|
জরুরী অবস্থা আর কতদিন?
|
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
কথা ও ছবি: রাসেল মাহমুদ
বাংলাদেশ সংলাপের গত ১০ই মে ২০০৮ এর আয়োজনে প্যানেল সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, সাবেক চার দলীয় জোট সরকারের জ্বালানী উপদেষ্টা মাহমুদুর রহমান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক হাসান মাহমুদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করেন বিবিসির কামাল আহমেদ৻
মিলনায়তনে উপস্থিত দর্শকদের করা প্রশ্ন সমুহ থেকেই বাছাই করে নেয়া হয় মুল অনুষ্ঠানের প্রশ্ন। তবে প্যানেল সদস্যরা আগে থেকে সেসব প্রশ্ন সম্বন্ধে কিছু জানতেন না। সেসব প্রশ্নের উপর প্যানেল সদস্যদের পাশাপাশি অন্য দর্শকরাও তাদের মন্তব্য করেন। দর্শকদের কেউ কেউ বিভিন্ন বিষয়ে সম্পুরক প্রশ্নও করেন। অনুষ্ঠানের প্রথম প্রশ্ন করেন মোর্শেদা রহমান। তিনি জানতে চান জরুরী অবস্থা কবে নাগাদ তুলে নেয়া উচিত বলেন প্যানেল সদস্যরা মনে করেন? প্রথমেই মন্তব্য করেন মাহমুদুর রহমান। জরুরী অবস্থাকে জনগনের জন্য অবমাননাকর উল্লেখ করে তিনি বলেন এটি এতোদিনে তুলে নেয়া উচিত ছিলো। তিনি আরো বলেন, একটি দেশে জরুরী অবস্থা থাকা মানেই ধরে নেয়া যায় সেই দেশে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে না।
তিনি মনে করেন এমন নেতিবাচক ধারনা বাইরে দেয়া উচিত না এবং এখনই এটি তুলে নেয়া উচিত বলেন তিনি মনে করেন। হাসান মাহমুদ মি. রহমানের সাথে একমত পোষন করে বলেন, একটি দেশে জরুরী অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া উচিত না। তিনি বলেন, এই অবস্থার কারনে জনগন সাংবিধানিক আনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হাসান মাহমুদ বলেন, জরুরী অবস্থাকে সরকার নানা ভাবে ব্যবহার করছে। যে অবস্থায় জরুরী অবস্থা জারি হয়েছে সে অবস্থা যেন আর সৃষ্টি না হয় একজন দর্শক সে গ্যারান্টি দাবী করেন। তিনি বলেন এখন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে যেন ওই পথে যেন কেউ ফিরে না যায়। আরো অনেক দর্শক একই ধরনের মন্তব্য করলে এক মহিলা দর্শক তাদের কাছে প্রশ্ন করে জানতে চান জরুরী অবস্থা জারী হওয়ার কারনে সবাই কি আসলেই ভালো আছেন? মাহবুবা নাসরিন আগের দুই প্যানেল সদস্যের সাথে একমত পোষ করেন। তিনি বলেন, এখন তাঁর কাছে জরুরী অবস্থার সংজ্ঞা নিয়েই সন্দেহ তৈরী হয়েছে। তিনি আরো বলেন, জরুরী অবস্থা থাকলেই যে ভালো হচ্ছে আর উঠিয়ে দিলেই ভালো হবে না সেই প্রশ্ন দেশবাসীর মনে এখন তৈরী হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। মইনুল হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে এটি পাঁচ নম্বর জরুরী অবস্থা, কিন্তু এতো দীর্ঘস্থায়ী জরুরী অবস্থা কখনই জারী ছিলো না। তিনি বলেন, দেশে গনতন্ত্র চাইলে জরুরী অবস্থা উঠিয়ে নিতে হবে এবং জরুরী অবস্থা ছাড়াই নির্বাচন করতে হবে। তিনি বলেন জরুরী অবস্থা এতোদিন জারি থাকলে এটি প্রমান হয় যে দেশ অকার্যকর। তিনি বলেন দেশের অর্থনীতির জন্য এটি কোনভাবেই মঙ্গলকর নয়। পরের প্রশ্ন করেন আলমগীর হোসেন সরকার। তার প্রশ্ন: বিএনপি নেতা সাইফুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর কি বর্তমান সরকার রাজনৈতিক সংস্কারে সফল হবে?
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবার আগে সাইফুর রহমান বলেছেন যে তিনি বিএনপির যে অংশের ভারপ্রাপ্ত কার্যকরী সভাপতি ছিলেন সেই দায়িত্বে তিনি আর নেই এবং তার কার্যকারীতা শেষ হয়েছে কারন স্থায়ী কমিটির চারজন সদস্য হলফনামা দিয়ে বলেছেন যে তারা কোন সভা করেন নাই। সেই সাথে সাইফুর রহমান, দলের সাবেক বামপন্থী নেতাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন তারা দল ভাংতে পারেন গড়তে পারেন না। সেই পটভুমিতেই এই প্রশ্ন। প্রথমেই এপ্রশ্নের উত্তর দেন মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, সাইফুর রহমান কি বললেন না বললেন তার সাথে সংস্কারে কোন সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন সংস্কারের চাহিদা দল এবং তা কর্মীদের কাছ থেকে আসতে হবে, এটি চাপিয়ে দেয়ার কোন বিষয় না। তিনি বলেন চাপিয়ে দেয়া সংস্কার কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না এটিই সাইফুর রহমানের বক্তব্যে আরো প্রমানিত হলো। মি. রহমান বলেন, সংস্কার করতে হলে মুক্ত পরিবেশ দরকার। তিনি বলেন সেই পরিবেশ তৈরী না করে সংস্কার সফল হবেনা। জেনারেল চৌধুরী মনে করেন জনগনই সংস্কার করবে। যাকে বাদ দিতে হবে তাকে জনগনই ভোটের সময় বাদ দেবে। তিনি মনে করেন উপর থেকে এটি চাপিয়ে দেয়ার ব্যাপার নয়। দর্শকদের একজন এসময় প্রশ্ন তুলে বলেন রাজনৈতিক দলের সংস্কার সরকার কিভাবে করবে? আরেক দর্শক জে চৌধুরীর করা মন্তব্যের উপর সম্পুরক প্রশ্ন করে জানতে চান যদি সব রাজনৈতিক দল একটি আসনে একজন করে দুর্বৃত্তকে মনোনয়ন দেয় তাহলে জনগনের পক্ষে কিভাবে তাদের বাদ দেয়া সম্ভব হবে? এপ্রসঙ্গে তিনি পুরাতন ঢাকার একটি আসনের উদাহরন দিয়ে বলেন অবস্থা তেমন হলে কিভাবে তা সম্ভব হবে? আরো এক দর্শকও একই কথা উল্লেখ করে বলেন যে দেশের জনগন দুটি মার্কা ছাড়া আর কিছু চেনে না, তারা কিভাবে সংস্কার করবে? আরো একজন দর্শক প্রশ্ন করেন রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজের ভেতরে গনতন্ত্রের চর্চা না করে তাহলে কিভাবে দেশের জন্য তারা গনতন্ত্র চর্চা করবে?
হাসান মাহমুদ বলেন, সাইফুর রহমানের বক্তব্যের ভেতর দিয়ে একটি ব্যাপার বেরিয়ে এসেছে যে চাপিয়ে দেয়া সংস্কার কোনভাবেই কার্যকরী হতে পারে না। তিনি বলেন, জরুরী অবস্থাই সংস্কারের প্রধান অন্তরায় এবং এ অবস্থায় সংস্কার কিভাবে করা হবে? তিনি বলেন, রাজনীতিতে গণতন্ত্রায়ন হতে হবে স্বতস্ফুর্ত। মাহবুবা নাসরিন বলেন, যে সংস্কার চলছে তা সুস্থ নয়। জনগনকে সাথে নিয়ে সংস্কার করতে হবে কিন্তু এখন সংস্কার হচ্ছে উচ্চ পর্যায়ে, তিনি বলেন, এখন যে সংস্কার চলছে তা প্রকৃত নয়। জে. চৌধুরী এসময় জানতে চান যারা এখন সংস্কারের কথা বলছেন কে তাদের দায়িত্ব দিয়েছে সংস্কার করার? দর্শকদের একজন শারমিন রব চৈতি জানতে চান জরুরী ক্ষমতা আইনে পাঁচ কিংবা তারো বেশী আগের অপরাধের বিচার করা গেলে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা কেন যাবে না? মাহবুবা নাসরীন মনে করেন বাংলাদেশকে স্বাধীনতা অর্জনে বাধা দিয়েছে যে শক্তি তাদের অপরাধের বিচার আমরা করতেই পারি। তিনি বলেন, জরুরী আইনে ১৯৯৬ সালের অপরাধের বিচারে বাধা না থাকলে ১৯৭১ সালের অপরাধের বিচারেও বাধা থাকতে পারেনা বলে তিনি মনে করেন। মাহমুদুর রহমান বলেন, যুক্তির খাতিরে বাধা থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কাছাকাছি সময়ে দুটি রায় দিয়েছে। একটি হলো যত বছরের পুরোনো মামলাই হোক জরুরী আইনে বিচার করা যাবে এবং অপর রায়টি হলো জরুরী আইনে কোন মামলা করলে তার জন্য আদালতে জামিন চাওয়া যাবে না। তিনি বলেন এই দুই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কারাগারে রুপান্তরিত করা হয়েছে।
দর্শকদের একজন এসময় বলেন রাজাকার এদেশে পতাকাওয়ালা গাড়ি চড়ে ঘোরাফেরা করে। আরেক দর্শক মনে করেন জরুরী আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যেতে পারে। আরো এক দর্শক বলেন বাংলাদেশই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয় নি। হাসান মাহমুদ বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চিন্তা না করে বরং যখন তারা জরুরী অবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে মিছিল করে তখন তাদের সাথে আলোচনার নীতিতে আমরা বিশ্বাস করি। তিনি আবারো বলেন বাংলাদেশ এখন সর্ববৃহৎ কারাগারে পরিনত হয়েছে। মইনুল হোসেন চৌধুরী মনে করেন এখন বিচার করা সম্ভব। আর সেই সাথে তিনি বলেন এজন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন আছে বলেও তিনি মনে করেন। আর এতোদিন এই বিচার হয়নি তার কারন হিসেবে তিনি বলেন এই বিষয়গুলিকে রাজনীতিকীকরন করা হয়েছে বলেই এটি সম্ভব হয়নি। পরের প্রশ্ন করেন মো বাদল হোসাইন। তিনি জানতে চান সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন গনতন্ত্রের জন্য কতটা জরুরী? মি. মাহমুদ বলেন, যুক্তরাজ্যে আমাদের দেশের মতো লিখিত সংবিধান নেই। তিনি বলেন, অনেকগুলো বিষয়কে বিবেচনায় এনে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের কথা বলেন। তবে বিষয়টিকে স্পর্শকাতর উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি নিয়ে তিনি শুধুমাত্র দলের অভ্যন্তরেই কথা বলতে চান বাইরে নয়। মি রহমান বলেন তাঁর নিজের কোন দল নেই, তাই ব্যক্তিগত অভিমত তিনি দিতেই পারেন। তিনি মনে করেন গনতন্ত্র শক্তিশালী করার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদ উঠিয়ে দেয়া উচিত। তবে সেই সাথে তিনি একথাও মনে করিয়ে দেন যে, সেটি করার দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের।
জে. চৌধুরী বলেন সংবিধান পবিত্র জিনিস এটি নিয়ে কথা বলা শুরু করলে আর দেশ চলবে না। তিনি মনে করেন শুধুমাত্র নির্বাচিত সরকারেই এই অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করতে পারে। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তো আর এই অনুচ্ছেদ নিয়ে সমস্যা হচ্ছে না, তারা চাইলেই তাদের উপদেষ্টাদের যে কাউকে বের করে দিতে পারেন। আর সংবিধানে একটি অগনতান্ত্রিক সরকারকে হাত দিতে বললে তো চলবে না। আর রাজনৈতিক দলগুলি যদি তাদের নির্বাচনী ইসতেহারে এই কথা বলে দেয় তাহলে তারা তা করবেই বলেও তিনি মনে করেন। পরের প্রশ্ন করেন ফেরদৌস জাহান। তিনি জানতে চান বর্তমান সরকার কি আমাদের মেধাহীন এবং পুষ্টিহীন আগামী প্রজন্ম উপহার দিচ্ছেন? দ্রব্যমুল্য বেড়ে যাওয়ার কারনে তিনি এই প্রশ্ন করেছেন বলে জানান। মাহবুবা নাসরিন বলেন বাংলাদেশে দ্রব্যমুল্য বেড়ে যাওয়ার কারন আন্তর্জাতিকও বটে। তারপরেও তিনি বলেন দ্রব্যমুল্য নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রে একটি নির্বাচিত সরকারের যে অভিজ্ঞতা থাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সেটি নেই। জে. চৌধুরী বলেন বাংলাদেশে ৭৭ ভাগ মানুষ দৈনিক ১২০ টাকার নিচে আয় করে। সেই সাথে দেশে মধ্যবিত্তের পরিমান কমে যাচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি মনে করেন এই অবস্থার জন্য দায়ী দেশের বর্তমান অব্যবস্থাপনা। মি. মাহমুদও একই কথা উল্লেখ করেন। এব্যাপারে তিনি উদাহরন হিসেবে বলেন ভারত যখন তাদের চালের রফতানী মুল্য বাড়িয়ে দিলো তারপরেই দেশের বাজারে চালের দাম বেড়ে গেলো। তিনি বলেন এখানে ব্যবস্থাপনার অভাব ছিলো। আর বিশ্ববাজারে দাম বাড়াকে বড় কারন হিসেবে তিনি মনে করেন না বলেও জানান। মি. রহমান বলেন, এটি খুবই দু:খজনক যে বিগত এক বছরে বাংলাদেশে দারিদ্রের হার বেড়েছে। তিনি বলেন বিগত ১০বছরে দারিদ্রের হার ১৮ শতাংশ কমেছিল অথচ গত এক বছরে তা বেড়েছে ১০ শতাংশ। তিনি আরো বলেন, এই হার নির্বাচিত সরকারের আয়ত্বে আসতে সাত থেকে আট বছর লেগে যাবে এবং এখন যখন মধ্যবিত্তরাও ওএমএস এর চাল সংগ্রহের জন্য যখন লাইনে দাঁড়ান তখন সরকারের উপদেষ্টারা বলেন সিনেমার টিকেট কেনার জন্য লাইনে দাঁড়াতে পারলে এটি পারবেন না কেন। তিনি এই উপদেষ্টাদের এই মন্তব্যকেই দায়বদ্ধতার সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। সেই সাথে বলেন নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রী হলে এই মন্তব্যের জন্য তাকে পদত্যাগ করতে হতো। |
স্থানীয় লিংকস্
সেনাবাহিনী কোন পক্ষ?06 মে, 2008 | বিশেষ আয়োজন
খাদ্য সংকট কী নীরব দূর্ভিক্ষ?09 এপ্রিল, 2008 | বিশেষ আয়োজন
নির্বাচন নিয়ে মুক্ত আলোচনা ?06 ফেব্রুয়ারী, 2008 | বিশেষ আয়োজন
সর্প দংশন আর ওঝার ঝাড়28 জানুয়ারী, 2008 | বিশেষ আয়োজন
|
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
|
|||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||