|
দলপতি ও সেনাপতি আলোচনার শীর্ষে | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
কথা ও ছবি: রাসেল মাহমুদ বিবিসি আয়োজিত বাংলাদেশ সংলাপের ৩২তম আয়োজন ছিলো ঢাকার বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে। এবারের সম্মানিত প্যানেল সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির অনতম সহসভাপতি ও সাবেক বানিজ্যমন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলাতানা কামাল এবং ইংরেজী দৈনিক নিউ এজ এর সম্পাদক নুরুল কবির। দেশে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান হবে কিনা এমনটা জানতে চান উম্মে শেফা শহিদ। তিনি ঢাকার গুলশানে থাকেন। হাফিজ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন বাংলাদেশে এখই প্রয়োজনের তুলনায় বেশী রাজনৈতিক দল রয়েছে, আর তাই এখন দলের সংখ্যা কমানো উচিত। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি এমন ব্যবস্থা নেয় তবে তাতে তাঁর সমর্থন থাকবে। ইতি মধ্যেই করা খসড়া নীতিমালায় রাজনৈতিক দলগঠনের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি শর্তের কথা তিনি এসময় উল্লেখ করেন।
তবে সাবের হোসেন চৌধুরী মনে করেন দলের সংখ্যার বিষয়টির চেয়ে রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বেশী গুরুত্বপুর্ন। তিনি আরো মনে করেন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যদি কোন শুন্যতা থাকে তবে স্বাভাবিক নিয়মেই তা পুরনের জন্য নতুন দল গঠন হবে আর যদি নতুন দল করার ক্ষেত্রে যদি অস্বাভাবিকতা থাকে তবে সেই দলের পক্ষে এমনিতেই টিকে থাকা কষ্টের হবে। দর্শকদের একজন এসময় বলেন রাজনৈতিক দল বাড়ানোর চাইতে বর্তমানে যেসব দল আছে তাদেরই উচিত জনগনের জন্য রাজনীতি করা আর সেটাই হবে সবচে ভালো। অন্য এক দর্শক বলেন দলের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য রাজনীতিতে সংস্কার করা বেশী জরুরী। প্রশ্নকর্তা মনে করেন রাজনৈতিক দল বাড়লে দেশে চাঁদাবাজি ও অন্য সমস্যা আরো বাড়বে। মি নুরুল কবির বলেন তাদের সাথে একমত পোষন করে বলেন দলের সংখ্যা বাড়লে সমস্য কমবে এমনটা তিনি মনে করেন না কিন্তু দেশের সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক দল দরকার আছে। তিনি সাবের হোসেন এর মতো করেই বলেন প্রচলিত রাজনৈতিক দল মানুষের আকাঙ্খার সঠিক বাস্তবায়ন না করতে পারলে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন হবেই। তিনি মনে করেন দেশে অধিকাংশ গরীব মানুষের জন্য কোন রাজনৈতিক দল নেই। সুলতানা কামালও মনে করেন না যে নতুন রাজনৈতিক দল হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। তিনি বলেন দল গঠনে তাঁরা সমর্থন দেবেন কি না এটা নির্ভর করবে সেটি দেশের ও মানুষের চাহিদা মেটাতে পারবে কি না এবং তা কোন প্রক্রিয়ায় হচ্ছে তার উপর। হাফিজ উদ্দিন বলেন দেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রধান্য অনেকদিন থেকেই চলে আসছে এবং তাদের মুখোমুখি অবস্থানের কারনে দেশের রাজনীতিতে জনগন এখন তৃতীয় একটি স্রোত চাইছে। এক্ষেত্রে বড় দুটি রাজনৈতিক দল যদি নিজের সংস্কার না করে, তাহলে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
পরের প্রশ্ন করেন মোহাম্মদপুরের জেসমীন আক্তার। তিনি জানতে চান, রাজনীতিবিদরা এখন সংস্কারের কথা বলছে, এর আগে কেন তারা তাদের দলীয় ফোরামে এ সংস্কারের কথা তোলেন নি? মি চৌধুরী বলেন তাদের দল আওয়ামী লীগের ভেতরে সংস্কার একটি চলমান ব্যাপার। তিনি আরো বলেন এখন যে সংস্কার করা হবে সেটিই যে তাদের দলের শেষ সংস্কার হবে এমনটাও না। মি কবীর অবশ্য একথায় পুরো একমত পোষন করলেন না। তিনি মনে করেন দেশের কোন রাজনৈতিক সংগঠনেই গনতান্ত্রায়ন ঘটেনি। তিনি মনে করেন দলগুলিতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরনের পক্ষে মত দেন। একই সাথে দলের তহবিল তৈরী এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার দরকার আছে বলেও তিনি মনে করেন। মি আহমেদ অবশ্য স্বীকার করেন তাঁর দলে দীর্ঘ দিন কাউন্সিল না হওয়ার কারনে সংস্কার নিয়ে আলোচনা করা হয়ে ওঠেনি, তবে ঘরোয়া রাজনীতির উপর বাধা নিষেধ উঠে গেলে এমন আলোচনা করা হবে। সুলতানা কামাল বলেন চাপের ফলে এমন সংস্কার না হয়ে আরো সুন্দর ভাবে এটি হতে পারতো। তবে ‘সংস্কারের’ বার্তাটি রাজনৈতিক দলের কাছে পৌছে দেয়া গেছে এ ব্যাপারটিকেও অনেক বড় করে দেখলেন তিনি। দর্শকদের একজন এসময় বলেন, তিনি মনে করেন বাংলাদেশে আধুনিক গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ। জনগন কি চায় তা তারা কখনোই চিন্তা করেন নি বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। অন্য এক দর্শক বলেন বাংলাদেশে গনতন্ত্রের চর্চা কখনোই হয়নি আর গনতন্ত্রকে রাজনীতিবিদরা ব্যবসা হিসেবেই নিয়েছেন এখন ঠেকায় পড়ে তারাই সংস্কারের কথা বলছেন।
অন্য এক দর্শক সংস্কারের অর্থ জানতে চান, তিনি বলেন এর অর্থ যদি নেতার পরিবর্তন হয় তবে তাতে দেশের কোন লাভ হবে না আর যদি নেতাদের মানসিকতার পরিবর্তন হয় তবেই সংস্কারের ফল পাওয়া যাবে। মি আহমেদ দর্শকের এই কথার সাথে একমত পোষন করেন। তিনি বলেন নেতৃবৃন্দের মানসিকতার পরিবর্তন করা দরকার সেই সাথে দলের গঠনতন্ত্রে যেসব অগনতান্ত্রিক ধারা আছে তার পরিবর্তন করা দরকার। মোহাম্মদপুরের ইয়াসমিন আক্তার জানতে চান বর্তমানে কি বাংলাদেশে মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে না? সুলতানা কামাল এটি স্বীকার করে বলেন, ‘মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে না এটি বলতে পারলে খুব ভালো হতো’। তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা উল্লেখ করেন। নুরুল কবির বলেন এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে মানবাধিকার স্থগিত রাখার ঘোষনা দিয়ে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ঠিক করার জন্য ১৪০ মিলিয়ন মানুষের মানবাধিকার স্থগিত রাখার নিন্দা জানান তিনি। মি আহমেদও ব্যাপারটিকে স্বীকার করে বলেন দ্রুত গনতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারলে আবার মানবাধিকার ফিরে আসবে। বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেখতে চান মি চৌধুরী। তিনি বলেন তিনি বলেন যে দেশে আইনের শাসন থাকবে না সেখানে মানবাধিকার লংঘন হবেই। পরের প্রশ্ন করেন গ্রীন রোড থেকে আসা নুরুল ইসলাম। তিনি জানতে চান রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে সভাপতির একক সিদ্ধান্ত দেয়ার ধারাটি কিভাবে বাদ দেয়া যায়? দর্শকরাই প্রথম মন্তব্য শুরু করেন, একজন বলেন উপদেষ্টা কমিটির মাধ্যমে এই সমস্যর সমাধান করা যেতে পারে। তার সাথে একমত জানান আরো কয়েকজন। অন্য একজন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গনতন্ত্র না থাকাকেই এ জন্য দায়ী করেন।
নুরুল কবির বলেন শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের ক্ষমতা নিজেরা হাতে নিয়ে নেননি। তিনি বলেন দলের নিচের স্তরের নেতারাই তাদের হাতে এ ক্ষমতা দিয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন যখন দলের ভেতর গনতন্ত্র আসবে, নিচের স্তরের নেতারা দায়িত্ববান হবেন, প্রতিবাদ করার মত সাহসী হবেন এবং কর্মীদের মধ্যে গনতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষ ঘটাতে সক্ষম হবে তখনই এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। সুলতানা কামাল তাঁর সাথে একটু যোগ করে বলেন শুধু নেতা কর্মী নয়, জনগনেরও সচেতন হতে হবে। মি চৌধুরী বলেন দলেও ভেতর যৌথ সিদ্ধান্ত নেয়ার সংস্কৃতিকে লালনপালন করতে হবে। আর সেই সাথে নেতা-নেত্রীদের সামনে সত্য কথা বলার সাহস থাকবে হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি এই ব্যাপারে ন্যায়পাল পদের প্রস্তাব করেন। মি আহমেদ বলেন বাংলাদেশের এই পরিস্থিতির জন্য দলের নেতা-কর্মীদের সাথে সাথে জনগনও দায়িত্ব এড়াতে পারে না। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের চাটুকারিতার মানষিকতাকে তিনি দায়ী করেন। ইলিয়াস আহমেদ জানতে চান দ্রব্যমুল্য কি আদৌ কমবে নাকি শুধুই কৈফিয়তই শুনতে হবে? সাবেক বানিজ্যমন্ত্রী মি আহমেদ জানান এর প্রধান কারন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়া। তিনি দেশের ভেতরেই পন্যের উৎপাদন বাড়াবার প্রতি জোর দেন সেই সাথে টিসিবি কে আরো কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
মি চৌধুরী টিসিবিকে কার্যকর করা উচিত বলে মনে করেন। তিনি ভর্তুকির বিষয়টিও বিবেচনায় আনার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান। দর্শকদের একজন এসময় বলেন এভাবে জিনিস পত্রের দাম বাড়তে থাকলে জনগন অসন্তুষ্ট হবে। তিনি এজন্য সিন্ডকেট করাকেই দায়ী করেন। অন্য এক দর্শক বলেন যারা আমদানী করেন তারা ভয়ে পন্য আনছেন না বলেই এমন হচ্ছে। সুলতানা কামাল আবারও ভর্তুকির বিষয়টি তুলে আনেন। এছাড়াও পন্য সরবরাহ ক্ষেত্রে যানবাহনের অপ্রতুলতার দিকটিও তুলে ধরেন তিনি। তবে নুরুল কবির আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমুল্য বাড়ছে মি আহমেদ এর এমন বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষন করে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যারা তৈরী করেন তাদের বিভ্রান্ত অর্থনৈতিক ভাবনাই এজন্য দায়ী। তিনি বলেন ‘এরা মনে করে বাজার অর্থনীতিতে সরকারের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই’। তিনি পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের সরকারের এমন হস্তক্ষেপের উদাহরন দিয়ে বলেন রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ভাবনাকে গনমুখী করতে হবে। এছাড়াও জনগনের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও তিনি জোর দেন। পরের প্রশ্ন ছিলো সেনাবাহিনী নিয়ে। নওগা থেকে আসা রুমন আনাম। তিনি জানতে চান বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামরিক বাহিনীতে পদোন্নয়ন কি একধরনের তোষামোদি হলো না? মি আহমেদ বলেন এদেশের সেনাবাহিনীর আকার খুব বড় না হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন যোগাযোগের প্রয়োজনে সেনাপ্রধানের জেনারেল পদমর্যাদা থাকা প্রয়োজন। তবে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে এই জেনারেল পদটি কি তোষামোদি হলো না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন এটি গনতান্ত্রিক সরকারেরই করা উচিত ছিলো এবং সেটি করলেই ভালো হতো। মি চৌধুরীও বলেন তাদের সময়েই এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল বলে তিনি জানেন এবং বিএনপির সময়েও এই প্রক্রিয়া অব্যহত ছিলো। আর এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই চুড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। তবে তিনিও মনে করেন নির্বাচিত সরকার যদি এই সিদ্ধান্ত নিত তবে আরো ভালো হতো। দর্শকদের কয়েকজনও একই মত দেন। তবে তাদের একজন বলেন আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একজন সেনাপ্রধানের পদবী জেনারেল করা হয়েছিল এবং সেটি নিয়ে বিতর্ক আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তিনি জানতে চান এখন কেন এটি নিয়ে বিতর্ক করা যাবে না? অন্য এক দর্শক জানতে চান আওয়ামী লীগের সময় এই সিদ্ধান্ত গ্রহনের প্রক্রিয়া শুরু হলো বিএনপি সরকারের সময়ও এটি হলো না, অর্থাৎ দশ বছরে এটি হলো না মাত্র চার মাসে এটি করা কিভাবে সম্ভব হলো। সুলতানা কামালও একই ভাবে জানতে চান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে অন্য ব্যাপারগুলোর চাইতে এই ব্যাপারটিই কিভাবে গুরুত্বপুর্ন হয়ে উঠলো? এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে দ্বিমত না থাকলেও এটি গ্রহনের সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মি কবির। তিনি বলেন এমনটা না করে যদি অন্য সময় এটি করা হতো তবে তা সবার জন্যই সম্মানজনক হতো। অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয় তেসরা জুন বিবিসি বাংলার ‘প্রবাহ‘ অধিবেশনে বাংলাদেশ সংলাপ প্রযোজনা করছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ | স্থানীয় লিংকস্ বিদেশীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন29 মে, 2007 | বিশেষ আয়োজন রাজনৈতিক দলের সংস্কার কেমন হবে?18 মে, 2007 | বিশেষ আয়োজন আবারো আলোচনায় ড: ইউনুস10 মে, 2007 | বিশেষ আয়োজন প্রশ্নের মুখে সরকার ও দলগুলো 01 মে, 2007 | বিশেষ আয়োজন নির্বাসন প্রচেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ24 এপ্রিল, 2007 | বিশেষ আয়োজন নেতৃত্বে বদল নিয়ে বিতর্ক 16 এপ্রিল, 2007 | বিশেষ আয়োজন সেনা প্রধানের মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক10 এপ্রিল, 2007 | বিশেষ আয়োজন সেনা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন03 এপ্রিল, 2007 | বিশেষ আয়োজন | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||