|
প্রধান ইস্যু: বিদ্যুৎ না বাঁধ?
|
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
প্যানেল সদস্যরা (বাঁ থেকে): আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, বিচারপতি আবদুর রউফ, উপস্থাপক মিথিলা ফারজানা, ফিরদৌসি আজিম এবং ড. আব্দুল মঈন
খান।
কথা : কাজল আব্দুল্লাহ্ , ছবি: রাসেল মাহমুদ বাংলাদেশ সংলাপের এবারের আয়োজন ছিলো ঢাকায় গত ২০শে জুন, ২০০৯ তারিখে। মিথিলা ফারজানার সঞ্চালনায় এবারের বাংলাদেশ সংলাপের প্যানেল সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ফিরদৌসি আজিম।
আমন্ত্রিত দর্শকরা মিলনায়তনে প্রবেশের সময় যে লিখিত প্রশ্নগুলো জমা দেন প্রতিবারের মতো তা থেকেই বাছাই করে নেয়া হয় এবারের বাংলাদেশ সংলাপের প্রশ্ন সমূহ। প্যানেল সদস্যরা উত্থাপিত প্রশ্নের উপর তাৎক্ষনিকভাবে তাদের বক্তব্য, মতামত অথবা মন্তব্য প্রদান করেন, সেই সাথে উপস্থিত অন্য দর্শকরাও সেইসব প্রশ্নের উপর বিভিন্ন মতামত প্রদানের এবং সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ পান। অনুষ্ঠানের প্রথম প্রশ্ন করেন রিপন তালুকদার। তিনি জানতে চান কাদের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করার দাবি উঠেছে।
প্রথমেই এ প্রশ্নের জবাব দেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করার দাবিটা তাদের দল আওয়ামী লীগের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে তুললেও দলগতভাবে তোলা হয়নি। দাবিটি বিএনপির পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে এমন মন্তব্যও করেন তিনি। তবে আব্দুল মঈন খান বলেন, বিএনপি এখনও দলীয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করার দাবি জানায়নি। তিনি জানান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আওয়ামী লীগ এনেছিল আবার বাতিলের দাবিটা বিচ্ছিন্নভাবে তারাই (আওয়ামী লীগ) করছেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করে বলেন যে এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র বাংলাদেশে চালু আছে। তিনি মনে করেন আওয়ামী লীগ নিজেদের সুবিধার জন্য এটি যেমন চালু করেছিল আবার তেমনি অধিক সুবিধার জন্য এটি বাতিল করতে চাইছে। দর্শকদের মধ্যে একজন এসময় বলেন যে তিনি মনে করেন সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। তিনি আরও মনে করেন বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই। আরেকজন দর্শক সরকারদল ও বিরোধীদলের মধ্যকার বিবাদমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। তার মতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করা বা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দলমত নির্বিশেষে গ্রহন করা উচিত। একজন দর্শক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে মত দেন। আবদুর রউফ এ প্রসংগে মতামত দিতে গিয়ে বলেন, গণতন্ত্র বিকাশের মূল মন্ত্র হচ্ছে বিশ্বাস। তাঁর মতে বিশ্বাসের অনুপস্থিতির কারণেই অন্তবর্তীকালীন সরকারের উদ্ভব হয়েছে।
তিনি মনে করেন গণতন্ত্রে বিশ্বাসটা ফিরিয়ে আনতে পারলে কোনকিছুরই প্রয়োজন নেই। গণতন্ত্রের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করা উচিত বলেও তিনি মনে করেন। ফিরদৌসি আজিম এ প্রসংগে বলেন সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা নির্বাচন কমিশনের কাজ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নয়। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। পরবর্তী প্রশ্নকর্তা ছিলেন মামুন তালুকদার। তিনি জানতে চান বিএনপির সময়ে জেনারেল মইন উ আহমেদকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেয়া হলেও বিএনপিই এখন কেন তাঁর বিচার চাইছে? প্রথমেই এ প্রশ্নের জবাবে বলেন আব্দুল মঈন খান৻ তিনি বলেন কে বিচার চাইছে তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কার বিচার চাওয়া হচ্ছে এবং কেন চাওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কেউ সংবিধান লঙ্ঘন করে থাকলে তার বিচার হওয়া বাঞ্ছনীয়। মি. সিদ্দিকী বলেন, তিনিই প্রথম বলেছিলেন জেনারেল মইন সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। জেনারেল মইনের পাশাপাশি সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদেরও বিচার দাবি করেন তিনি। এসময় একজন দর্শক জানতে চান জেনারেল মইন উ আহমেদের হস্তক্ষেপে এদেশের শীর্ষ দুর্নীতিবাজরা ধরা পড়েছে, শুদ্ধ ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মূল্যায়ন করা হবে কি কিনা। আরেকজন দর্শক মন্তব্য করেন মইন উ আহমেদকে তার ভূমিকার জন্য পুরস্কৃত করা উচিত। আরেকজন দর্শক জানতে চান ড. ইয়াজউদ্দিনের বিচার কে করবে।
এসময় একজন দর্শক জেনারেল মইনকে সীমা লঙ্ঘনকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন সরকারী চাকুরে হিসেবে সাবেক সেনাপ্রধান প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশী কথা বলেছেন। ফিরদৌসি আজিম বলেন জেনারেল মইন ১/১১ তে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনায় সেনাবাহিনীর একটা বড় ভূমিকা ছিল যার দায় তৎকালীন সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল মইন এড়াতে পারেন না। মি. রউফ এ প্রসংগে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছিল তারা এদেশে বিরাজনৈতিকরণের প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছিল যা গণতন্ত্রের অন্তরায়। তাঁর মতে বিগত দুই বছরের শাসনামলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এদেশের গণতন্ত্রের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করেছেন এবং রাজনীতির পরিবেশকে বিষাক্ত করেছেন। এরপর প্রশ্নকর্তা ছিলেন এম মোশাররফ হোসেন। তিনি জানতে চান টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে যখন সাধারণ মানুষ সোচ্চার তখন সরকারের একেক মন্ত্রী একেক রকম মন্তব্য দিয়ে জনগনকে বিভ্রান্ত করছেন কেন? প্রথমেই এ প্রশ্নের জবাব দেন মি. রউফ। তিনি বিষয়টিকে জাতীয় সমস্যা অভিহিত করে বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে এ সমস্যা সমাধানের দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত। মি. খান বলেন, বক্তব্যের শুরুতেই তিনি জানান www.petition.com নামক একটি ওয়েবপেজে ভারতীয়রাই প্রথম টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে তাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান। তাঁর মতে ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে মরুকরণ হয়েছে, টিপাইমুখ বাঁধের ফলে পূর্বাঞ্চলে মরুকরণ তরান্বিত হবে। তার মতে সরকার এই বাঁধ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।
এসময় দর্শকদের মধ্যে থেকে একজন বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করে আশু সমাধানের দাবি জানান। আরেকজন দর্শক জানান টিপাইমুখ বাঁধের ফলে সৃষ্ট মরুকরণ আমাদের ভারত নির্ভর করে ফেলবে। ফিরদৌসি আজিম টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে ভারতের মনিপুরের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার আহবান জানান। তিনি এ ব্যাপারে ভারতের বাঁধবিরোধী আন্দোলনের সংগঠক অরুন্ধতী রায় ও মেধা পাটকরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সরকারকে পরামর্শ দেন। এব্যাপারে মি. সিদ্দিকী জানান বিশেষজ্ঞ দল টিপাইমুখের ঘটনাস্থলে সরোজমিনে পরিদর্শনে যাচ্ছেন। তাদের মতামতের ভিত্তিতে সরকার বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি টিপাইমুখের বাঁধকে জাতীয় ইস্যু বলতে অপারগতা জানালে দর্শকদের মধ্যে থেকে এর প্রতিবাদ করা হয়। সেইসাথে তিনি জানান এখন পর্যন্ত এই বাঁধের কোন অস্তিত্ব নাই, এটি কেবলমাত্র পরিকল্পনা পর্যায়ে আছে। এসময় একজন দর্শক জানতে চান সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা এ বাঁধ সংক্রান্ত তথ্য জানেন কিনা। এই সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মি. রউফ বলেন, ২০০৬ সালে টিপাইমুখের বাঁধ প্রতিরোধে সুশীল সমাজের লংমার্চ এবং আরও অনেক কর্মসূচী পালিত হয়েছিল। তাই সবাই মোটামুটি এ সম্পর্কে অবহিত। তবে মি. খান মনে করেন টিপাইমুখের বাঁধের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তিনি আরও জানান আওয়ামী লীগের মধ্যে থেকেই টিপাইমুখের বাঁধ নির্মাণের পক্ষে সাফাই গাওয়া হচ্ছে।
একই কথা বলেন ফিরদৌসি আজিম। তিনি মনে করেন এখনই এ বাঁধ নির্মাণ প্রতিরোধ করার উপযুক্ত সময়। অনুষ্ঠানের সর্বশেষ প্রশ্নকর্তা ছিলেন খাইরুন্নেছা শ্রেয়সী। তিনি জানতে চান ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেয়ার ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে কিনা। ফেরদৌসি আজিম ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তার মতে সময় এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তের ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। মি. সিদ্দিকী বলেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে দৈনিক ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে জনসচেতনতা তৈরীতে সহায়ক হবে। সেই সাথে তিনি অভিযোগ করেন বিগত জোট সরকারের আমলে এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎও উৎপাদন হয়নি। দর্শকদের মধ্যে থেকে একজন জানতে চান বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় কিনা। তিনি আরও জানতে চান বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারার ব্যর্থতার দায়ভার কাদের। মি. সিদ্দিকীর অভিযোগের রেশ ধরে মি. খান জানান, বিগত জোট সরকারের সময় এক মেগাওয়াটও বিদ্যুৎ উৎপন্ন না হওয়ার তথ্যটি ভুল। এছাড়া তিনি মনে করেন ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেয়ার সাথে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কোন সম্পর্ক নেই।
সবশেষে মি. রউফ বলেন, তিনি বলেন ঘড়ির কাঁটা শুধু এক ঘণ্টা এগিয়ে দিলেই হবে না, এর পাশপাশি জনগনেরও নতুন সময়ের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে চলা উচিত। (অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয় গত ২১ই জুন, ২০০৯ বিবিসি বাংলার ‘প্রবাহ’ অধিবেশনে।) বাংলাদেশ সংলাপ প্রযোজনা করেছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ। |
স্থানীয় লিংকস্
প্রধান ইস্যু: বিদ্যুৎ না বাঁধ?24 জুন, 2009 | Lei
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ24 জুন, 2009 | Lei
রাজনৈতিক মামলার নামে অনিয়ম24 জুন, 2009 | Lei
|
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
|
|||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||