14 সেপ্টেম্বর, 2006 - প্রকাশের সময় 15:23 GMT
বাংলাদেশ সংলাপের দ্বিতীয় অনুষ্ঠান
ঢাকার চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত বাংলাদেশ সংলাপের দ্বিতীয় অনুষ্ঠানের প্যানেলে ছিলেন: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, প্রাক্তন বানিজ্য মন্ত্রী ও বর্তমান জাতীয় সংসদ সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশের বর্তমান চেয়ারম্যান আবু সৈয়দ মোহাম্মদ সাদেক খান; বেসরকারী সংস্থা `নিজেরা করি’র প্রধান খুশি কবীর৷ শ্রোতা-দর্শকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন কামাল আহমেদ৻
আলোচনার প্রথম প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুত ব্যবস্থা নিয়ে৷ অংশগ্রহণকারীদের একজন প্রশ্ন করেন বিদ্যুত ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে না কেন? উপস্থাপক কামাল আহমেদ প্রশ্নটি ছুড়ে দেন প্যানেলিস্টদের একজন- সাদেক খানের দিকে৷
উত্তরে সাদেক খান এবিষয়ে সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারার জন্য সরকারের সমালোচনা করেন৷ একমাত্র সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবকেই এর জন্য দায়ী করে তিনি বলেন এখানে অন্য কোন অজুহাত তৈরী করার সুযোগ নেই৷
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শিল্পায়ন এবং শহরে, বিশেষ করে ঢাকায়, বেশি মানুষের বসবাস শুরু করাকে টেনে এনে বলেন, বিদ্যুত উৎপাদন তেমন বাড়েনি বলেই এই সংকট৷
এনজিও ‘নিজেরা করি’র কর্নধার খুশি কবীর বলেন, এখন পর্যন্ত বিদ্যুত উৎপাদন যথেষ্ট নয়, বিতরনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈষম্য, সেই সাথে বেসরকারীভাবে বিদ্যুত উৎপাদনের ক্ষেত্রে তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না৷
মতিয়া চৌধুরী বিদ্যুত পরিস্থিতির এই অবস্থার জন্য এই সরকারের আমলে বিদ্যুত উৎপাদন না বাড়াকেই দায়ী করেন৷
![]() | |
দুর্নীতি দমন কমিশনের উপর পরের প্রশ্নটি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তৌহিদুল ইসলাম৷ প্যানেলের কাছে তিনি জানতে চান কমিশন আদৌ স্বাধীন কি না?
খুশি কবীর উত্তর দিতে গিয়ে প্রথম যে শব্দটি উচ্চারন করেন তা হল ‘না’৷ তার কারণ ব্যখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন এখনো আমাদের দেশে প্রাচীন কিছু আইন রয়ে গেছে৷ যেমন, কোন সরকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করতে হলে সেই দপ্তরের ছাড়পত্র পেতে হয়৷ ফলে কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমান পাওয়া গেলেও মামলা করা যায় না৷
মতিয়া চৌধুরী বলেন, কমিশন নিজেই ক্ষীণ কন্ঠে অনেকবারই বলেছে তারা স্বাধীন না৷ এখন পর্যন্ত তারা কোন মামলা করতে পারেনি৷
এসময় নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা এক দর্শক সরকারী নিয়োগে দুনীতি বন্ধ করার পক্ষে মত দেন৷ তবে তিনি বলেন, যে মানুষটি এক লক্ষ টাকা দিয়ে চাকরী পায় সে অবশ্যই কিছুটা হলেও দুর্নীতি করার অধিকার দেয়া উচিত৷ এসময় দর্শকদের মাঝে বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি হয়৷ অন্য একজন দর্শক এসময় রাজনিতিবিদদের দুর্নীতি কামনো উচিত বলে মন্তব্য করেন৷
আমীর খসরু এসময় বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের মধ্য দিয়েই এটাই প্রমান হয় যে দুর্নীতি দমনে সরকার আন্তরিক৷ সাদেক খান এসময় খুশি কবীরের বক্তব্য সংশোধন করে বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে কারো বিরুদ্ধে মামলা করতে কোথাও অনুমতি নিতে হয় না৷ তার মতে এখানে মূলত আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই কমিশনের কার্যকারিতাকে পিছিয়ে দিয়েছে৷
পরবর্তী প্রশ্ন ছিল দ্রব্য মূল্য নিয়ে৷ প্যানেলিস্টদের কাছে প্রশ্ন করেন ঢাকার কাকরাইল থেকে আসা একজন অধ্যাপক, দ্রব্য মূল্যের উর্দ্ধগতি থেকে পরিত্রানের উপায় জানতে চান তিনি৷ এবিষয়টি নিয়ে চমৎকার বিতর্ক শুরু হয় প্যানেলিস্ট এবং দর্শকদের মধ্যে৻
মতিয়া চৌধুরী বলেন, সরকার চাইলে অবশ্যই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব৷ আর সেই সাথে সরকার দলীয় মানুষজন যদি ‘ব্যবসা’ না করে তবেই এটা সম্ভব৷
এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা দর্শকদরে একজন বলেন, কোন কারনে একবার মূল্য বেড়ে গেলে তা আর কখনোই কমে না৷ অন্য একজন দর্শক বলেন, মন্ত্রীদের বেতন বাড়লেও সাধারণ চাকুরেদের বেতন বাড়ে না৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একজন ছাত্রের মন্তব্য ছিল একটু অন্যরকম; তিনি বলেন দ্রব্য মূল্য বাড়লে সাধারন ক্রেতাদের দুর্ভোগ হয় ঠিকই, কিন্তু কমে গেলে আবার উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে যারা জড়িত তারা সমস্যায় পড়বে৷ এক্ষেত্রে মূল্য কতখানি হলে সাম্য-অবস্থা থাকবে তা প্রথমেই ঠিক করা দরকার৷
খুশি কবীর বলেন, নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসের দাম বেড়ে গেলেই সাধারনত সবচেয়ে বেশি সমস্যার সৃষ্টি হয়৷ সাদেক খানের ‘ভোক্তাদের সংগঠিত’ হবার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে এধরনের সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সংঘাতের সম্ভবনা বেড়ে যায়৷ আর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারের ভুমিকা থাকা উচিত৷
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার বক্তব্যের শুরুতেই সবাইকে মনে করিয়ে দেন, দেশ বর্তমানে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে৷ তার মতে এধরনের বাজার নিয়ন্ত্রনে সরকারের ভূমিকা নেই বললেই চলে৷
আমদানী নির্ভরতার কারণে বাজার নিয়ন্ত্রন হয় আন্তর্জাতিকভাবে৷ তাই তিনি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনের চাইতে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর প্রতি বেশি জোর দেন৷ তিনি বলেন বাংলাদেশ এখন নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে৷ আর এই অর্ন্তবর্তীকালীন সময়টিতে দামের ক্ষেত্রে কিছুটা অস্থিরতা থাকবে বলেই তার মত৷
ময়মনসিংহ থেকে আসা প্রকৌশলী রিয়াজুল হাসনাত প্রশ্ন রাখেন, নির্বাচন কমিশন পরিবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংস্কার ছাড়া ১৪ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না আর ১৪ দল ছাড়া নির্বাচন কতটুকু গ্রহনযোগ্য হবে?
এপ্রসঙ্গে মতিয়া চৌধুরী বলেন, ১৪ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নিতে চায় এবং নির্বাচনকে স্বচ্ছ করতেই তাদের এই সংস্কার আন্দোলন৷ ১৪ দলীয় জোট ছাড়া নির্বাচন হলে আরেকটি ‘১৫ই ফেব্রুয়ারীর’ নির্বাচন হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন৷
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রশ্ন করেন ১৪ দলীয় জোট নির্বাচন করবে না কেন৷ তিনি বলেন, খোড়া যুক্তি দেখিয়ে নির্বাচনে না যাবার কোন কারন নেই৷ তবে প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি বলেন, একটি দল নির্বাচনে অংশ না নিলে যে অচলাবস্থা তৈরী হবে তার দায়িত্ব তাদেরকেই নিতে হবে৷
সাদেক খান বলেন, যদি ভোট হয় এবং মানুষ ভোট দেয় তবে অবশ্যই তা গ্রহণযোগ্য হবে৷ খুশি কবীর বলেন, নির্বাচন কমিশনে দায়িত্ব হল নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী করা৷ তবে সে পরিবেশ তৈরীর ক্ষেত্রে কমিশনের পক্ষ থেকে তেমন কোন ভুমিকা দেখা যাচ্ছে না৷
কুমিল্লা থেকে আসা আলমগীর হেসেন, বাংলাদেশের রাজনীতি এবং নির্বাচনে কালো টাকার প্রভাব বন্ধ করা সম্ভব কি না, এই প্রশ্ন রাখেন প্যানেলের কাছে৷
মতিয়া চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন নির্বাচন কমিশন আন্তরিক হলে এবং ভোটাররা সচেতন হলে কালো টাকার প্রভাব মুক্ত করা সম্ভব৷ আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন রাজনীতিতে কালো টাকা অবশ্যই একটি বড় ব্যাপার৷ তিনি বলেন কালো টাকা আছে এমন কাউকে মানুষ যদি ভোট না দেয় তবে কোন দল তাদের নমিনেশন দেবে না৷
খুশি কবীর এই কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্ব এড়াতে পারে না৷ রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর গনতন্ত্রের অনুশীলন থাকলে এবং নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নিতে পারলেই কালো টাকার বিষয়টি বন্ধ হবে৷ আর রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তাদের মনোনিত প্রার্থীদের সম্পদের হিসেব জনগনের সামনে প্রকাশ করা৷
সাদেক খান এ প্রসঙ্গে বলেন কালো টাকা আছে এমন প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের থাকলে এর প্রভাব থেকেও নির্বাচনকে দুরে রাখা যেতো৷ এ প্রসঙ্গে একজন দর্শক বলেন, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যখন প্রকৃত রাজনিতিবিদদের বাদ দিয়ে ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিদের মনোনয়ন দেয় তখন এটা আশা করা যায় না যে কালোটাকার হাত থেকে নির্বাচনকে বাঁচানো যাবে৷
ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া থেকে আসা শফিউল আযম চৌধুরী প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গনতন্ত্র আছে কি, নাকি তারা পরিবারতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে?
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন প্রায় সব রাজনৈতিক দলেই সার্বিক মতামতের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচিত হয়৷ নিয়মিত এধরনের মতামত নেয়া হয় তা নয়; তবে যে ব্যবস্থা প্রচলিত তাও অগনতান্ত্রিক নয় বলে তিনি দাবী করেন৷ তিনি সেই সাথে একথাও স্বীকার করেন, ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থার পরিবর্তনও হতে পারে৷
মতিয়া চৌধুরীও একই সুরে বলেন পরিবারতন্ত্র তাদের দলেও নেই৷ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর শেখ হাসিনা ছাড়াই ছয় বছর দল চলেছে৷ পরে কাউন্সিলরদের দাবীর প্রেক্ষিতেই তাকে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব দেয়া হয়৷ একে দলের মাঝে গনতন্ত্রের উদাহরণ বলে তিনি মনে করেন৷
বাকি দু’জন প্যানেলিস্টদের কাছে যাবার আগে উপস্থাপক কামাল আহম্মেদ শ্রোতাদের কাছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর গনতন্ত্র আছে কিনা সে ব্যাপারে হাত তুলে ভোট দেয়ার আহবান জানান৷
সেখানে মাত্র একজন দর্শক হাত তুলে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গনতন্ত্র আছে বলে মত দেন৷ এসময় খুশি কবীর মন্তব্য করেন সারা বিশ্বেই বর্তমানে রাজতন্ত্র বিসর্জন দিচ্ছে৷ সেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো পরিবারতন্ত্রের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে খুব বেশি করে৷
সাদেক খান গনতান্ত্রিক দেশগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেন, সবখানেই প্রায় দু‘ধরনের দল আছে; একদল নিজেরা গনতন্ত্ররের চচ্র্চা করে আবার কোন দল পরিবারতন্ত্রই চচ্র্চা করে৷ তবে তিনি আশা করেন সময় যাবার সাথে সাথে আমাদের দেশের দলগুলোর মধ্যে আস্তে আস্তে প্রকৃত গনতন্ত্রের চচ্র্চা শুরু হবে৷
এসময় আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন আমাদের দেশে পরিবার একটি বাঁধন হিসেবে কাজ করে৷ এর ফলে দলের ভেতরে বিভক্তির সম্ভবনা কমিয়ে আনা যায়৷
অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়েছে ১০ই সেপ্টেম্বর বিবিসি বাংলার সান্ধ্য অধিবেশনে৻