|
আলোচনার কেন্দ্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
কথা ও ছবি: রাসেল মাহমুদ বিবিসি আয়োজিত বাংলাদেশ সংলাপের এবারের আয়োজন ছিল ঢাকার চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে। আয়োজনটি খুলনায় হবার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারনে এটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকাতে। দশর্ক শ্রোতাদের স্বত:স্ফুর্ত অংশগ্রহনে এবারের আয়োজন ছিল জমজমাট। প্রতিক্ষণেই তারা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করেছেন প্যানেল সদস্যদের। এদিনের প্যানেল সদস্যরা ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এবং সাবেক মন্ত্রী এম কে আনোয়ার, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মহা হিসাব নিরীক্ষক এবং নিয়ন্ত্রক এম হাফিজউদ্দিন খান এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা। বিবিসি বাংলা সার্ভিসের শাকিল আনোয়ারের উপস্থাপনায় প্যানেল সদস্যরা উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকদের প্রশ্নের ভিত্তিতে সমসমায়িক ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। অনুষ্ঠানে ঢাকার মিরপুরের রাজিয়া বেগমের প্রথম প্রশ্ন ছিলো, প্রধান উপদেষ্টার সাথে অন্য উপদেষ্টাদের যে দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা কতটা কাঙ্খিত?
উত্তরের শুরুতেই এম কে আনোয়ার বলেন দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে এমন কোন তথ্য তার জানা নেই। তবে তিনি এও যোগ করেন দুরত্ব সৃষ্টি হওয়া মোটেও কাম্য নয়। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজের বিবরন দিতে গিয়ে বলেন তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যাওয়া, নীতি নির্ধারনী কোন সিদ্ধান্ত না নেয়া এবং সেই সাথে নির্বাচন সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সাহায্য করা। এ পর্যায়ে হাত তুলে শ্রোতাদের মন্তব্য জানানোর আহবান জানানো হলে বড়জোর ১৫-২০ শতাংশ শ্রোতা এম কে আনোয়ারের সাথে একমত পোষন করেন। হাফিজউদ্দিন খান অবশ্য মনে করেন প্রধান উপদেষ্টার সাথে অন্য উপদেষ্টাদের দুরত্ব অবশ্যই সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন উপদেষ্টাদের সবাইকে নিয়েই তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং এখানে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেবেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া প্রসঙ্গে মি. আনোয়ারের কথার সাথে দ্বিমত পোষন করে হাফিজউদ্দিন খান বলেন সংবিধানেই আছে প্রয়োজনে তারা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এ প্রসঙ্গে পাঁচ জন উপদেষ্টার অফিসে না যাওয়াকে উদাহরন হিসেবে দেখিয়ে মি. হাফিজ বলেন দুরত্ব অবশ্যই সৃষ্টি হয়েছে এবং তা নির্বাচনের জন্য হুমকি। শ্রোতাদের একজন এসময় বলেন প্রায় একমাস হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিলেও নির্বাচনের প্রস্তুতি এগোয়নি। এভাবে চলতে থাকলে নির্বাচন হবে কি না এমন সংশয়ও প্রকাশ করেন তিনি। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন থেকে আসা সিরাজুল ইসলাম বলেন, তার মনে হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মাঝে বিভেদ অবশ্যই তৈরী হয়েছে এবং সেই সাথে তিনি মন্তব্য করেন পর্দার আড়ালে থেকে বাংলাদেশ শাসন করা হচ্ছে।
সুবর্ণা মুস্তাফাও মনে করেন তাদের মাঝে অবশ্যই দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে যা কখনোই কাম্য নয়। তিনি মন্তব্য করেন ২৬ দিন পার হয়ে গেছে অথচ নির্বাচনের ব্যপারে কিছুই করা হয়নি। কাজী জাফরউল্লাহ বলেন দিন দিন প্রধান উপদেষ্টার সাথে অন্য উপদেষ্টাদের দুরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন উপদেষ্টাদের পাশ কাটিয়ে একের পর এক সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান একাই নিচ্ছেন। তিনি বলেন প্রধান উপদেষ্টা এভাবে সংবিধান লংঘন করছেন। পরের প্রশ্ন ছিলো ভোটার তালিকা নিয়ে। মানিকনগর ঢাকা থেকে আসা মো. মাসুদুল আলম প্রশ্ন করেন, কথিত ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকা দিয়ে ৯০ দিনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে নির্বাচন করাটা কতটা সম্ভব হবে। তবে তিনি সেই সাথে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য খুবই কম সময় রয়েছে। মি. জাফরউল্লাহ বলেন সৎ উদ্দেশ্য থাকলে ১৫ দিনের মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করা সম্ভব। তিনি মনে করিয়ে দেন ভোটার তালিকাকে সঠিক না করে তফসিল ঘোষনা করা সংবিধান পরিপন্থী হবে। এ ব্যাপারে শ্রোতাদের একজন বলেন সদিচ্ছা থাকলে বেশি মানুষ নিয়োগ করে এই সময়ের মধ্যেই ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা সম্ভব। তবে তিনি সেই সদিচ্ছাটা সরকারেরর কারো মধ্যে দেখতে পাচ্ছেন না বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একজন মহিলা দর্শক বলেন অপারেশন ক্লিন হার্ট এর সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত অস্থায়ী সিইসির বাসা থেকে যখন অস্ত্র উদ্ধান করা হয়েছে তখন কিভাবে তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায়? সুবর্ণা মুস্তাফা প্রশ্ন তোলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত সিইসি বলে সংবিধানে কোন ব্যবস্থা আছে কি না? ভোটার তালিকায় ভুল দেখিয়ে দিলে তা শুধরে দেবেন বলে ভারপ্রাপ্ত সিইসি যে মন্তব্য করেছন সে প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন ভুল খোজার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, জনগনের নয়।
এম কে আনোয়ার বলেন এর আগের আটটি ভোটার তালিকার মতো করেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে এবারের ভোটার তালিকা তৈরী করার উদ্যোগ নেয়া হলেও আদালতে মামলার কারনে তা সম্ভব হয়নি। তিনি দাবী করেন আদালতের নির্দেশনা অনুসারেই ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। তিনি বলেন এর আগের ধারাবাহিকতার মতোই এবারো ২৪ শতাংশ ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে ২০০১ সালের তালিকায় সেই বৃদ্ধির হার ছিলো ৩২ শতাংশ। এম কে আনোয়ার বলেন এখন হালনাগাদ করতে হলে ভোটারকেই নির্বাচন কমিশনে যেতে হবে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আর বাড়ি বাড়ি যাবার কোন সুযোগ নেই। সুবর্ণা মুস্তাফা এসময় মন্তব্য করেন জনগন নিজ থেকে সেই উদ্যোগ নেবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। মিরপুর থেকে আসা অর্ণব চৌধুরী প্রশ্ন করেন, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে নির্বাচন কমিশন সংস্কার করেছে তাতে আমরা কি একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করতে পারি? কাজী জাফরউল্লাহ নেতিবাচক উত্তর দিয়ে বলেন ভোটার তালিকা হালনাগাদ সহ এই কমিশনের সংস্কার ছাড়া নির্বাচনী তইসল ঘোষনা হলে আওয়ামী লীগ তা মানবে না। এম কে আনোয়ার বলেন, আওয়ামী লীগ একের পর এক, তার ভাষায়, অযৌক্তিক দাবী তুলে নির্বাচনকে অনিশ্চত করে তুলেছ। কে এম হাসান এবং আব্দুল আজীজ সরে যাবার পরেও আওয়ামী লীগ আবার নতুন নতুন দাবী নিয়ে হাজির হচ্ছে। শ্রোতাদের একজন, হাফিজুর রহমান, মন্তব্য করেন শুধুমাত্র রাজনীতির কারনে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বর্জনের আহবান জানান। হাফিজউদ্দিন খান বলেন সংবিধানের কোথাও ভারপ্রাপ্ত সিইসি বলে কিছু নেই। তিনি বলেন নতুন যিনি এসেছেন তার কথাবার্তা শুনে তার মনে হয়েছে তিনি এই দায়িত্বের জন্য যথেষ্ট যোগ্য নন। তিনি বলেন বাংলাদেশে বিচারপতিদের সিইসি হিসেবে নিয়োগ দেয়ার যে ধারা তৈরী হয়েছে তা তার পরিনতি ভালো হয়নি। তিনি মন্তব্য করেন প্রশাসনের লোকজনই এ দায়িত্বে আরো কার্যকরী হবেন। মগবাজার ঢাকা থেকে জান্নাতুন নাঈমা, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন করেন ‘আমরা কি কখনোই বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের মুখোমুখি সৌহার্দপুর্ণ অবস্থান দেখতে পাব না?’
কাজী জাফরউল্লাহ বলেন তারাও এমনটা চান কিন্তু বিভিন্ন কারনে তা আর হয়ে ওঠে না। এ প্রসঙ্গে ২১শে আগষ্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন। হাফিজ উদ্দিন খান বলেন রাজনীতিবিদদের মাঝে এমন উদ্যোগ কেউ কখনোই নেয় না। নেতা-নেত্রীদের মাঝে বিদ্যমান বিদ্বেষের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন সম্প্রতি স্বশস্ত্র বাহিনী দিবসে দুই নেত্রীর দেখা হলেও তারা কোন সাধারন সৌজন্য বিনিময়ও করেননি। শ্রোতাদের একজন বলেন নেতা-নেত্রীদের দায়িত্বশীল আচরন না করায় জনগন বারবার আশাহত হচ্ছে। এমকে আনোয়ার স্বীকার করেন রাজনীতিবিদদের মাঝে সুসম্পর্ক থাকা খুবই গুরুত্বপুর্ণ তবে তার জন্য সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সুবর্ণা মুস্তাফা বলেন রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আমুল বদলাতে হবে। তিনি এপ্রসঙ্গে শিক্ষিত তরুনদের রাজনীতিতে আসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। মাকসুদা পারভীন সোমা, জিনিস পত্রের দাম বাড়ার জন্য সাবেক প্রধানন্ত্রীর মিডিয়াকে দায়ী করার কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন করেন এটা কতটা সত্য? এম কে আনোয়ার বলেন, একটি টিভি চ্যানেলে তিনি দেখেছেন দুই বাজারে দুই রকম দাম দেখানো হচ্ছে। তিনি বলেন দাম বাড়ছে এধরনের ধারনা দেয়ার ক্ষেত্রে মিডিয়ার একটি দায় অবশ্যই রয়েছে। এসময় দর্শকদের অনেকই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। সুবর্ণা মুস্তফা বলেন রোজার সময় বেগুনের কেজি ৮০ টাকা ছিলো। ভোক্তা হিসেবে হাফিজউদ্দিন খান বলেন দাম অবশ্যই বেড়েছে এবং এজন্য কোনভাবেই মিডিয়াকে দায়ী করা যায় না। শ্রোতাদের একজন বলেন সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রতিটি বাজারে দাম নির্দিষ্ট করে দেয়ার কথা। তিনি মন্তব্য করেন নির্ধারিত জায়গায় আলু পটল বেগুনের নাম লেখা থাকলেও দাম আর লেখা হয় না।
কাজী জাফরউল্লাহ বলেন সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ‘এ জন্য দায়ী হাওয়া ভবন’। তিনি বলেন এখানে মিডিয়াকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এমকে আনোয়ার বলেন সিন্ডিকেটের কথা অনেকেই বলেন কিন্তু এখনও পর্যন্ত কেউ কোন প্রমান দেখাতে পারেননি। দুটো রাজনৈতিক দলই বার বার বলে জনগনের জন্যই তারা সব কিছু করছে এমন মন্তব্য করে মো. রাহাত আজিম প্রশ্ন করেন ‘এই জনগন কারা?’ কাজী জাফরউল্লাহ বলেন রাজনৈতিক দলগুলো দেশের জনগনের স্বার্থেই কাজ করে। তিনি বলেন কোন কোন রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত অসংলগ্নতার কারনে ঢালাও অভিযোগ সঠিক নয়। সুবর্ণা মুস্তাফা বলেন প্রফেসর ইউনুস যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন তখন জনগনের আনন্দ মিছিল ছিলো স্বতস্ফুর্ত, সাংবাদিক মানিক সাহার হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে খুলনার হরতালে স্বতস্ফুর্ত জনগন ছিলো। শ্রোতাদের একজন এসময় বলেন এক লক্ষ লোক নিয়ে পল্টনে সমাবেশ করলেই সারা বাংলাদেশ যে তাদের সাথে আছে এই ধারনা থেকে রাজনীতিবিদদের বেরিয়ে আসতে হবে। অন্য এক দর্শক বলেন অবরোধ, হরতালে সাধারন জনগনের কোন প্রাপ্তি নেই। মি. হাফিজউদ্দিন বলেন অবরোধ, হরতাল আন্দোলনের অন্য অনেক বিকল্প রাস্তা আছে। তিনি বলেন আওয়ামী লীগ নির্বাচন বয়কটের হুমকি দিতে পারতো। এসময় সুবর্ণা মুস্তাফা বলেন নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করা যেত অথবা সিইসির বাসা অবরোধ করা যেত। এমকে আনোয়ার বলেন রাজপথে নয় বরং নির্বাচনের ভেতর দিয়েই রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা যাচাই করা উচিত। অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয় ২৬ শে নভেম্বর বিবিসি বাংলার ‘প্রবাহ‘ অধিবেশনে বাংলাদেশ সংলাপ প্রজোযনা করছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ | স্থানীয় লিংকস্ রাজনীতির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন20 নভেম্বর, 2006 | বিশেষ আয়োজন রাজনৈতিক অস্থিরতায় উদ্বেগ 13 নভেম্বর, 2006 | Lei আলোচনার কেন্দ্রে নির্বাচন কমিশন06 নভেম্বর, 2006 | বিশেষ আয়োজন | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||