http://www.bbcbengali.com

09 অক্টোবর, 2006 - প্রকাশের সময় 16:00 GMT

সংবিধান, নির্বাচন এবং সংস্কার নিয়ে প্রানবন্ত আলোচনা

কথা এবং ছবি : রাসেল মাহমুদ

বিবিসি বাংলা সার্ভিস আয়োজিত "বাংলাদেশ সংলাপ" এর ষষ্ঠ পর্বের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্যানেল সদস্যরা ছিলেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও ক্ষমতাসীন বিএনপি'র ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা, আওয়ামী লীগ-এর সভাপতি মন্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক এমপি, গবেষনা সংস্থা সিডিআরবি'র চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান শেলী এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবি সমিতি বা 'বেলা'র পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত দর্শকরা সামপ্রতিক বিভিন্ন ঘটনাবলী নিয়ে আমন্ত্রিত প্যানেল সদস্যদের কাছে প্রশ্ন রাখেন।

প্রথম প্রশ্ন করেন শ্যাওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকার সংগীতা ফারজানা। তাঁর প্রশ্ন ছিলো সংবিধান সংশোধন না করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সংস্কার আদৌ করা সম্ভব কি না?

জবাবে আব্দুর রাজ্জাক বলেন যে সম্ভব এবং নির্বাচনী সংস্কার সম্পর্কিত সুপারিশগুলো সংবিধানের ভিত্তিতেই বাসত্দবায়ন করা যেতে পারে। এখানে নির্দলীয় কাউকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার ব্যাপারটিই তারা নিশ্চিত করতে চান বলে জানান মি. রাজ্জাক।

সাদেক হোসেন খোকা বলেন যে কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান নিয়োগ করা হবে তা সংবিধানে স্পষ্ট আছে, এমনকি বিভিন্ন বিকল্প পথের কথা উল্লেখ রয়েছে সেখানে, আর সেজন্যে সংস্কার প্রশ্নে সংবিধান সংশোধনের দরকার নেই। তবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন । আর সেই সাথে নির্দলীয় ব্যাপারটিরও একটি ব্যাখ্যা দিয়ে ঢাকার মেয়র বলেন যে সাংবিধানিক কোন পদের থাকা কাউকে কোনভাবেই কোন দলের মতানুসারী বলা ঠিক হবে না। তবে তিনি এও বলেন যে সংবিধান সংশোধন করাটা একটা খারাপ উদাহরণ হিসেবে থেকে যেতে পারে।

পুরো অনুষ্ঠান শুনতে চাইলে ক্লিক করুন

মিজানুর রহমান শেলী বলেন যে সংবিধানে যা আছে তা বাস্তবায়ন করা হলে তো কোন সমস্যাই থাকতো না। সমস্যা তখনই দেখা দেয় যখন এর কোন ধারার ব্যাখ্যা নিয়ে প্রধার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ তৈরী হয়। তিনি বলেন যে সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে, যদি তা করা দরকার হয়। তাঁর মতে এটি কোন ঐশীবানী নয় যে পরিবর্তন করা যাবে না।

এসময় একজন দর্শক মন্তব্য করেন যে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো চাইলেই সমস্যার সমাধান করা যায়।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন যে সংবিধান পরিবর্তন করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হলেও তা নিয়েই এবার সমস্যা তৈরী হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন ছিলো যে এখন সংবিধান সংশোধন করে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হলে, তা নিয়ে আগামীতে যদি আবার সমস্যা তৈরী হয় তখন কি হবে?

আব্দুর রাজ্জাক এসময় বলেন যে সংবিধান মতো সবাই চললে এমন অবস্থা হতো না। তিনি মনে করিয়ে দেন বিচারপতি কে এম হাসান এক সময় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন, পরবর্তীতে তিনি সেই দলেরই একজন নেতা হিসেবেই রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন।

পরবর্তী প্রশ্ন ছিলো ধানমন্ডী থেকে আসা ফারজানা আজিজ শাওন-এর। তিনি জানতে চান যে সংস্কার প্রস্তাব মেনে না নিলে বাংলাদেশে থাইল্যান্ডের মতো কোন পরিস্থিতি সৃষ্টির আশংকা কতটুকু?

এমন আশংকা একেবারেই অমুলক নয় বলেই মনে করেন আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন বাংলাদেশে অনেকের মনেই এমন আশংকা তৈরী হয়েছে । সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে অচলাবস্থার সমাধান চায়। আর তা না হলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হতেই পারে।

সাদেক হোসেন খোকার মতে অনৈক্য তৈরী হলেও রাজনৈতিক ভাবেই সব সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। তাঁর মতে কোন অসাংবিধানিক পথে সমাধান করার চেষ্টা হলে দেশের মানুষ অতীতের মতই তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। তাছাড়া এমন কোন আশংকাও এই মুহুর্তে তিনি করছেন না বলেই জানালেন।

তবে দর্শকদের একজন মনে করেন সংলাপে সমাধান না আসলে সংঘাত অনিবার্য। সাভার থেকে আসা মো: নুরুজ্জামানের মতে সরকার সংলাপের নামে শুধুই কালক্ষেপন করছে। এক মহিলা দর্শক মন্তব্য করেন যে পত্রিকায় দেখা যায় আন্তরিক ভাবে সংলাপ হচ্ছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জনসভায় বলেন বিরোধী দল সংস্কার চায় না, অন্যদিকে বিরোধী নেত্রী সংলাপে সমাধান না হলে নেতা কর্মীদের ঢাকায় আসতে বলেন। এতে তো মনে হয় কোন নেত্রীই সংলাপ চান না, এমন মন্তব্য করেন তিনি।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান অবশ্য এই মুহুর্তে সব দলকেই সংযম দেখানোর আহবান জানিয়ে বলেন সংলাপ শুরু হয়েছে, এসময় শীর্ষ নেতৃত্বের এমন কথাবার্তা সমস্যা কেবল জটিলই করবে। তিনি মনে করেন না বাংলাদেশে থাইল্যান্ডের মতো সমস্যা সৃষ্টি হবে না।

মি. শেলী অবশ্য শুরু করলেন একটি গল্প দিয়ে। এক তালাকের মামলায় স্ত্রী'র পক্ষের উকিল জজ সাহেবকে বললেন যে হুজুর সব দোষ স্বামীর। জজ বললেন আপনি ঠিক বলেছেন। এসময় স্বামীর আইনজীবি বললেন হুজুর আমার মনে হয় সব দোষ স্ত্রী'রই । জজ সাহেব বললেন আপনি ঠিক বলেছেন। তখন তরুন এক আইনজীবি উঠে দাড়িয়ে জজকে বললেন যে দুই পক্ষের উকিল তো একই সাথে ঠিক কথা বলতে পারে না। এবারে জজ সাহেব বললেন আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের দেশে দু'দিক থেকেই আমরা ঠিক কথাই শুনি এমন উক্তি করলেন মি. শেলী। বিখ্যাত একটি উক্তি স্মরণ করিয়ে তিনি - রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে যার যা খুশি তাই করে; ছাত্ররা বিক্ষোভ করে, শ্রমিকরা করে ধর্মঘট, বড়লোকেরা ঘুষ দিয়ে কাজ আদায় করে আর কর্নেলরা করেন ক্যু!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এস এম সাইদুর রহমান প্রশ্ন করেন যে ২০০৭ সালের নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত জরিপের ফলাফল সংস্কার বিষয়ক সংলাপে কোন প্রভাব ফেলবে কি না?

প্রশ্নের জবাবে দুই রাজনৈতিক দলের নেতা অনেকটা প্রায় এক সুরে জানালেন যে এমনটা না হবার কথা। তবে মিস হাসান বলেন যে জনমত সত্যিকার অর্থে কোন প্রভাব ফেললে দেশ এমন অবস্থায় এসে পৌছাতো না। আর মি. শেলী বললেন যে জনতা কি করবে তা বোঝা যায় নির্বাচনের সময়।

অষ্টম সংসদের সমাপনী দিনে দু'নেত্রী যে কেউ কারো মুখ দেখলেন না তা গনতন্ত্রের জন্য কতটা সহায়ক এমন প্রশ্ন করলেন ধানমন্ডী থেকে আসা মো: এইচ এ কাইউম।

একে মোটেও ভালো লক্ষন মনে করছেন না সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং মিজানুর রহমান শেলী। মিস হাসান বলেন যে অনেক দেশেই সাধারণত নির্বাচনী প্রচারনার শেষ দিকে দুই প্রধান দলের নেতারা উন্মুক্ত বিতর্কে বসেন। তাঁর মতে সংস্কার প্রস্তাবে জনগনের একটি দাবী অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যে দুই নেত্রীর মুখোমুখি বিতর্ক হতে হবে। এসময় হাততালি দিয়ে তার এই বক্তব্যকে সমর্থন জানান উপস্থিত দর্শকরা।

ড. শেলী বলেন যে গনতন্ত্রে বিরোধী দলকে সম্মান জানানো উচিত কারণ বিরোধী দল গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার একটি অংশ । তবে তাঁর মতে বাংলাদেশে সব সময়ই বিরোধী দলকে অবজ্ঞা করা হয়েছে।

মি. রাজ্জাক বলেন বেশ কয়েকটি সংসদে সরকারী এবং বিরোধী দলের মধ্যে এমনটি হয়ে আসছে। তিনি অভিযোগ করেন যে শুধু বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাথেই নয়, বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের সাথেও প্রধানমন্ত্রীর দেখা হয়না বললেই চলে। গনতন্ত্রের জন্য এটা মোটেও ভালো কোন উদাহরণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বয়স খুব বেশি নয় এমন মন্তব্য করে সাদেক হোসেন খোকা বলেন যে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে এবং এক্ষেত্রে সব দলকেই উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো: রেজাউল ইসলাম প্রশ্ন করেন যে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রীড়াবিদদের উপর পুলিশী হামলার দায়িত্ব কে নেবে?

এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক দু'টি ঘটনার উল্লেখ করে সাদেক হোসেন খোকা বলেন যে চট্টগ্রামে যে হামলা হয়েছে সেটির ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে উদ্যোগী হয়ে ঘটনার নিস্পত্তি করেছেন। আর সর্বশেষ হামলার ব্যাপারে নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি জানান যে এরই মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তবে মিস হাসান বলেন যে কমিটির কোন রিপোর্টই প্রকাশ করা হয়না। আর এ ঘটনার দায়-দায়িত্ব পুলিশকেই নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ড. শেলী বলেন যে অনুমতি ছাড়া পুলিশ এমনকি লাঠিও চালাতে পারে না, তবে বর্তমানে এ নিয়ন্ত্রন অনেকাংশেই নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন এই ভারসাম্যগুলি আবার ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে এধরনের ঘটনা আর না ঘটে। মি. রাজ্জাক বলেন যে প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগ আলাদা হওয়া দরকার। আর ক্রীড়াবিদদের উপর হামলা খুবই দু:খজনক বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শ্রোতা-দর্শকদের মধ্যে যারা মন্তব্য করেন তারা সবাই একে দু:খজনক ব্যাপার বলে উল্লেখ করেন এবং এ ব্যাপারে শক্ত সরকারী পদক্ষেপের দাবী জানান।

এরপর ঢাকার ছাত্রী জেসমিন আক্তার প্রশ্ন করেন যে সার্ক সম্মেলনের সময় ঢাকার ভিআইপি রাস্তা সাজাতে ও উন্নয়নে যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল, ঢাকার অন্য রাস্তার ক্ষেত্রে সেরকম পদক্ষেপ কেন নেয়া হয় না।

এ ব্যাপারে মিস হাসান বলেন যে রাস্তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য বজায় রাখা উচিত। পার্কগুলোর উন্নয়ন ও দখলমুক্ত করার জন্যেও তিনি সুপারিশ করেন । ড. শেলী বলেন যে পরিকল্পনা মাফিক উন্নয়ন করা দরকার। আব্দুর রাজ্জাকও একই কথা বলে বলেন, তবে তিনি স্বীকার করেন তাঁর দল ক্ষমতায় থাকার সময়েও অবশ্য এরকম কোন পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। দর্শকদের মধ্যে একজন মন্তব্য করেন যে ঢাকার জন্যে পরিকল্পনাগুলো দীর্ঘমেয়াদী হওয়া উচিত। অন্যদিকে প্রশ্নকর্তা মন্তব্য করেন যে ঢাকার এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে রাস্তাঘাটই নাই। সাদেক হোসেন খোকা বলেন যে রাস্তাগুলোর অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে, ঢাকা আগের যেকোন সময়ের চাইতে অনেক ভালো অবস্থায় আছে। আরো উন্নয়নের জন্য তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

ঢাকার মিরপুরের আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রশ্ন করেন যে আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী ও কর্মসূচীর মান না মানি বা অর্থ গুরুত্বপূর্ন হবে ?

সাদেক হোসনে খোকা এর উত্তরে বলেন যে ভালো, যোগ্য এবং জনগণের পক্ষের লোকেরা মনোনয়ন পেলে টাকা নির্বাচনে বড় কোন ব্যাপার হয়ে দাড়াবে না। আব্দুর রাজ্জাক বলেন বাজার অর্থনীতির মতো বাজার রাজনীতি হয়ে গেছে। মনোনয়ন বিক্রি করা হবে কিনা তা জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ নেতা বলেন যে তাঁরা সেটা প্রতিহত করার চেষ্টা করছেন।

ড. শেলী বলেন যে পৃথিবী টাকার বশ। আসলে এখন পর্যন্ত টাকা আর পেশী শক্তি এদেশের রাজনীতিতে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে । তাঁর বিশ্বাস যে পরবর্তী নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে টাকা জিতবে না, মানুষ জিতবে। মিস হাসানের অবশ্য বেশ সন্দেহ আছে এব্যাপারে। তিনি বলেন যে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কমেছে এমনটা মনে করার কোন কারন নেই। তবে মানুষ অনেক সচেতন হচ্ছে বলেই তিনি মনে করেন। তবে হাত তুলে দর্শকদের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই জানান যে তারা মনে করে এবারো নির্বাচনে টাকার প্রভাব কমবে না।

অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়েছে ৮ই অক্টোবর বিবিসি বাংলার সান্ধ্য অধিবেশনে৻

এই ধারাবাহিক আলোচনা অনুষ্ঠানগুলো প্রযোজনা করছেন ওয়ালিউর রহমান