|
বিদেশীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
কথা ও ছবি: রাসেল মাহমুদ বিবিসি বাংলা আয়োজিত বাংলাদেশ সংলাপের ৩১তম আয়োজন ছিলো হবিগঞ্জে। এবারের প্যানেল সদস্য হিসেব উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় সাবেক চীপ হুইপ আব্দুস শহিদ, বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য আবু লেইস মো মবিন চৌধুরী, সিলেটের মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. কবির হোসন চৌধুরী এবং মানবাধিকার কর্মী শিপা হাফিজা। উপস্থিত দর্শকদের করা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব এবং এর উপর বিভিন্ন মতামত দেন আমন্ত্রিত প্যানেল সদস্যরা। তাদের মতামতের উপর ভিত্তি করে আমন্ত্রিত দর্শকরাও বিভিন্ন সম্পুরক প্রশ্ন এবং মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন হবিগঞ্জের শিবলী খায়ের। আগামী সংসদ নির্বাচনের ভোটার তালিকা করার জন্য সেনাবাহিনী ছয় মাস লাগার কথা জানিয়েছে কিন্তু নির্বাচন কমিশন বলছে ১৮ মাসের কথা এমন মন্তব্য করে তিনি জানতে চান এমনটা কি সরকারের সুবিধার জন্যই করা হচ্ছে? প্রশ্নের উত্তরে মি. কবির হোসেন চৌধুরী বলেন তাঁর মনে হয় ছয় মাস বলা হয়েছে শুধুমাত্র তালিকা তৈরীর জন্য আর এর সাথে সেই তালিকার ভুল ত্রুটি শোধরানোর জন্য সময় নেয়া হয়নি।
একই মত দেন শিপা হাফিজা। তিনি বলেন যেভাবে দুই জায়গা থেকে দুই ধরনের কথা বলা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে এই সব কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন জায়গায় সমন্বয়েরও দরকার আছে। এসময় ছয় এবং ১৮ মাসের বিতর্ক তুলে দেয়াকে অপ্রাসঙ্গিক উল্লেখ করেন দর্শকদের একজন। তিনি মনে করেন এজন্য ৯ মাসের বেশী লাগা উচিত না। অন্য এক দর্শক মনে করেন ক্যাম্প না করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ তালিকা তৈরী করা উচিত। মি. শহিদ বলেন সংবিধানের আওতায় থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সুষ্ঠু ভোটার তালিকা তৈরীর জন্য এতো সময় লাগা উচিত না। তিনি সেনাবাহিনীর দেয়া ছয় মাসকেই সঠিক বলে মনে করেন। মি. মবিন চৌধুরীও সেবাহিনীর দেয়া ছয় মাসকেই উপযুক্ত সময় বলে মনে করেন। পরের প্রশ্ন করেন জেসমীন খান। প্যানেল সদস্যদের কাছে তিনি জানতে চান জরুরী অবস্থা তুলে নেয়ার এখনই সময় কি না? এপ্রসঙ্গে তিনি নিজে আরো সময় দেয়ার পক্ষে। তবে অন্য এক দর্শক তাঁর মতের বিরোধীতা করে বলেন সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে, রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার করা দরকার এবং ভোটার তালিকা তৈরীর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা দরকার। আর তাই তিনি মনে করেন যত দ্রুত সম্ভব জরুরী অবস্থা তুলে নেয়া উচিত। আব্দুস শহিদ বলেন জাতির প্রয়োজনে জরুরী অবস্থা জারি করা হয়েছিলো এবং জাতির প্রয়োজনেই এটি তুলে নেয়া উচিত আর এটি তুলে নিলে সবারই সুবিধা হয়। মি. মবিন চৌধুরী বলেন সংস্কার, ভোটার লিষ্ট এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান ইত্যাদি কাজ গুছিয়ে এনেই জরুরী অবস্থা তুলে নেয়া উচিত।
ড. কবির চৌধুরী মনে করেন এখনই জরুরী অবস্থা তুলে না নিয়ে কিছুটা শিথিল করা যেতে পারে এবং এই শিথিলতার পরেই রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার শুরু করা যেতে পারে। তবে একজন সাধারন নাগরিক হিসেবে জরুরী অবস্থা থাকাকে দুর্ভাগ্যজনক এবং লজ্জার বিষয় উল্লেখ করে শিপা হাফিজা বলেন জনগন এই অবস্থা অবসানের একটি সময়সীমা জানতে চায় এবং সেই সময়ের মধ্যে কি কি পরিবর্তন আসবে সেটাও জানাতে হবে। এ বিষয়ে দর্শকদের মতামত জানতে চাওয়া হলে প্রায় ৭০ শতাংশ দর্শক হাত তুলে জরুরী অবস্থা জারি থাকার পক্ষে মত দেন। পরের প্রশ্ন করেন তুষার কান্তি মোদক। তিনি জানতে চান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ কিছুদুর এগিয়েই আবার থেমে যাচ্ছ কেন? এপ্রসঙ্গে তিনি তাঁর এলাকার হকার এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ আনেন। ড. চৌধুরী এসময় বলেন তিনি এখানে পরিকল্পনার অভাব দেখতে পাচ্ছেন। তিনি জানান এসব উচ্ছেদ, বিশেষ করে হকার উচ্ছেদের আগে বিকল্প চিন্তা করা হয়নি। দর্শকদের একজন জানান তিনি মনে করেন সরকার সবকাজেই হেচোট খাচ্ছে। সেই সাথে তিনি জানান যে দলীয় সংস্কারের অর্থ এই না যে দলের নেতৃস্থানীয়দের সরিয়ে দিতে হবে। অন্য একজন দর্শকও একই মত প্রকাশ করে বলেন সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই দ্রব্যমুল্য নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করেছিল কিন্তু তাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। অন্য এক দর্শক এই ব্যর্থতার জন্য পরিকল্পনার অভাবকেই দায়ী করেন। অন্য এক দর্শক এতে যোগ দিয়ে বলেন রাজনৈতিক দলগুলো যদি সাহায্য করে তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এভাবে ব্যর্থ হতে হবে না। মি. শহিদ বলেন যদি পরিকল্পনা এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে যদি এই কাজগুলো সরকার করতে পারে তাহলে এমন সমস্যা আর থাকবে না। মি. মবিন চৌধুরীও জানান সরকারের কাজে পরিকল্পনার অভাব তিনি দেখতে পাচ্ছেন। তিনি মনে করেন সরকার একই সাথে অনেকগুলো কাজে হাত দিয়ে ফেলেছে আর সেই কারনেই কোনটাই শেষ হচ্ছে না।
তবে শিপা হাফিজা মনে করেন সরকারের প্রথম সীমাবদ্ধতা হলো তারা জনগনের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারেনি। তিনি বলেন রাতারাতি সব বদলে ফেলা যাবে এমনটা আশা করা ঠিক হয়নি। তিনি বলেন পরিবর্তনের জন্য সাধারন মানুষের কথা শুনতে হবে এবং তাদের কাছে যেতে হবে। পরের প্রশ্ন করেন আফরোজা আক্তার পলি। তিনি জানতে চান সারাদেশে প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ না করে শুধুমাত্র হবিগঞ্জে এটি বন্ধ করা কতটা যুক্তিযুক্ত? ড. চৌধুরী এর উত্তরে বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি দুর্বলতা তুলে ধরে বলে এখন জ্ঞানার্জন শুধু পরীক্ষা পাশের জন্যই হয়, এটি কোনভাবেই ভালো লক্ষন না। তিনি হবিগঞ্জে প্রাইভেট টিউশনী বন্ধ করাকে একটি ভালো লক্ষন বলেই মনে করেন বলে জানান। শিপা হাফিজাও এমনটা মনে করেন। তবে সেই সাথে তিনি বলেন আপাতত শিক্ষার এই ব্যবস্থাকে কঠিন বলে মনে হলেও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য এটি ভালো ফলাফল বয়ে আনবে। তিনি মনে করেন সারাদেশেও এই প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করা উচিত। এসময় আমন্ত্রিত দর্শকদের মাঝে একজন শিক্ষক উঠে দাড়িয়ে বলেন ‘আমরা শিক্ষকরা বানিজ্যিক হয়ে উঠছি’। তিনি মনে করেন হবিগঞ্জে যে মহৎ কাজটি শুরু হয়েছে সেটি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া উচিত। একজন শিক্ষার্থী এতে দ্বিমত পোষন করে বলেন একটি বিভাগে যদি ১০ জন শিক্ষক দরকার থাকে তবে বাস্তবে সেখানে থাকে মাত্র ৩-৪ জন আর তাই শিক্ষার্থীদের সঠিক শিক্ষা লাভের জন্যই প্রাইভেট পড়তে যেতে হয়। অন্য এক দর্শক এই প্রাইভেট টিউশনির ব্যবস্থাকে বৈষম্যমুলক বলে উল্লেখ করে বলেন এটি সারা দেশেই বন্ধ করা উচিত।
মি. মবিন চৌধুরী বলেন হবিগঞ্জে যে উদ্দ্যোগ নেয়া হয়েছে তা হলো স্কুল-কলেজ চলাকালীন সময়ে কেউ প্রাইভেট পড়াতে পারবে না। তিনি মনে করেন স্কুল-কলেজের সময় পেরিয়ে গেলে যদি কেউ প্রাইভেট পড়ায় বা পড়তে চায় তাহলে তাতে বাধা থাকার কথা নয়। তিনি মনে করেন প্রাইভেট টিউশনী থাকা প্রয়োজন আছে। মি. শহিদ বলেন বাংলাদেশে শিক্ষার সঠিক অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। তিনি মনে করেন দেশে একটি সঠিক শিক্ষানীতি তৈরী করে সঠিক শিক্ষাব্যবস্থা তৈরী করতে হবে তবেই এই ব্যবস্থাকে ঠিক করা সম্ভব। পরের প্রশ্ন করেন মোছাদ্দেকা আক্তার। তিনি জানতে চান বর্তমান সরকারের উপর বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপ আছে বলে জানা গেছে, সরকার কি এই চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে নাকি তাদের কাজ অব্যহত রাখবে? ড. কবির চৌধুরী মনে করেন দেশের ভবিষ্যৎ দেশের নাগরিকদেরই ঠিক করতে হবে অন্য দেশের চাপে নতি স্বীকার করে এটি চলবে না। মি. মবিন চৌধুরী মনে করেন একটি গনতান্ত্রিক দেশে বেশীদিন অগনতান্ত্রিক সরকার থাকা উচিত না। তিনি মনে করেন সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই মার্কিন সিনেটররা যৌক্তিকভাবেই একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তবে এটিকে তিনি সেই অর্থে চাপ বলে মনে করেন না। দর্শকদের একজন মনে করেন দেশ পরিচালনা করতে গেলে ভেতরে বাইরে অনেক চাপ থাকবেই তবে সে চাপকে কাটিয়ে জনগনের জন্য মঙ্গল হয় তেমন কাজই করা উচিত। আরো এক দর্শক জানান তিনি এগুলোকে চাপ বলে মনে করেন না। মি. শহিদ বলেন তিনি যেহেতু সরকারে নেই সেহেতু এগুলো চাপ কি না তা তিনি বলেতে পারছেন না। তবে তিনি মনে করেন এটি বিবেচনার দায়িত্ব সরকারেরই। তবে সরকারের উপর চাপ আদৌ আছে কি না সেটাই প্রশ্ন এমন মন্তব্য করে শিপা হাফিজা বলেন অবাধ্য তথ্য প্রবাহের যুগে সচেতন বিশ্ব তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করতেই পারে। তিনি বলেন এখন আমাদের উচিত সঠিক কাজটি করে তাদের উদ্ধেগ নিরসন করা। পরের প্রশ্ন করেন ছন্দা সরকার। তিনি জানতে চান জোড়-জবরদস্তি করে রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার করা হলে ভবিষ্যতে তারা আবার আগের অবস্থা ফিরে আসবে কি না? এপ্রসঙ্গে নিজের মন্তব্য হিসেবে তিনি বলেন জোর করে সংস্কার করা হলে তার স্থায়ীত্ব বেশিদিন থাকে না। মি. শহিদ বলেন সংস্কার সব ক্ষেত্রেই হওয়া উচিত তবে কোন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠির মানুষ দুর্নীতি করছে এমনটা ভাবাও উচিত না। আর সংস্কার দলের ভেতর থেকেই হওয়া উচিত বলেই তাঁর মত। তবে শিপা হাফিজা তাঁর কথার বিরোধীতা করে বলেন রাজনৈতিক দলগুলো জবাবদিহিতা থাকা উচিত। কারন জনগনের এবং দেশের ভালো মন্দ তারাই দেখবে। তিনি বলেন জোর করে হলেও জনগনের জন্য এই রাজনৈতিক সংস্কার দরকার। একই রকমভাবে শংকা প্রকাশ করেন ড. কবির চৌধুরী। তিনি মনে করেন রাজনীতিবিদদের আত্মার শুদ্ধি দরকার। তিনি মনে করেন এবার রাজনীতিবিদরা বড় হেচোট খেয়েছেন আ সামগ্রিকভাবে রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন ঘটার দরকার আছে। অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয় ২৭শে মে বিবিসি বাংলার ‘প্রবাহ‘ অধিবেশনে বাংলাদেশ সংলাপ প্রযোজনা করছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ | স্থানীয় লিংকস্ রাজনৈতিক দলের সংস্কার কেমন হবে?18 মে, 2007 | বিশেষ আয়োজন আবারো আলোচনায় ড: ইউনুস10 মে, 2007 | বিশেষ আয়োজন প্রশ্নের মুখে সরকার ও দলগুলো 01 মে, 2007 | বিশেষ আয়োজন নির্বাসন প্রচেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ24 এপ্রিল, 2007 | বিশেষ আয়োজন নেতৃত্বে বদল নিয়ে বিতর্ক 16 এপ্রিল, 2007 | বিশেষ আয়োজন সেনা প্রধানের মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক10 এপ্রিল, 2007 | বিশেষ আয়োজন সেনা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন03 এপ্রিল, 2007 | বিশেষ আয়োজন ক্ষমতার অন্তরালে সেনাশাসন?26 মার্চ, 2007 | বিশেষ আয়োজন | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||