সংবাদ ভিত্তিক অনুষ্ঠানে বিবর্তন

বিবিসির নিউজরুম

বিবিসির নিউজরুম

বিবিসি বাংলার শুরুর দশকগুলোতে অনুষ্ঠান ছিল ‘মিশ্র ধাঁচের’। তাতে নিয়মিত সংবাদ বুলেটিন থাকলেও তা ছিল মোটামুটি সংক্ষিপ্ত এবং কিছু সংবাদভাষ্য থাকলেও তাতে প্রাধান্য পেত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের নানা খবর, যা বাঙালি জনগোষ্ঠীর গরিষ্ঠ অংশের কাছে ছিল বিশেষ জনপ্রিয়। বিভাগের কার্যক্রমের মূল প্রয়াস কেন্দ্রীভূত ছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের, পাশাপাশি বাঙালির শিল্প, সাহিত্য এবং সৃষ্টিধর্মী মনন নিয়ে খবরাখবর প্রচারের ক্ষেত্রে। এধরনের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে বেতারে আকর্ষণীয় বহু জীবন্তিকা ও প্রামাণ্য অনুষ্ঠান তৈরি হতো।

এই ধারার বদল ঘটল নব্বইয়ের দশকে। কয়েক বছরে এই বিবর্তনের পথ ধরে বিবিসি বাংলার অনুষ্ঠানের মূল উপজীব্য হয়ে উঠল সংবাদ, সাময়িক প্রসঙ্গ এবং সংবাদভিত্তিক নানা প্রামাণ্য আয়োজন। সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলোর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কমে এল। এই বিবর্তনের পেছনে ছিল সেসময়কার বিশ্ব ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপট এবং তারই সূত্র ধরে বিবিসির সাংগঠনিক নীতিমালায় পরিবর্তন।

নব্বইয়ের দশকটা ছিল বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নজিরবিহীন এক দশক। শীতল যুদ্ধের অবসানে তখন প্রতিপক্ষ শক্তিগুলোর রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বদল ঘটছে, বিভক্ত ইউরোপ আবার একত্রিত হবার পথে, বিশ্বের দুই পরাশক্তির একটি - সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন ১৫টি পৃথক রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়েছে, তারই জেরে রাশিয়া এবং নবগঠিত প্রজাতন্ত্রগুলোয় চলছে রাজনৈতিক সহিংসতা, ইউগোশ্লাভিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত, এবং তার ফলশ্রুতিতে সার্বিয়া, বসনিয়া হের্সেগোভিনা ও ক্রোয়েশিয়ায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সম্প্রদায়গত ও জাতিগত হানাহানি।

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন শ্যামল লোধ

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন শ্যামল লোধ

রাজনীতির নাটকীয়তায় ওই দশক আরো প্রত্যক্ষ করেছিল কুয়েতে ইরাকি হামলা এবং কুয়েতকে মুক্ত করার জন্য মার্কিন নেতৃত্বে জোট বাহিনীর অভিযান। এককথায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবসানের পর ১৯৯০-এর দশকের প্রথমার্ধে বিশ্ব রাজনীতিতে ঘটেছিল অভূতপূর্ব উথালপাথাল। এইসব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের খবরাখবর এবং তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ অর্থবহভাবে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেবার সবচেয়ে ভাল পথ খুঁজতে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো শুরু করেছিল নতুন করে চিন্তাভাবনা। পাশাপাশি আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়টাও হয়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ।

এই পটভূমিতে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস সিদ্ধান্ত নিল তারা তাদের সম্পদ ও প্রয়াস কেন্দ্রীভূত করবে সংবাদ ও সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠানে। মৌলিক এই সিদ্ধান্তের ফলে ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ভাষা সম্প্রচার বিভাগগুলোকে বদলাতে হল তাদের সম্প্রচারের ধারা। বিবিসির বাংলা বিভাগকেও দশকের দ্বিতীয়ার্ধে নতুন চিন্তাভাবনা ও নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বদলাতে হল তাদের সম্প্রচারের আঙ্গিক।

বড় বড় সংগঠনগুলোর একটা নিজস্ব নীতি ও কর্ম-সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তার সাংগঠনিক নিয়মেই। কিন্তু মাঝে মধ্যে ব্যক্তিবিশেষও এইসব প্রতিষ্ঠানে নাটকীয় পালাবদলের মূল কর্ণধার হয়ে ওঠেন। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জন টুসা ছিলেন এমনই একজন ব্যক্তি। তিনি ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ভাষা সম্প্রচার বিভাগগুলো কঠোর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তখন বেতার উপস্থাপক নিয়োগ করত এবং এঁদের বেশিরভাগই ছিলেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে পেশাদার। মিঃ টুসা মনে করেছিলেন, মিডিয়া বিশ্ব যখন আরো বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে, তখন বিবিসির মত বিশ্বমানের মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে এইসব পেশাদার উপস্থাপকদের প্রতিভার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। জন টুসা তখন ভাষা বিভাগগুলোর নিয়োগনীতিতে পরিবর্তন আনলেন, কর্মরতদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন এবং কাজের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার ওপর আরো বেশি গুরুত্ব আরোপ করলেন। এটা করা হল গোটা ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে, যদিও পুরোপুরিভাবে এই পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে সময় লেগেছিল বেশ কয়েক বছর। এভাবেই ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে সংবাদ ভিত্তিক সম্প্রচারের ভিত রচিত হল।

বিবিসির নিউজরুমে কাজ চলে দিন রাত

বিবিসির নিউজরুমে কাজ চলে দিন রাত

নব্বই-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে দশকের শেষ পর্যন্ত নিয়মিত চালানো শ্রোতা জরিপে লক্ষ্য করা গেল শ্রোতাদের চাওয়া পাওয়ায় একটা পরিবর্তনের চিত্র। বেসরকারি পর্যায়ে কেবল্‌ এবং স্যাটেলাইট টিভির বিস্তার তখন শুরু হয়ে গেছে পুরোমাত্রায়। প্রথমে এর ঢেউ ভারতে এসে লাগলেও, ক্রমশ তা গোটা দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এইসব চ্যানেলে শ্রোতা-দর্শকরা পেতে শুরু করেন প্রচুর বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং তা আসে রঙিন পর্দায়। শ্রোতারা তখন শর্টওয়েভ বেতার সম্প্রচার ছেড়ে এধরনের অনুষ্ঠানের জন্য ঝুঁকে পড়েন টিভির দিকে। বিবিসি বাংলা বিভাগও একই অভিজ্ঞতার শরিক হয়।

যদিও এই সময়ে বিবিসি বাংলার শ্রোতা সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে বেড়েছিল, কিন্তু শ্রোতা জরিপে দেখা যায় বাংলা অনুষ্ঠানের গরিষ্ঠ সংখ্যক শ্রোতা প্রতিটা সম্প্রচারের গোড়ার দশ-বারো মিনিট শুনে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিচ্ছেন। দেখা গেল সংবাদ ও সংবাদভিত্তিক সাময়িক প্রসঙ্গের অনুষ্ঠান শেষ হবার সাথে সাথেই অধিকাংশ শ্রোতা রেডিও বন্ধ করে দিচ্ছেন। শুধু একটা ক্ষুদ্র শ্রোতাগোষ্ঠী পরবর্তী সাংস্কৃতিক ও বিনোদনধর্মী অনুষ্ঠানগুলো শোনার জন্য রেডিও খুলে রাখছেন। প্রতিষ্ঠানের জন্য যেখানে সময় মানেই অর্থ, সেখানে প্রতিযোগিতাপূর্ণ মিডিয়া পরিবেশে বেতার পরিচালকদের জন্য যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হিসাবে অবশ্যম্ভাবীই ছিল সংবাদের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং সংবাদ ব্যতিরেকে অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় বিনোদনধর্মী অন্যান্য অনুষ্ঠানগুলোর সংখ্যা কমিয়ে আনা। এর পেছনে আরেকটা যুক্তি ছিল ওই ধরণের অনুষ্ঠানগুলো তৈরি করা ছিল ব্যয়সাপেক্ষও। এইভাবেই নব্বইয়ের দশকের শেষ নাগাদ বদলে গেল বিবিসি বাংলার সম্প্রচারের চেহারা।

পরিবর্তন অনেক সময়েই বেদনাদায়ক হয় এবং বিবিসির ক্ষেত্রেও সম্প্রচার-সংস্কৃতির এই পালাবাদল বিভাগের জন্য এবং সেইসঙ্গে অনেক শ্রোতার জন্যই মর্মপীড়ার কারণ হয়েছে। সংবাদের বাইরে অন্য ধরনের অনুষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বহু শ্রোতাই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চিঠিপত্রে তারা তাদের উষ্মা প্রকাশ করেছেন। বিভাগের ভেতরেই কোনো কোনো কর্মী ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কিন্তু বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের যেসব খবরকে বিবিসি তখন গুরুত্ব দিয়েছে, এবং পাশাপাশি যেধরনের পরিবর্তিত মিডিয়া পরিবেশে ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়েছে, তাতে এই পরিবর্তন শুধু যুগোপযোগীই ছিল না, অবশ্যম্ভাবীও ছিল। সেই পরিবর্তনের আবহাওয়ায় ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের অগ্রযাত্রা আমরা আজও প্রত্যক্ষ করছি।

সর্বশেষ সংবাদ

অডিও খবর

ছবিতে সংবাদ

বিশেষ আয়োজন

BBC navigation

BBC © 2014 বাইরের ইন্টারনেট সাইটের বিষয়বস্তুর জন্য বিবিসি দায়ী নয়

কাসকেডিং স্টাইল শিট (css) ব্যবহার করে এমন একটি ব্রাউজার দিয়ে এই পাতাটি সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে৻ আপনার এখনকার ব্রাউজার দিয়ে এই পাতার বিষয়বস্তু আপনি ঠিকই দেখতে পাবেন, তবে সেটা উন্নত মানের হবে না৻ আপনার ব্রাউজারটি আগ্রেড করার কথা বিবেচনা করতে পারেন, কিংবা ব্রাউজারে css চালু কতে পারেন৻