|
ত্রাণ অর্থের উৎস কী প্রশ্নের মুখে? | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
কথা ও ছবি: রাসেল মাহমুদ বিবিসি বাংলার বিশেষ আয়োজন বাংলাদেশ সংলাপের তৃতীয় পর্বের তৃতীয় আয়োজনটি ছিল ঢাকায়। বরাবরের মতোই সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনা এবং ইস্যু নিয়ে প্যানেল সদস্যদের কাছে আমন্ত্রিত দর্শকরা প্রশ্ন করেন। প্যানেল সদস্যরা তাদের প্রশ্নের জবাব দেন এবং একই সাথে দর্শকরাও বিভিন্ন মন্তব্য এবং সম্পূরক প্রশ্ন করেন। এবারের আয়োজনে প্যানেল সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জেড এ খান, সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক এবং সম্মিলিত সংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ। ঢাকার বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে আমন্ত্রিত দর্শক শ্রোতাদের মধ্যে থেকে প্রথম প্রশ্ন ছিল প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে অর্থ দেয়া হলে তার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না বলে সম্প্রতি কর্মকর্তারা যেকথা জানিয়েছেন তা কতখানি যুক্তিযুক্ত? প্রশ্নটি করেন মালিবাগের নজরুল ইসলাম। ‘এখন যুক্তি দিয়ে দেশ চলছে না, হুকুম দিয়ে চলছে’ এমন কথা বলে মতিয়া চৌধুরী জানান যে তিনি মনে করেন টাকার উৎস স্বচ্ছ হওয়া উচিত। তিনি আরো বলেন কালো টাকার উৎস জিজ্ঞাসা করলে তা সব জায়গাতেই করা উচিত। তবে জেড এ খান মনে করেন অনেকটা ভয়ের কারণেই কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না আর সে কারণে বন্যার্তদের প্রতি সাহায্য বাড়ানোর জন্যই এমনটা করা হচ্ছে। শাহদীন মালিক অনেকটা সরাসরিই বললেন যেখানেই টাকা দেয়া হোক না কেন তার উৎস জিজ্ঞাসা করা উচিত। আর তা না করা হলে এটি একটি উদাহরণ হিসেবে থেকে যাবে এবং তা ক্রমেই বাড়তে থাকবে। তিনি আরো বলেন যে তিনি চান মানুষ সৎ টাকা দিয়েই মানুষকে সাহায্য করুক।
দর্শকদের একজন কালো টাকা নিয়ে টানাটানি কেন হচ্ছে এমন প্রশ্ন করে বলেন এই সমস্যার সমাধানের জন্য তার মূলে যেতে হবে। তিনি বলেন দীর্ঘদিন ধরে আমাদের অর্থনীতিতে এই টাকার একটি প্রভাব আছে এবং হঠাৎ করেই এটি বন্ধ করে দেয়া হলে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন। অন্য এক দর্শক বলেন যদি এই জিজ্ঞাসা করতে করতে বন্যা চলে যায় এবং মঙ্গা আসে আবার সেটাও চলে যায় তবে কাজের কাজ কিছুই হবে না, তারচেয়ে আগে সাহায্য শুরু করা উচিত তারপর এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা যাবে। নাসির উদ্দিন ইউসুফ উল্টো জানতে চান কেন প্রধান উপদেষ্টার তহবিলে টাকা দিলেই তা সাদা হয়ে যাবে? তিনি বলেন এই সাহায্য সরকারী নিয়ন্ত্রণেই হতে হবে এমন কোন কথাও তো নেই। দর্শকের সাথে একমত পোষন করে তিনি বলেন বন্যার্তদের সাহায্য করার বিষয়টি উন্মুক্ত করে দেয়া উচিত। পরের প্রশ্ন করেন ধানমন্ডির কবির আহমেদ। তিনি জানতে চান দ্রব্যমূল্য সাধারন মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখতে কি পদক্ষেপ নেয়া উচিত? তিনি মনে করেন এব্যাপারে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। তিনি এক্ষেত্রে প্রধানতঃ পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের কথা বলেন।
মতিয়া চৌধুরী জানান সরবরাহ ঠিক রাখতে পারলে দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তিনি মনে করেন সরবরাহের জায়গায় এখন একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। আর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দেশজ পণ্য উৎপাদন, বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারী ভাবে খাদ্য মজুদ এবং তা থেকে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিও তিনি জোর দেন। জেড এ খান এ প্রসঙ্গে বলেন সবার আগে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ব্যাপার নিশ্চিত করা হলে দ্রব্যমূল্য নাগালের ভেতরে থাকবে। তিনি জানান সরকারের জানা উচিত কোন কোন সময়ে দ্রব্যমূল্য বাড়তে পারে এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া। এছাড়াও তিনি সরবরাহ এবং বাজারজাতকরনের প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষন করেন। নাসির উদ্দিন ইউসুফ মনে করেন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সমাজে নেই বলে সমাজে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে এবং সেকারণেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। আর তিনি মনে করেন এই মুহুর্তে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতিকে সামাজিক এবং রাজনৈতিক ভাবেই মোকাবেলা করা উচিত। শ্রোতাদের একজন অভিযোগ করে বলেন দেখা যায় প্রতিটি সরকারের আমলেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তিনি আরো যোগ করেন সেনাবাহিনী এবং বিডিআরকে এব্যাপারে ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া তিনি প্রতিটি জেলায় ন্যায্য মুল্যের দোকান স্থাপন করার ব্যাপারেও জোর দেন। অন্য এক দর্শক তুলে আনেন মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের বিষয়টি। তিনি জানান এই মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের তুলে দিতে হবে এবং প্রতিটি জেলায় নিয়োগপ্রাপ্ত বাজার কর্মকর্তাকে তিনি এজন্য কাজে লাগাবার পরামর্শ দেন। মুক্তবাজার সম্পর্কে এদেশে একটি বিকৃত ধারণা আছে বলে মন্তব্য করেন শাহদীন মালিক। তিনি বলেন মুক্তবাজার কোনো ছেড়ে দেয়া বাজার ব্যবস্থা নয়, সরকারের উচিত পরোক্ষভাবে একে নিয়ন্ত্রণ করা। তিনি বলেন এখন যে দাম বাড়ছে, পরিস্কারভাবেই বোঝা যায় কিছু দুষ্টু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটের কারণেই জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। পরের প্রশ্ন করেন সাইফুল আলম। তিনি বলেন সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রী এবং একজন অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি বেশ বড় অংকের কর জরিমানাসহ জমা দিয়েছেন। তিনি জানতে চান যাঁরা দেশ পরিচালনা করেন তাঁরাই যদি আইন ভঙ্গ করেন তাহলে কি তাঁদের কাছে সু-শাসন আশা করা যায়?
মি ইউসুফ প্রশ্ন তুলে জানতে চান প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর এই টাকার উৎস কি? তিনি বলেন রাষ্ট্র পরিচালনায় যাঁরা থাকবেন তাঁদের স্বচ্ছতা প্রয়োজন, তাহলেই জনগণের আস্থা থাকবে আর রাষ্ট্র ভালভাবে পরিচালিত হবে। দর্শকদের একজন এপ্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলেন, তিনি জানতে চান রাজনীতিবিদদের অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা থাকবে এবং তাদের কোন শাস্তি হবে না সেটা কি সাধারণ মানুষের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব? মি খান মনে করেন কেউ আইনের বাইরে না এবং কেউ নিয়মের বাইরে গেলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। তিনি বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ছিলেন, তাহলে তিনি এবিষয়ে তাঁকে কোন উপদেশ দেননি কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ‘উপদেষ্টাদের উপদেশ শোনার সময় তো থাকতে হবে’। তিনি গত ১২ বছর বিএনপি চেয়ারপর্সনের উপদেষ্টা হিসেবে থেকেও কোন কথা বলার সুযোগ পাননি বলে তিনি জানান। তাহলে কেন পদত্যাগ করেন নি? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি রাজনীতিতে বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। মতিয়া চৌধুরী জানান কালো টাকা থাকা নীতিগতভাবে অনুমোদনযোগ্য নয়। দর্শকদের একজন প্রশ্ন তোলেন সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রী এমন করে থাকলে তাঁর কাছ থেকে আমরা কি শিক্ষা নেব? পরের প্রশ্ন করেন কাফরুলের রফিকুল ইসলাম। তিনি জানতে চান রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের যে খসড়া তৈরী করেছে তা কি বাস্তবায়ন হবে? মতিয়া চৌধুরী বলেন ঘরোয়া রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় তাঁদের পক্ষে দলীয় ভাবে সংস্কারের প্রস্তাব তৈরী করা সম্ভব হয়নি। সেই সাথে তিনি বলেন যদি কেউ আলাদাভাবে এবিষয়ে কথা বলে থাকে তবে তা তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনা। মি খান মনে করেন তাঁদের দল থেকে আসা প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি জানান দলের ভেতরে আলাপ আলোচনা করেই আনুষ্ঠানিক ভাবে সংস্কার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয় যে, এই সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে বিএনপিতে ভাঙ্গনের অবস্থা তৈরী হয়েছে, তাহলে কি একটি অখন্ড বিএনপিতে এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে?
জবাবে তিনি জানান তাঁরা দলের গঠনতন্ত্রের সংস্কার চাইছেন। তিনি আরো বলেন, দলের চেয়ারপার্সনের আনুমতি না পাওয়া গেলে তাঁরা দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী একটি দাবিসভা করবেন এবং সেখানে এবিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আর দল ভাঙবে কি না সে প্রশ্নে তিনি বলেন, যদি ভিন্ন মত পোষণ করে দলের কিছু সদস্য চলে যায় সেটাকে ভাঙ্গন বলা যায় না। এক দর্শক জানতে চান দলের সংস্কারের আগে দরকার ‘ব্যক্তির সংস্কার’, আমাদের রাজনীতিবিদরা কি সেই সংস্কার করতে পেরেছেন? নাসির উদ্দিন ইউসুফ মনে করেন সংস্কার হঠাৎ করে হবে না। তিনি জানান বর্তমানে যে সংস্কার প্রস্তাব নেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নের সম্ভবনা খুবই কম। তবে শাহদীন মালিক মনে করেন আসল সংস্কারের দিকে কেউ নজর দিচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন একটি দলের তহবিল কোথা থেকে আসছে তা নিয়ে কেউ কোন কথা বলেন না। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ক্লাসে একজন শিক্ষার্থীকে হিজাব না পরার ব্যাপারে পরামর্শ দেন। ফাতেমা ইয়াসমিন এ বিষয়ে প্যানেল সদস্যদের মতামত জানতে চান। দর্শকদের কয়েকজন এবিষয়টিকে যাঁর যাঁর ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার দিকেই মত দেন। মি খানও মনে করেন গ্রহণযোগ্য যে কোন পোষাক পরলে কারো আপত্তি থাকা উচিত নয়। তবে মি. ইউসুফ ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও একটি ব্যাপারে শংকা প্রকাশ করে বলেন এই হিজাব পরার মাঝে একটি বার্তা আছে, রাজনৈতিক ভাবে দেখলে বলা যায় ধর্মকে এখন সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। এপ্রসঙ্গে তিনি আফগানিস্তানের উদাহরণ টানেন। মহিলা দর্শকদের একজন এসময় বলেন এদেশে বিভিন্ন সময় বোমা হামলা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে এই হিজাব পরার সাথে ওই বিষয়টির একটি সম্পর্ক আছে। অন্য একজন বলেন ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের কারণে ইদানিং হিজাবধারীদের ব্যাপারে তাঁদের মনে শংকা তৈরী হচ্ছে যে সে ওই দলের কেউ কি না?
মতিয়া চৌধুরী মনে করেন যাঁর যাঁর পোষাক তাঁর রুচি অনুযায়ীই হবে এতে কোনো বাধা নেই। তবে শ্রোতাদের শংকার ব্যাপারটিকেও উড়িয়ে দিতে চান না তিনি, আবার হুকুম দিয়েও এধরণের ব্যাপারকে থামিয়ে দেয়ার পক্ষে তিনি না, কারণ সেটি নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনতে পারে। শাহদীন মালিক পরিস্কার ভাবে জানান হিজাবের সাথে ইসলাম ধর্মের কোন সম্পর্কই নেই। এটি সম্পূর্ণ অপব্যাখ্যা থেকে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আর একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর মত, শিক্ষার্থীকে পড়ানোর ক্ষেত্রে তিনি নিজেও এধরণের ক্ষেত্রে অস্বস্তি বোধ করেন, কারণ তাতে শিক্ষার্থীর সাথে তাঁর যোগাযোগে সমস্যা হয়, তিনি নিজেই বুঝতে পারেন না শিক্ষার্থী তাঁর পড়ানো বুঝতে পারছে কি না। অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয় ১২ই অগাস্ট বিবিসি বাংলার ‘প্রবাহ‘ অধিবেশনে বাংলাদেশ সংলাপ প্রযোজনা করছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ | স্থানীয় লিংকস্ নেতৃত্ব শূণ্যতা নিয়ে আতংক 11 জুন, 2007 | বিশেষ আয়োজন দলপতি ও সেনাপতি আলোচনার শীর্ষে04 জুন, 2007 | বিশেষ আয়োজন বিদেশীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন29 মে, 2007 | বিশেষ আয়োজন রাজনৈতিক দলের সংস্কার কেমন হবে?18 মে, 2007 | বিশেষ আয়োজন আবারো আলোচনায় ড: ইউনুস10 মে, 2007 | বিশেষ আয়োজন প্রশ্নের মুখে সরকার ও দলগুলো 01 মে, 2007 | বিশেষ আয়োজন নির্বাসন প্রচেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ24 এপ্রিল, 2007 | বিশেষ আয়োজন নেতৃত্বে বদল নিয়ে বিতর্ক 16 এপ্রিল, 2007 | বিশেষ আয়োজন | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||