া কতে আসার সাথে অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধা, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রায় রোজগারের সুযোগটাও বড় একটা কারণ৻ দ্বিতীয় পর্বের বিশেষ নজর তাই সে দিকেই থাকবে৻ |
|||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
|
|||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||