|
আলোচনার কেন্দ্রে নির্বাচন কমিশন | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
কথা এবং ছবি: রাসেল মাহমুদ বিবিসি বাংলা আয়োজিত "বাংলাদেশ সংলাপ" এর অষ্টম পর্বের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্যানেল সদস্যরা ছিলেন বিএনপি'র শীর্ষস্থানীয় নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ১৯৯৬ ও ২০০১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী এবং ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং এলায়েন্স (ফেমা)-এর প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত দর্শকরা সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনাবলী নিয়ে প্যানেল সদস্যদের কাছে প্রশ্ন রাখেন। এবারের সংলাপ অনুষ্ঠানের পুরোটা জুড়েই ছিলো আসন্ন নির্বাচন নিয়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে দর্শকদের প্রশ্ন। আমন্ত্রিত দর্শকদের অধিকাংশই ছিলেন বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ২৮ ও ৩০শে অক্টোবরের সহিংসতা, ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং আসন্ন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন এবং মন্তব্য করেন। এবারের অনুষ্ঠানে উপস্থাপক হিসেবে ছিলেন বিবিসি বাংলা বিভাগের প্রযোজক শাকিল আনোয়ার। প্রথম প্রশ্ন করেন সবুজবাগ ঢাকা থেকে আসা হানিফ মজুমদার। তার প্রশ্ন ছিলো, বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন পুর্নগঠন করলে অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে কি না?
এ প্রশ্নের উত্তরে মুনীরা খান এবং শেখ ফজলুল করিম সেলিম দুজনেই বলেন নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে হলে নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছ ও বিতর্কের উর্দ্ধে থাকতে হবে। সেই সাথে থাকতে হবে সঠিক ভোটার লিস্ট। মুনীরা খান বলেন এগুলো করতে ব্যর্থ হলে সেই কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে রাজনৈতিক দলগুলো এবং জনগন মেনে নেবে না। মি. সেলিম বলেন এ সব দিক খেয়ালে রেখে নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করা হলে তবেই নির্বাচন অবাধ এবং গ্রহণযোগ্য হতে পারে। আব্দুল্লাহ আল নোমান অবশ্য বলেন, নির্বাচনে নিরপেক্ষতার গ্যারান্টি দিতে পারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাঁর মতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সিদ্ধান্ত নেবে কিভাবে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে তারা নির্বাচন করাবেন। এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে এক দর্শক মন্তব্য করেন, এ কথা শুনে তার মনে হচ্ছে মি. নোমান বলতে চাইছেন বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে দিয়েই তারা নির্বাচন করাবেন। অন্য এক দর্শক বলেন, কমিশন গঠনের সময় অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়ে তা করলে এমন সমস্যা কখনোই হতো না। প্রশ্নকর্তা এসময় তার প্রশ্নের সম্পূরক হিসেবে ছয়টি বিষয় তুলে ধরেন। প্রথমত: নির্বাহী বিভাগ থেকে নির্বাচন কমিশনকে আলাদা করা, দ্বিতীয়ত: সব নাগরিকের জন্য ভোটার আইডি কার্ড দেয়া, তৃতীয়ত: স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের ব্যবস্থা করা, চতুর্থত: কেন্দ্রেই ফলাফল ঘোষনা করাকে বাধ্যতামূলক করা, পঞ্চমত: বিচার বিভাগকে স্বাধীনতা দেয়া, ষষ্ঠত: প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দল গুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। এসময় সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী মনে করিয়ে দেন যে সবাই সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা ভুলে যাচ্ছেন। তার মতে সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ না থাকলে কোনভাবেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে পারবে না।
পরের প্রশ্ন করেন রামপুরা ঢাকা থেকে আসা জয়নাল আবেদীন। তার প্রশ্ন ছিলো রাষ্ট্রপতির অনুরোধ স্বত্বেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার যদি সংবিধানের দোহাই দিয়ে পদত্যাগ না করেন তাহলে দেশের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সেরকম পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ করাই বাঞ্ছনীয় বলে মনে করেন মি. নোমান। তবে তিনি সেই সাথে এও মনে করেন সিইসি যদি পদত্যাগ নাও করেন তাতেও নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করা উচিত হবে না। মি. সেলিম বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই নিজেকে বিতর্কিত করেছেন, কোর্টের আদেশ মানেন নি। সেসময় ভোটার লিস্ট তৈরী করতে গিয়ে সিইসি ৬২ কোটি টাকা নষ্ট করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে নির্বাচন করালেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? যে নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না তা করে কি লাভ এমন প্রশ্নও রাখেন তিনি। মি. সেলিম এর আগে অন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের পদত্যাগের উদাহরণ টেনে বলেন বর্তমান কমিশনার তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁকে এখন আর জনগণ চায় না, তাই তাঁর পদত্যাগ করা উচিত। মুনীরা খান তাঁর নিজের উদ্বেগের কথা জানান। তাঁর মতে সাংবিধানিক পদে কারো দায়িত্ব নেয়ার অর্থ হলো তাকে সততার সাথে কাজ করতে হবে, সেই সাথে জনগণের মতামতকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর মতে ভোটার তালিকা তৈরী করার সময়ই সিইসি জনগণের আস্থা হারিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন জনগণ এই ভোটার তালিকার কারণে যে সমস্যার মুখে পড়েছে তা তিনি নিজের বিচার বুদ্ধি দিয়ে দ্রুত নিরসন করবেন।
এসময় উপস্থাপক শাকিল আনোয়ার উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের কাছে জানতে চান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ করা নিয়ে তাদের বক্তব্য কি ? কণ্ঠ ভোটের মাধ্যমে এবং হাত তুলে প্রায় ৭০ শতাংশ দর্শক জানান তারা মনে করেন সিইসির সরে যাওয়া উচিত। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী এসময় বলেন, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় যদি সকাল বিকাল ফোন করে সিইসিকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করেন তাহলে নিশ্চয়ই তিনি বিব্রত বোধ করে পদত্যাগ করবেন। পরের প্রশ্ন করেন মগবাজার ঢাকা থেকে আসা শামীমা আলম বানু। তার প্রশ্ন ছিলো ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে সারাদেশে যে সহিংস ঘটনা ঘটেছে তার জন্য জনগন কাকে দায়ী করবে? উত্তরে শেখ সেলিম বলেন তাদের কর্মসুচীকে প্রতিহত করতে চারদলীয় জোটের পক্ষ থেকে অস্ত্র হাতে যাদের নামিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের জনগণ দেখেছে। তিনি বলেন ১৪ দল কারো উপর আক্রমন করতে চায়নি। তিনি বলেন জনগণই নির্ধারন করবে কাদের দায়ী করা যায়। মি. সেলিম বলেন ১৪দলীয় জোটের কোন নেতাকর্মীর হাতে অস্ত্র ছিলো না, তাদের হাতে ছিলো লাঠি-বৈঠা। তিনি প্রশ্ন করেন সেখানে অস্ত্র এলো কোথা থেকে? মি. নোমান অবশ্য বলেন, ঐ ঘটনায় কারা দায়ী তা জনগন নির্ধারন করে ফেলেছে। কানসাটের বিদ্যুৎ নিয়ে আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে মি. নোমান বলেন, সেখানে জনগণের সম্পৃক্ততা ছিলো, কিন্তু ১৪ দলের বর্তমান আন্দোলনে জনগণ নেই।
অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে এক দর্শক মন্তব্য করেন বিচারপতি কে এম হাসান এর প্রধান উপদেষ্টা হবার বিষয়টি নিয়ে যেভাবে হানাহানি হলো তাতে ভবিষ্যতে রাজনীতিবিদদের কাউকে আর বিশ্বাস করা কঠিন হবে। হাততালি দিয়ে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা স্বাগত জানান এ বক্তব্যকে। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী এসময় বলেন প্রশাসন নিয়ে কেউ কোন কথা বলেনি। তিনি প্রশ্ন রাখেন সে সময় তো একটা সরকার ছিলো। তিনি আরো প্রশ্ন তোলেন সে ঘটনার সময় পুলিশ নীরব দর্শকের মতো দাড়িয়ে ছিলো কেন? ভোটার তালিকা নিয়ে পরের প্রশ্ন করেন খিলগাঁও থেকে আসা মোস্তাফিয়া বেগম। তিনি প্রশ্ন করেন সাধারন মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়া ভোটার তালিকার সুষ্ঠু সংস্কার করার সুযোগ এখনো আছে কি না? মুনীরা খান এক কথায় বলেন আছে। সেই সাথে তিনি যোগ করেন ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে যদি সাত দিন লাগে তবে সেই তালিকা সংস্কার করতেও বেশিদিন লাগবে না। মি. নোমান বলেন নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তিনি বলেন এখন সবাই অনেক সচেতন, তাই চাইলেই কাউকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া সম্ভব না। এসময় উপস্থাপক উপস্থিত দর্শকদের কাছে জানতে চান ভোটার তালিকায় কাদের নাম নেই। প্রায় ২০ শতাংশ দর্শক হাত তুলে জানান তারা ভোটার নন। অনেকেই বলেন তাদের কাছে তালিকা তৈরীর সময় কেউ যায়নি। মি. সেলিম তাদের নিজস্ব পরিসংখ্যান থেকে জানান বর্তমান ভোটার তালিকায় প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ভুয়া ভোটার আছে এবং প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। তিনি বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী যদি চেষ্টা করা হয় তবে এখনো ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা সম্ভব। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর দশ উপদেষ্টা নিয়োগ করতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে নাম নিয়েছেন এই মন্তব্য করে ঢাকার বাবু আহমেদ প্রশ্ন রাখেন এটি কতখানি সাংবিধানিক হয়েছে? এতে উপদেষ্টাদের নিরপেক্ষতা কতখনি নিশ্চিত হবে এমন প্রশ্নও করেন তিনি। মঞ্জুর এলাহী বলেন অবশ্যই এটি সাংবিধানিক হয়নি। তিনি জানান সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে প্রধান উপদেষ্টা নিজের মতো করেই অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগ করবেন। মি. সেলিম বলেন প্রধান উপদেষ্টা তাদের কাছ থেকে নাম চেয়েছেন বলেই তারা নাম পাঠিয়েছেন। এদিকে মি. নোমান প্রথমে এ বিষয়ে কোন মন্তব্য না করতে চাইলেও পরে বলেন আওয়ামী লীগের মতোই তারাও প্রধান উপদেষ্টাকে অন্য উপদেষ্টা নিয়োগের ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন।
সিইসি'র পদত্যাগের দাবী এবং ১২ ই নভেম্বর থেকে ১৪ দলের দেয়া অবরোধ কর্মসূচী দেশকে কোন্ দিকে নিয়ে যাবে এমন প্রশ্ন করেন নুসরাত ইয়াসমিন শোভা। শেখ সেলিম বলেন সিইসি পদত্যাগ করলেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আর সিইসি পদত্যাগ না করলে কি হবে তা ভবিষ্যতেই বোঝা যাবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন প্রধান উপদেষ্টা তো এখনো সিইসিকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করেননি। তিনি আশা প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা যদি অনুরোধ করেন তবে নিশ্চয়ই তিনি বিব্রত হয়ে পদত্যাগ করবেন। মুনীরা খান এসময় বলেন যদি সিইসি পদত্যাগ না করেন তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উচিত হবে এর সমাধান করা৻ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা, আর তার জন্য যা যা করা দরকার তা তাদের করা উচিত। এসময় এক দর্শক মন্তব্য করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি কোন নীতি নির্ধারনী সিদ্ধান্ত না নিতে পারে, তাহলে তারা কিভাবে নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন? মি. নোমান স্বীকার করেন এখানে অনেক দুর্বলতা আছে, তবে তিনি এও বলেন সেসব দুর্বলতা রাতারাতি ঠিক করা যাবে না। তিনি বলেন নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে আর সে জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপর আস্থা রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়েছে ৫ই নভেম্বর বিবিসি বাংলার সান্ধ্য অধিবেশনে৻ এই ধারাবাহিক আয়োজন প্রযোজনা করছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ | স্থানীয় লিংকস্ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নোবেল পুরস্কার16 অক্টোবর, 2006 | বিশেষ আয়োজন সংবিধান, নির্বাচন এবং সংস্কার নিয়ে প্রানবন্ত আলোচনা09 অক্টোবর, 2006 | বিশেষ আয়োজন আলোচকরা শাসন ব্যাবস্থার উন্নতির উপরে জোর দিলেন 02 অক্টোবর, 2006 | বিশেষ আয়োজন বাংলাদেশ সংলাপ25 সেপ্টেম্বর, 2006 | বিশেষ আয়োজন বাংলাদেশ সংলাপ21 সেপ্টেম্বর, 2006 | বিশেষ আয়োজন নতুন আঙ্গিকে বাংলাদেশ সংলাপ14 সেপ্টেম্বর, 2006 | বিশেষ আয়োজন বাংলাদেশ সংলাপ-কোথায়, কখন?04 সেপ্টেম্বর, 2006 | Lei আলোচকরা শাসন ব্যাবস্থার উন্নতির উপরে জোর দিলেন 02 অক্টোবর, 2006 | Lei | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||