|
রাজনীতির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
বিবিসি বাংলা আয়োজিত "বাংলাদেশ সংলাপ" এর ১০ম পর্ব অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহীতে। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্যানেল সদস্যরা ছিলেন বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, কানসাটে বিদ্যুৎ আন্দোলনের নেতা গোলাম রব্বানী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শওকত আরা এবং রাজশাহী জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক এ কে এম মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে প্যানেল সদস্য হিসেবে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনু'র উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও শেষ মুহুর্তে তিনি আসতে অপারগতা প্রকাশ করায় পরিবর্তে মিজানুর রহমান অংশগ্রহণ করেন। বিবিসি বাংলা সার্ভিসের শাকিল আনোয়ারের উপস্থাপনায় প্যানেল সদস্যরা সম-সাময়িক ঘটনাবলী নিয়ে শ্রোতা-দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন রাজশাহীর একজন ব্যাংকার ফারহানা খাতুন। তার প্রশ্ন ছিল '১৪ দল বলছে সিইসি পরিবর্তন জনগনের দাবী, চার দল বলছে গত সংসদ নির্বাচনে ১৪ দল মাত্র ৬০ টি আসন পেয়েছিলো তাহলে সিইসি পরিবর্তন কিভাবে জনগনের দাবী হয়?'
উত্তরে ফজলে হোসেন বাদশা বলেন তিনি মনে করেন দেশের অধিকাংশ জনগন এখন এই সিইসির অপসারন চাইছে। একইসাথে তিনি বলেন তাদের দাবী শুধুমাত্র সিইসি পরিবর্তন নয়, একইসাথে তারা চান নির্বাচন কমিশনের আমূল সংস্কার। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের অধীনে এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনই তাদের মূল দাবী। অধ্যাপক শওকত আরা মন্তব্য করেন বর্তমান সি ই সি পরিবর্তন করলে যে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরী হবে, তার সামাধান কিভাবে হবে সে ব্যাপারে তিনি ১৪-দলের কাছ থেকে কিছু শুনছেন না । গোলাম রব্বানী বলেন যে সমস্ত ইস্যু নিয়ে ১৪ দল আন্দোলন করছে সেগুলোকে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গ্রহণ করেন এবং সমর্থন জানায় তাহলে অবশ্যই তাকে জনগনের দাবী বলা যাবে। এসময় দর্শকদের একজন বলেন ১৪ দলের মাত্র একটি দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে যেক'টি আসনই পাক না কেন তারা মোট ভোটের ৪০.৫৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে অন্যদিকে চারদলীয় জোট পেয়েছে ৪৬ শতাংশ। তিনি প্রশ্ন করেন, তাহলে কি ধরে নেয়া হবে যে বাকী ৫৪ শতাংশ ভোটার এ দাবীর পক্ষে আছে? মিজানুর রহমান বলেন একজন ব্যক্তিকে পরিবর্তন করলে সব সমস্যার সমাধান হবে না। অধিকাংশ জনগনের মতামত মাপার উপায় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ন প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরী করেন তাদের অবসর গ্রহনের পরে রাজনীতি করার সুযোগ বন্ধ করা যায় কি না এমন প্রশ্ন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মো: মহিউদ্দিন। ড. শওকত আরা বলেন অবসর গ্রহনের পর সরকারী কর্মচারীদের রাজনীতি করার অধিকার থাকা উচিৎ। একই মত প্রকাশ করে গোলাম রব্বানী বলেন অবসর গ্রহনের পর রাজনীতি করার অধিকার হরণ করা ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপের সামিল হবে। প্রশ্নকর্তা বলেন রাজনীতি করার জন্য অনেক সরকারী কর্মকর্তা একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরীর চেষ্টা করেন, আর সেটাই সেই কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে ফেলে। অন্য এক দর্শক এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালগুলিতে শিক্ষক রাজনীতির প্রসঙ্গও তোলেন। শওকত আরা মন্তব্য করেন রাজনীতি সচেতনতা ভালো তবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িত থাকাটা তিনি সমর্থন করেন না। ফজলে হোসেন বাদশা অবশ্য সরকারী চাকরী থেকে অবসর গ্রহনের পর রাজনীতিতে আসাকে মোটেও সমর্থন করেন না বলে জানালেন। অবসর গ্রহনের পর অন্তত পাঁচ বছর তাদের রাজনৈতিক দলের সদস্য না হওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করে তিনি। মি. বাদশা মন্তব্য করেন সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয়ার পরপরই কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সংসদ সদস্যপদের জন্য নির্বাচনে অংশ নেয়াটা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকী।
মিজানুর রহমান বলেন চাকরী থেকে অবসর গ্রহনের পর সরকারী কর্মচারীদের অনেকের মধ্যে ক্ষমতা ও সুবিধের জন্য রাজনীতিতে অংশ নেয়ার প্রবনতা রয়েছে। এসময় শ্রোতা-দর্শকদের কাছে এ ব্যাপারে ভোট নেয়া হলে দেখা যায় উপস্থিত প্রায় দুশো দর্শকের মাঝে মাত্র চার জন সরকারী কর্মকর্তাদের অবসর গ্রহনের পর রাজনীতি করাকে সমর্থন করেন। পরের প্রশ্ন করেন সাজেদা বেগম। কানসাট বাসী আন্দোলন করে দাবী আদায় করে নিয়েছে এ মন্তব্য করে তিনি প্রশ্ন করেন সব ক্ষেত্রেই কি জনগনই আন্দোলন করে দাবী আদায় করবে? এ প্রসঙ্গে মিজানুর রহমান বলেন জনগনের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদেরই মূখ্য ভূমিকা রাখতে হবে। অন্যদিকে মি. বাদশা মনে করেন সরকার যদি জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেয় তাহলে দাবী উত্থাপন করা হলেই তা বাস্তবায়ন সম্ভব এবং সেক্ষেত্রে আন্দোলন করারই কোন দরকার নেই। একজন দর্শক এসময় বলেন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত গনআন্দোলন ছাড়া কোন দাবী আদায় হয়নি। গোলাম রব্বানী বলেন নির্বাচনের সময় নেতারা জনগনকে যেসব আশ্বাস দেয় ক্ষমতায় গেলে তা ভুলে যায়। সেক্ষেত্রে আন্দোলন না করে দাবী আদায় করা যায় না বলেই তিনি মনে করেন। ড. শওকত আরা মন্তব্য করেন বাংলাদেশে সৎ রাজনীতিবিদ এ মুহুর্তে খুবই দরকার।
গ্রেটার রোড, রাজশাহী থেকে আসা আশরাফ হোসেন নবাব-এর প্রশ্ন ছিলো, রাজশাহীতে জঙ্গীরা প্রশাসনের কথিত সহায়তায় যে নির্মম হত্যা ও অত্যাচার করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিলো তা প্রমান হওয়া সত্ত্বেও অভিযুক্তদের কোন প্রকার বিচার হলো না কেন? মিজানুর রহমান বলেন কোন কিছুর বিচার চাইতে হলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করে মামলা করতে হবে। তিনি প্রশ্ন করেন বিচার না চাইলে বিচার কিভাবে হবে? এ প্রসঙ্গে মি. বাদশা বলেন সরকারের মাঝে স্বচ্ছতা ছিলোনা বলেই জঙ্গীবাদের বিচার হয়নি। তিনি বলেন সরকারই যদি জঙ্গীবাদ লালন করে তাহলে এর বিচার করবে কে? তিনি অভিযোগ করেন যারা জঙ্গীবাদের শিকার হয়েছিলো তারা এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতেই পারেনি, থানায় তাদের মামলা নেয়া হয়নি, এমনকি জঙ্গীবাদের শিকার অনেকেই পরবর্তীতে পুলিশী হয়রানীর শিকার হয়েছে। মিজানুর রহমান বলেন বিচার চাওয়ার জন্য থানাই তো শেষ জায়গা নয়, আদালতেও বিচার চাওয়া যেতে পারে। এসময় তার কথার বিরোধীতা করেন মি. বাদশা বলেন এক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। গোলাম রব্বানী বলেন অপরাধী এবং তার সহায়তাকারী দুপক্ষেরই সাজা হওয়া উচিত। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শামীম আনোয়ার প্রশ্ন করেন, কোন দলের জয় পরাজয়ে কি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কোন প্রভাব থাকে? যদি থাকে তবে তা কি ধরনের? আর যদি না থাকে তবে তাকে নিয়ে এতো টানা হেঁচড়া কেন? তার প্রশ্নের উত্তরে মি. বাদশা বলেন সিইসি প্রথম থেকে যে সব কার্যক্রম চালিয়েছেন তা সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সহায়ক ছিলো না। তিনি অভিযোগ করেন সিইসি আদালতের রায়ের বিপক্ষে কাজ করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে সত্য না বলার অভিযোগ আছে। শ্রোতাদের একজন বলেন জনগন আসলে কি চায় তা রাজনীতিবিদরা শুনছেন না। অন্য এক দর্শক বলেন কম হোক বেশী হোক জনগন তার উপর আস্থা হারিয়েছে সুতরাং তার পদত্যাগ করা উচিত।
রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারন মানুষের শ্রদ্ধা কমে যাচ্ছে মন্তব্য করে তোফাজ্জল হোসেন প্রশ্ন করেন, এ থেকে উত্তরনের উপায় কি? মিজানুর রহমান বলেন রাজনীতিবিদরা স্বচ্ছ নয় বলে জনগনের আস্থা হারাচ্ছেন। তিনি বলেন 'আমরা সবাই যদি স্বচ্ছ হতাম এবং জনগনের কথা চিন্তা করতাম তাহলে জনগন আমাদের ভালোবাসতো'। ফজলে হোসেন বাদশাও বলেন রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে বিভিন্নভাবে। তিনি বলে অসৎ ব্যক্তিদের রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে বাধা দিতে হবে। শ্রোতাদের একজন মন্তব্য করেন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের প্রতি শ্রদ্ধা কমছে না বরং বলা যায় ঘৃনা তীব্রতর হচ্ছে। অন্য এক দর্শক বলেন রাজনীতিবিদদের আরো বেশি জনগনের কাছাকাছি যেতে হবে। শওকত আরা বলেন শুধুমাত্র রাজনীতিবিদদের গালাগাল দিলেই হবে না বরং ভোটারদের আরো সচেতন হতে হবে। ভোটাররা যদি দুর্নীতিবাজ কিংবা কালো টাকার মালিক এধরনের কাউকে ভোট না দেয় তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। গোলাম রব্বানী বলেন রাজনীতিবিদরা সবসময় ক্ষমতায় যাবার পর জনগনকে ভুলে যায়। সে কারনে জনগন রাজনীতিবিদদের প্রতি জনসাধারনের বিশ্বাস কমছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয় ১৯শে নভেম্বর বিবিসি বাংলার ‘প্রবাহ‘ অধিবেশনে বাংলাদেশ সংলাপ প্রজোযনা করছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ | স্থানীয় লিংকস্ রাজনৈতিক অস্থিরতায় উদ্বেগ 13 নভেম্বর, 2006 | Lei আলোচনার কেন্দ্রে নির্বাচন কমিশন06 নভেম্বর, 2006 | বিশেষ আয়োজন | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||