|
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ
|
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
প্যানেল সদস্যরা (বাঁ থেকে): ড. মশিউর রহমান, এম এম আকাশ, উপস্থাপক মিথিলা ফারজানা, ফাহমিদা খাতুন এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কথা : কাজল আব্দুল্লাহ্ , ছবি: রাসেল মাহমুদ বাংলাদেশ সংলাপের এবারের আয়োজন ছিলো ঢাকায় গত ১৩ই জুন, ২০০৯ তারিখে। মিথিলা ফারজানার সঞ্চালনায় এবারের বাংলাদেশ সংলাপের প্যানেল সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, বিএনপি নেতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন।
আমন্ত্রিত দর্শকরা মিলনায়তনে প্রবেশের সময় যে লিখিত প্রশ্নগুলো জমা দেন প্রতিবারের মতো তা থেকেই বাছাই করে নেয়া হয় এবারের বাংলাদেশ সংলাপের প্রশ্ন সমূহ। প্যানেল সদস্যরা উত্থাপিত প্রশ্নের উপর তাৎক্ষনিকভাবে তাদের বক্তব্য, মতামত অথবা মন্তব্য প্রদান করেন, সেই সাথে উপস্থিত অন্য দর্শকরাও সেইসব প্রশ্নের উপর বিভিন্ন মতামত প্রদানের এবং সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ পান। অনুষ্ঠানের প্রথম প্রশ্ন করেন মো শাহজাহান মিয়া। তিনি জানতে চান, চলতি অর্থ বছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রদান করে নিয়মিত করদাতাদের সঙ্গে বৈষম্য এবং দুর্নীতিতে প্রশ্রয় দেয়া দেওয়া হয়েছে কি না। বিষয়টি নিয়ে প্রথমেই বলেন মি আকাশ। তিনি মনে করেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রদানের ফলে দুর্নীতিতে সুযোগের পাশাপাশি নিয়মিত করদাতাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে।
ফাহমিদা খাতুন বিষয়টি নিয়ে বলেন, এই সুবিধার (কালো টাকা সাদা করার) ফলে যে আয়কর ফাঁকি দিচ্ছে সে আর্থিকভাবে বেশী লাভবান হচ্ছে এবং নিয়মিত এবং অনিয়মিত করদাতাদের মধ্যে অসম প্রতিযোগীতার সৃষ্টি হচ্ছে। তাঁর মতে এটা নৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি আরও জানান এবারের বাজেটে কালো টাকাকে যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এসময় একজন দর্শক কোন ব্যক্তির প্রদেয় করের পরিমাণ ও পদ্ধতি সম্বন্ধে জানতে চান। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কালো টাকা সাদা করার এই সুযোগ বলবৎ থাকার তিন বছর দুদক তার উপযোগিতা হারাবে। তিনি আরও বলেন বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন অর্জন এবং দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের যে অঙ্গীকার করেছে এই সুযোগ প্রদান তার সাথে সাংঘর্ষিক। সেই সাথে তিনি মনে করেন এই সিদ্ধান্তের ফলে গনতন্ত্রের কতটা প্রতিফলন হচ্ছে সেটা একটা জানার বিষয়। ড. মশিউর রহমান বিষয়টি নিয়ে বলতে গিয়ে জানান, অবৈধ এবং অপ্রদর্শিত এই দু’টির মধ্যে পার্থক্য আছে। তিনি আরও জানান অপশাসনের অশুভ ফল নির্মূল করতে সময় প্রয়োজন।
তাঁর মতে এটি নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য না হলেও অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের ফলে দেশের সার্বিক অর্থনীতি উপকৃত হবে। মো. ইকবাল করিম ছিলেন পরবর্তী প্রশ্নকর্তা। তিনি জানতে চান বাজেট বাস্তবায়ন করাই যদি মূল সমস্যা হয়, তাহলে এবারের বাজেটের আকার এত বড় কেন। প্রথমেই এ প্রশ্নের জবাব দেন মি. আকাশ। তিনি মনে করেন গত বছরের বাজেটের সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি ও বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বিবেচনা করে দেখা যায় বাজেটের আকার খুব বেশী বড় হয়নি। তবে তিনি বলেন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (এডিপি) আকার ৩৩ শতাংশ বেড়ে গেছে। তার মতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সহ বিভিন্ন কারণে সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর ৮০ শতাংশের বেশী বাস্তবায়ন করতে পারবে না। মি. চৌধুরী বলেন বাজেটে অর্থনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য বেশী এসেছে। তিনি বাজেটের আকারকে একটি বড় ধরনের আইওয়াশ অভিহিত করে বলেন, এটার মূল সমস্যা বাস্তবায়নে। তিনি আরও বলেন এবারের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেশের সার্বিক অর্থনীতির নিন্মমুখী ধারার পরিপন্থী। এসময় একজন দর্শক জানতে চান বাজেট বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে এগুলো দূর করার করার লক্ষ্যে সরকার কোন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবে কিনা। আরেকজন দর্শকের জিজ্ঞাসা ছিল বাজেট বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা থাকলে সাধারণ জনগণকে আইওয়াশের প্রয়োজনীয়তা কি।
দর্শকদের একজন জানতে চান সেই দিন কবে আসবে যেদিন বিরোধীদল বাজেটের সমালোচনা না করে এর পক্ষে কথা বলবে। বাজেটের আকার সংক্রান্ত এসকল প্রশ্নের জবাবে ফাহমিদা খাতুনও মনে করেন এবারের বাজেটের আকার যে খুব বড় তা নয়। তিনি মনে করেন জোর প্রচেষ্টা থাকলে সরকার জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপুল প্রত্যাশার চাপ পূরণের লক্ষ্যে বিশ্বঅর্থনীতির মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির স্থবিরতা থাকা সত্ত্বেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সক্ষম হবে। মি. রহমান বাজেটের আকার সংক্রান্ত এ প্রশ্নগুলির জবাবে মনে করেন সংসদে গিয়ে যদি বিএনপি বাজেটের সমালোচনা করত, তাহলে মানুষ অনেক বেশী উপকৃত হতো। তিনি আরও বলেন নির্বাচনী ইশতেহারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজেট রাজনীতি ও অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সুষ্ঠু ও বিচক্ষণ অর্থনীতির দৃষ্টান্ত। তবে তিনি বাজেট বাস্তবায়নের সমস্যাকে অস্বীকার করেননি। আলোচনার এক পর্যায়ে মি. চৌধুরী বাজেটের আকারের তুলনায় প্রবৃদ্ধিকে অসামঞ্জস্য বলে উল্লেখ করেন। পরবর্তী প্রশ্নকারী ছিলেন রওশন আরা সুলতানা। তিনি জানতে চান ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য কতটা যুক্তিসংগত। এ প্রশ্নের জবাবে ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে যে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে তা দেশের সামগ্রিক সিস্টেম তোলপাড় করার তুলনায় অপ্রতুল। তিনি আরও মনে করেন এর ফলে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাংলাদেশের সময়গত অসামঞ্জস্যতা তৈরী হবে। তিনি এর (ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেয়া) পরিবর্তে অফিসের সময় এগিয়ে দেয়ার পক্ষে মত দেন। মি. চৌধুরী এ প্রসংগে ফাহমিদা খাতুনের সাথে একমত পোষণ করে বলেন ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তটি ভালো সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না কারণ এর ফলে প্রাচ্যের সাথে আমাদের দেশের সময়গত বৈরিতা সৃষ্টি হবে।
এসময় দর্শকদের মধ্যে একজন মন্তব্য করেন ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের ফলে বিভিন্ন প্রকার বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। আরেকজন দর্শক মতামত দেন সময় এগিয়ে দেয়ার বিষয়টি সকল স্তরের জনগণকে জানাতে এবং বুঝাতে হবে নাইলে এটি কার্যকারিতা হারাবে। দর্শকদের একজন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য ঘড়ির কাঁটা না এগিয়ে বিদ্যুতের সুষ্ঠু বণ্টনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। মি. আকাশ বিষয়টিকে আশ্চর্যজনক বলে অভিহিত করেন। তার মতে অভ্যাস সহজে পাল্টায় না, তাই মানুষ ঠিকই তার অভ্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সময়টা বদলে নিবে। তিনি মনে করেন সময় এগিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কঠোরতম তদারকির প্রয়োজন। মি. রহমান বলেন, বিদ্যুতের সাশ্রয় হলে সময় এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানানো উচিত। তাঁর মতে অল্পসংখ্যক শহুরে নাগরিক ব্যতীত আর কেউই ঘড়ির কাঁটা দিয়ে তাদের জীবন পরিচালিত করে না। তিনি মনে করেন এই সিদ্ধান্তের ফলে জনজীবনে কোন অসুবিধা সৃষ্টি হবে না। আকিফা হক প্রিমা ছিলেন পরবর্তী প্রশ্নকারী। তিনি জানতে চান সকল জাতীয় বাজেট অধিবেশনে বিরোধীদল সংসদে অনুপস্থিত থাকে কেন। এ প্রশ্নের জবাবে মি. চৌধুরী বলেন, প্রথম সারিতে আসন বণ্টন নিয়ে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণে এবার বিএনপি সংসদে অনুপস্থিত ছিল। তিনি এসমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য গণতান্ত্রিক পরিধি বৃদ্ধি এবং মানসিকতা পরিবর্তনের প্রতি আলোকপাত করেন।
ফাহমিদা খাতুন এ প্রশ্নের জবাবে মনে করেন এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে রাজনৈতিক আবেগটা বেশী কাজ করে। তিনি এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার পাশাপাশি এটিকে নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেন। এসময় আরেকজন দর্শক জানতে চান এদেশে বিরোধীদল কি কখনই সরকারের নিন্দা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। দর্শকদের মধ্যে থেকে আরেকজন জানান এদেশে বিরোধীদল সাধারণত সংসদ বর্জন করলেও সংসদ থেকে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন। তিনি মনে করেন সংসদে অনুপস্থিত থেকে সংসদ থেকে সুবিধা গ্রহন করা সমীচীন নয়। মি. আকাশ এ প্রশ্নগুলোর জবাবে বলেন, জাতীয় বাজেট অধিবেশনে অনুপস্থিত থেকে বিএনপি নিজেকেই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। এছাড়া তিনি মি. চৌধুরীর কথার রেশ ধরে বিরোধী দলের সংসদে অনুপস্থিতির কারণকে তুচ্ছ বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে এই কারণটি (প্রথম সারিতে আসন বণ্টন) বিএনপির অভ্যন্তরেও সমস্যা সৃষ্টি করবে। এ প্রসংগে মি. রহমান মনে করেন, সংসদে যথেষ্ট পরিমাণ বলার সুযোগ না পাওয়াটা বিরোধীদলের সংসদ বর্জনের অন্যতম কারণ হতে পারে। তাঁর মতে বিএনপির এবারের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি। এবারে সংলাপের সর্বশেষ প্রশ্নকারী ছিলেন মো. মনিরুজ্জামান দুলাল। তিনি জানতে চান আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতি পরিবার থেকে কমপক্ষে একজনকে চাকরি প্রদানের অঙ্গীকার কবে বাস্তবায়িত হবে।
প্রথমেই এ প্রসংগে বলেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে ২০১৪ সালের মধ্যে ২৯ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান ও তার প্রক্রিয়ার কথা বলা আছে। আগামী অর্থবছর থেকে এটি কার্যকর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। মি. আকাশ এ প্রসংগে মনে করেন, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য বাজেটে প্রস্তাবিত পাইলট প্রকল্প কর্মসংস্থানের প্রতি সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। এই পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমে বরগুনা ও কুড়িগ্রামের বেকার যুবকদের তিনমাসের ে সম্প্রসারণ করা হবে। এসময় দর্শকদের মধ্যে থেকে একজন সরকারের কর্মসংস্থানের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। আরেকজন একজন দর্শক বলেন এই সংলাপে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তাদের অধিকার নিয়ে কথা বললেও জনগণের অধিকার সংক্রান্ত বিষয় তারা ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি এর কারণ জানতে চান। মি. চৌধুরী বলেন সরকার তার কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করলে তিনি আনন্দিত হবেন। এছাড়া সরকার কর্তৃক এ অঙ্গীকার পূরণের পক্ষে তিনি আশাবাদী মন্তব্য করেন। মি. রহমান বলেন, কর্মসংস্থান প্রক্রিয়া এবং কর্মসূচী জটিল হলেও এটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে হবে। সবশেষে তিনি জানান, কর্মসংস্থান প্রক্রিয়া এবছর থেকে শুরু হবে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যেই বাস্তবায়িত হবে। (অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয় গত ১৪ই জুন, ২০০৯ বিবিসি বাংলার ‘প্রবাহ’ অধিবেশনে।) বাংলাদেশ সংলাপ প্রযোজনা করেছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ। |
|||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
|
|||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||